ঢাকা লাল পুরোপুরি লকডাউন করতে হবে: স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক উপদেষ্টা

170

করোনা সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকায় ঢাকায় এখনই কঠোর লকডাউন দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক উপদেষ্টা প্রফেসর ডা. মোজাহেরুল হক। মানবজমিনকে তিনি বলেন, ঢাকার অবস্থা পুরো লাল। এই অবস্থায় এখনই কঠোর লকডাউন দিতে হবে। ঢাকা থেকে কোন লোককে বাইরে যেতে দেয়া যাবে না। ঢাকায় বাইরে থেকে কাউকে আসতে দেয়া যাবে না। অবস্থার অবনতি হওয়ায় দিল্লিতে লোক প্রবেশ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ঢাকার জন্য কাঠমান্ডু উদাহরণ হতে পারে। কাঠমান্ডুর লকডাউনটা হচ্ছে রাস্তায় শুধু পুলিশ আর আর্মি থাকবে।

রাস্তায় কোন মানুষ থাকবে না। মানুষ থাকবে ঘরে। ঢাকাকেও পুরো লকডাউন করে দিতে হবে। পুলিশ-আর্মিসহ আরো যদি বাহিনী প্রয়োজন হয় তাদের মোতায়েন করতে হবে। শুধু প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য কিছু সময় দিতে হবে যাতে তারা পণ্য কিনতে পারে। ঢাকায় কতো লোক সংক্রমিত এটা পুরো মানুষকে টেস্টের আওতায় আনা ছাড়া বলা যাবে না।

তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় টেস্ট করার পর আমরা ঢাকায় যে সংক্রমিত লোকের সংখ্যা পাচ্ছি এটার কয়েক গুণ বেশি হবে সংক্রমণের সংখ্যা।

পুরো পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তিনি বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে সরকারের প্রথম থেকেই সিদ্ধান্তগুলো টাইমলি হয়নি। সঠিক হয়নি। সমন্বয়হীনতা ছিল। সরকারের ছুটি এবং লকডাউন এগুলো নিয়েও ছিল যথেষ্ট কনফিউশন। শেষ পর্যন্ত ছুটিটাকে আমরা লকডাউন ধরে নিলেও কালকে (রোববার) থেকে যেটা ঘটেছে এটা একটা হটকারী সিদ্ধান্ত। কারণ নিয়ম হলো সংক্রমণ কমতে শুরু করলে বা নিয়ন্ত্রণে নিলে এগুলো স্ট্যাট্রিজিক্যালি এগুলো আস্তে আস্তে শিথিল বা তুলে নেবেন। সেই জায়গায় আমরা হঠাৎ করে পুরোটাকে খুলে দিয়েছি। শুধুমাত্র মানুষের ওপর ছেড়ে দিয়েছি যে তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুক, এবং পরিবহন ওয়ালারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুক, রেলের কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুক। এই রকম সংকটময় পরিস্থিতিতে এটা সাধারণত হয় না। এই জিনিসগুলো সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে আইনের প্রয়োগটা রাখতে হয়। সেটা পৃথিবীর সব দেশেই আছে। যারা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করেছে তারা প্রত্যেকে কিন্তু আইন প্রয়োগ করেছে।

তিনি বলেন, এখন যেটা হবে, সংক্রমণ ঝুুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়বে। ১৫ দিন একটা বিরাট সময়। এই ১৫ দিন সংক্রমণ বাড়তেই থাকবে। এতে কোন সন্দেহ নেই। একজন লোক যদি শনাক্তের বাইরে থাকে সে তিন থেকে ৫ জনকে সংক্রমিত করবে। তারা আবার তিন থেকে ৫ জন করে সংক্রমিত করবে। যদি একজন সংক্রমিত লোক শনাক্তকৃত না হয় টেস্টের মাধ্যমে। সুতরাং এটা কল্পনাতীত যা হতে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাতো আগেই বলেছে, করোনা ব্যবস্থাপনার দিক দিয়ে যতোগুলো খারাপ দেশ আছে তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এখন যেটা ঘটছে সেটাতে আমাদের এই ১৫ দিনের মতো একটা ঝুঁকি নেয়া উচিত হয়নি। এখন সরকারের একটাই কাজ হবে সংক্রমিত লোককে চিহ্নিত করে আইসোলেশনে আনা এবং তার সংস্পর্শে যারা এসেছে তাদের কোয়ারেন্টিনে নেয়া।

এটা এখন সম্ভব কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সম্ভব। আপনাকে আগে জেলাগুলো ভাগ করে নিতে হবে। আজকে পর্যন্ত দেখবেন কিছু জেলায় সংক্রমণ কম আছে। সেই জেলাগুলোকে গ্রিন জেলা ঘোষণা করেন। কতগুলোতে দেখবেন সংক্রমণ মধ্যম আকারে আছে। সেইগুলোকে ইয়োলো জেলা ঘোষণা দিবেন। আর যেইগুলো হটস্পট জেলা এগুলোকে রেড জেলা ঘোষণা করেন। সরকারকে তিনটি ভাগের জন্য তিন ধরণের কৌশল নিতে হবে। এই একটা উপায় আছে। গ্রিন জেলায় আক্রান্ত লোককে চিহ্নিত করে আইসোলেশনে নিতে হবে। তাদের সংস্পর্শে যারা এসেছে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে নিতে হবে। এটা সংখ্যায় খুব কম। এই লোকগুলোকে আটকে দিলেই সংক্রমণ আর বাড়বে না। বাইরে থেকে এই জেলাগুলোতে কোন এন্ট্রি দেয়া যাবে না। তাহলে এই জেলাগুলোতে সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, স্কুল-কলেজ সব চালু রাখা যাবে। কোন কিছুই বন্ধ থাকবে না।

অর্থনীতি বাঁচাতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সরকারের এ দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, আপনিতো কোনটাই বাঁচাচ্ছেন না। আপনি জীবনও মারছেন আবার অর্থনীতিকেও বারোটা বাজাচ্ছেন। ৮ তারিখ প্রথম সংক্রমিত হয়েছে। ৮ তারিখ থেকে ২৬ তারিখ পর্যন্ত আপনি কিছুই করেননি। ২৬ তারিখে এসে সারা দেশ আপনি ছুটি দিয়ে দিলেন কেন? তখনতো মাত্র চারটি জেলা সংক্রমণ ধরা পড়েছে। বাকি ৬০ জেলায় ছুটি দিয়ে দিলেন কেন? অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কেন বন্ধ করেছিলেন ওখানে। পরে যখন ১২ টি জেলায় সংক্রমণ ধরা পড়লো তখনও ৫২ টি জেলা সংক্রমণমুক্ত ছিল। সেখানে আপনি ছুটি দিয়ে সব বন্ধ করে রাখলেন কেন?

তিনি বলেন, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আজকে লেজেগোবরে অবস্থা করে ফেলেছে। পোনা মাছ পুকুরে ছেড়ে দেয়ার পর দেখেছেন এগুলো আর ধরা যায়। আপনি সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার পর এখন ধরবেন কেমনে?

উৎসঃ   মানবজমিন

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here