কিট নিয়ে ‘ষড়যন্ত্রের দুর্গন্ধ’ পাচ্ছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র!

84

গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র উদ্ভাবিত কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ কিট ‘জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লোট’ নিয়ে ‘ষড়যন্ত্রের দুর্গন্ধ’ পাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীরা। কিটের রেজিস্ট্রেশন বা অনুমোদনের ব্যাপারে সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষের নানা ‘টালবাহানা’ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভাবিয়ে তুলেছে তাদের। কিটের রেজিস্ট্রেশন আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান এর উদ্ভাবকরা।
বিশ্ব মহামারি করোনাভাইরাস বাংলাদেশের আসার আগেই গত ফেব্রুয়ারি মাসে খবর আসে— করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে সৃষ্ট কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ ‘দ্রুত পদ্ধতি’ উদ্ভাবন করেছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র-আরএনএ বায়োটেক লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজীব বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. বিজন কুমার শীলের নেতৃত্বে এই কিট উদ্ভাবন করেছেন একদল বিজ্ঞানী। ড. বিজন কুমার শীলের নেতৃত্বে অন্য গবেষকরা হলেন- ড. ফিরোজ আহমেদ, ড. নিহাদ আদনান, ড. মো. রাইদ জমিরুদ্দিন ও ডা. মুহিব উল্লাহ খোন্দকার।

উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে কিট উৎপাদনের জন্য প্রথমেই তাদের প্রয়োজন হয় বিদেশ থেকে কাঁচামাল বা রিএজেন্ট আমদানির। এই রিএজেন্ট আমদানির জন্য বাংলাদেশ ওষুধ প্রশাসনে লিখিত আবেদন করে কোনো সাড়া মিলছিল না। অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ১৮ মার্চ রিএজেন্ট আমাদানির অনুমতি পায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। পাঁচ এপ্রিল চীন থেকে আসে কিট তৈরির রিএজেন্ট।

কিট উৎপাদনের পর কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য কোভিড-১৯ আক্রান্ত পাঁচজন রোগীর রক্তের নমুনা প্রয়োজন হয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের। সেটা যথা সময় গণস্বাস্থ্যকে সরবরাহ করে জাতীয় রোগতত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে আরও দশজন রোগীর রক্ত প্রয়োজন পড়লে তা কিছুতেই দিচ্ছিল না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এবারও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে কোভিড-১৯ আক্রান্ত দশ রোগীর রক্তের নমুনা পায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

সবকিছু গুছিয়ে এনে গত ২৫ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে কিট হস্তন্তার করতে গিয়ে প্রচণ্ড ধাক্কা খায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। ওই দিন ওষুধ প্রশাসনের কেউ তাদের কিট গ্রহণ করতে যায়নি। অধিকন্তু ২৭ এপ্রিল ওষুধ প্রশসনকে কিট দিতে গেলে সেটিও গ্রহণ করেনি তারা। বরং প্রাইভেট কোম্পানির মাধ্যমে কিটের সিআরও টেস্ট করানোর পরামর্শ দেওয়া হয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের।

এর পর নানা টানাপোড়েন শেষে গত ৩০ এপ্রিল কিটের এক্সটার্নাল ভ্যালিডেশনের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ও আইসিডিডিআরবিকে চিঠি দেয় ওষুধ প্রশাসন। তবে এক্সটার্নাল ভ্যালিডেশনের জন্য বিএসএমএমইউ রাজি হলে আইসিডিডিআরবি আর এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি। কিন্তু ওই চিঠি পাওয়ার পর দশ দিন কেটে গেলেও গণস্বাস্থ্য’র কিট গ্রহণ করছিল না বিএসএমএমইউ। অবশেষে ১১ মে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি গণমাধ্যমে তুলে ধরলে ১৩ মে কিট গ্রহণ করে বিএসএমএমইউ।

২০০ কিটের সঙ্গে ৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকাও বিএসএমএমইউকে দেওয়া হয় ভ্যালিডেশন ফি বাবদ। কিন্তু গণস্বাস্থ্যের কাছ থেকে কিট গ্রহণের পর প্রথম পাঁচদিন কোনো নড়াচড়া করেনি বিএসএমএমইউ। ষষ্ঠ দিনে গিয়ে প্রথম ট্রায়াল দেয় তারা। অর্থাৎ কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়টি জানার জন্য সোমবার (১৮ মে) তারা কিট নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কিট গ্রহণের ছয়দিনের মাথায় প্রথম ট্রায়ালের পর ঠিক কবে নাগাদ তারা ফুল ট্রায়ালে যাবে, সেটা এখনও নিশ্চিত না। সামনে ঈদের ছুটি। ছুটি কাটিয়ে এসে আবার ট্রায়াল। তারপর ছয় সদস্যের কমিটি ভিসির কাছে লিখিত রিপোর্ট জমা দেবেন। সেই রিপোর্টে ভিসির স্বাক্ষর। স্বাক্ষর শেষে সেটি ওষুধ প্রাশসানের কাছে পাঠানো। সেখানে আবার যাচাই করা হবে। তারপর সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও কতদিন লাগবে, সেটি কেউ বলতে পারছে না।

এই দীর্ঘসূত্রিতার মধ্যেই ‘ষড়যন্ত্রের দুর্গন্ধ’ পাচ্ছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা। নানা চড়াই-উৎরাই শেষে কিটের চূড়ান্ত অনুমোদনের শেষ ধাপে এসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আচরণের মধ্যে ‘সন্দেহজনক’ কিছু দেখতে পাচ্ছেন তারা। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার পরও কিট উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর এবং দফতরের কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে ক্রমাগত অসহযোগিতার পেছনে বড় ধরনের ‘অসৎ’ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য কাজ করছে। রিএজেন্ট আমদানির অনুমোদন, রক্তের নমুনা প্রদান, কিটের স্যাম্পল গ্রহণ, সিআরও, এক্সটার্নাল ভ্যালিডেশনের অনুমোদন প্রদান— সবক্ষেত্রেই দীর্ঘসূত্রিতার পেছনে এই অসৎ উদ্দেশ্য কাজ করছে।

তারা বলছেন, শতভাগ আমদানি নির্ভর দেশে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র স্বল্পমুল্যে কিট সরবরাহ করলে আমদানি থেকে যে পার্সেনটেন্স পান সরকারি কর্মকর্তারা, সেটা থেকে তারা বঞ্চিত হবেন। সে কারণেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কিট নিয়ে নানা জটিলতা পাকাচ্ছেন তারা।

এমনকি যে বিএসএমএমইউ’র ওপর সব চেয়ে বেশি ভরসা করেছিল গণস্বাস্থ কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা, সেই বিএসএমএমইউও গণস্বাস্থ্যের সঙ্গে যথাযথ আচরণ করছে না। যেখানে সাত কর্মদিবসের মধ্যে ভ্যালিডেশন করা সম্ভব, সেখানে গত ১৮ দিনেও কাজের কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি তারা। বিষয়টি নিয়ে যারপরনাই হতাশ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘তাদের আচরণের মধ্যে দুর্গন্ধ পাচ্ছি। কোনো কিছুই তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে না। আজ (সোমবার) তারা (বিএসএমএমইউ) ট্রায়াল দিয়েছে। কবে রিপোর্ট দেবে জানি না। ওদিকে ৩০ এপ্রিল আমরা যে চিঠি (রিএজেন্ট আমদানির জন্য) দিয়েছিলাম ওষুধ প্রশাসনকে, তার জবাব পেলাম আজ। বুঝতে পারছ, তারা আমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করছে। এখন আর কিছু বলতে চাই না। সব কথা বলব পরে।’

এদিকে পৃথিবীর প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেব দ্রুত টেস্ট কিট উদ্ভাবন করলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সেই ক্রেডিট থেকে বঞ্চিত হয়েছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র— এমনটিই অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীদের। কারণ এরই মধ্যে আমেরিকা-ভারতসহ কয়েকটি দেশ দ্রুত টেস্ট কিটের অনুমোদন দিয়েছে। ওইসব দেশের আগে দ্রুত টেস্ট কিট উদ্ভাবন করেও অনুমোদনের অপেক্ষায় এখনও ঝুলে আছে গণস্বাস্থ্যের কিট। ফলে অন্য দেশে কিট সরবরাহের যে সুযোগ ছিল, সেটিও হাতছাড়া হতে বসেছে।

এ প্রসঙ্গে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমরাই তো আগেই উদ্ভাবন করেছি। কিন্তু সরকার আমাদের ঝুলিয়ে রেখেছে। অন্য দেশের সরকার তো এরই মধ্যে অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে। তারা এখন আমাদের কিট নেবে কেন? তারপরও এখনও অনেক দেশ আছে, যারা আমাদের কিট নিতে চায়। কিন্তু সরকারের অনুমোদন না পেলে তো হচ্ছে না।’

 

সারাবাংলা

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here