নেপথ্যে অনভিজ্ঞ ভারতীয় ঠিকাদার

60

খুলনা-মোংলা রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি তিন বছরের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে সাড়ে ১০ বছর। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়া তো দূরে থাক কাঙ্খিত অগ্রগতিও হয়নি। এর মধ্যে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১২১ শতাংশ। প্রকল্পটির ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ভারতের ইরকন ইন্টারন্যাশনাল। কিন্তু তারা নিজে কাজ না করে অনভিজ্ঞ সাব-কন্ট্রাক্টর নিয়োগ করেছে। অনভিজ্ঞ এই সাব কন্টাক্টরও ঠিকমতো কাজ না করায় প্রকল্পটি ১০ বছর ধরে ঝুলে আছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রকল্প সম্পর্কে রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন ইনকিলাবকে বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আর যাতে সময় না বাড়ে সেজন্য আমরা সচেষ্ট আছি। প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে প্রতি মাসেই আমরা পর্যালোচনা সভা করি। এখন করোনার মধ্যে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে সেই সভা অব্যাহত আছে। আশা করছি এবার সঠিক সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে।

আইএমইডি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল অনুমোদিত প্রকল্পটি ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বর হতে ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু এর কাজের অগ্রগতি না হওয়ায় প্রথমবার ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত একবছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। এতেও অগ্রগতি না হওয়ায় ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে তিন বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। এরপর তৃতীয়বার আবারও দুই বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এতেও অগ্রগতি না হওয়ায় বর্তমানে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, খুলনা-মোংলা রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি নেওয়া হয় ২০১০ সালের ডিসেম্বরে। তিন বছরের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার কথা থাকলেও ঠিকাদার নিয়োগ করা হয় ২০১৫ সালের অক্টোবরে। এরপরও প্রকল্পের কাজ এগুচ্ছে ধীরগতিতে। প্রকল্পটির ঠিকাদার ভারতের ইরকন ইন্টারন্যাশনাল নিজে রেলপথ নির্মাণের কাজ করছে না, বরং এক্ষেত্রে কিছু অনভিজ্ঞ সাব-কন্ট্রাক্টর নিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অনভিজ্ঞ এসব সাব-কন্ট্রাক্টর ঠিকমতো কাজ করছে না। আবার মালামাল সরবরাহে নিয়োজিত ঘনঘন সাব-এজেন্সিও পরিবর্তন করছে ঠিকাদার ইরকন ইন্টারন্যাশনাল। এতে প্রকল্পটি ঝুলে আছে ১০ বছর ধরে। এরই মধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ তিন দফা বাড়ানো হয়েছে। তবে বর্ধিত সময়েও প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে না। এতে আবারও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হবে। এতে প্রকল্প ব্যয়ও বেড়ে গেছে প্রায় ১২১ শতাংশ।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, খুলনা-মংলা বন্দর রেলপথ নির্মাণকাজ বিলম্বের পেছনে ভারতীয় সাবকন্ট্রাক্টরদের অদক্ষতার বিষয়টি রেলওয়ের প্রকল্প পর্যবেক্ষণ কমিটির সভায়ও একাধিকবার আলোচনা হয়। ২০১৮ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে জানানো হয়, ইরকন ইন্টারন্যাশনাল প্রকল্পটি মাটির কাজ এবং ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণকে আটটি প্যাকেজে ভাগ করে সাবকন্ট্রাক্টর নিয়োগ করেছে। কিন্তু বেশিরভাগ সাবকন্ট্রাক্টর কাজ বন্ধ রেখেছে। প্রকল্প এলাকায় নেই প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি। এতে প্রকল্পটির নির্মাণকাজে গতি আসছে না। সে সময় এ নিয়ে অসন্তেুাষ প্রকাশ করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। সক্ষমতা না থাকলে সাবকন্ট্রাক্ট বাতিল করার সুপারিশও করে রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা, যদিও তা মানা হয়নি।

সূত্র জানায়, বাস্তবায়নে ধীরগতিসহ সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনায় প্রকল্পটি নিবিড় পরিবীক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিল আইএমইডি। স¤প্রতি এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বর্ধিত মেয়াদ অনুযায়ী ২০২০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু সার্বিক ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৬৫ শতাংশ। ২০২১ সালের ডিসেম্বরের আগে কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।

প্রকল্পটির বাস্তবায়ন বিলম্বের জন্য বেশকিছু দুর্বল দিক চিহ্নিত করেছে আইএমইডি। এর মধ্যে অন্যতম হলো কন্ট্রাক্টর ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের দুর্বল প্রশাসন ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইরকন অধিকসংখ্যক অনভিজ্ঞ সাবকন্ট্রাক্টর নিয়োগ করেছে এবং সাবকন্ট্রাক্টররা ঠিকমতো কাজ করছে না। এছাড়া জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব হওয়া, প্রকল্পের মাঝপথে পরামর্শক পরিবর্তন, তিনজন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন, পাইল বার বার ফেইল করা, টেস্ট পাইল করতে বিলম্ব প্রভৃতি দুর্বলতাও চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রকল্পের রেললাইন নির্মাণের কাজ বেশ পিছিয়ে আছে, যা মাত্র ৫৪ শতাংশ। তাই পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ জনবল নিয়োগ করে টার্গেট অনুযায়ী কাজ আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে। সেইসঙ্গে কাজের অগ্রগতি ও বরাদ্দ ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পে ব্যয় নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ রেলওয়ের সার্বক্ষণিকভাবে মনিটরিং রাখতে হবে। প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটি ও প্রজেক্ট বাস্তবায়ন কমিটির সব সভা সময়মতো আয়োজন করতে হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রকল্পটির আওতায় খুলনা থেকে মংলা বন্দর পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে এর আওতায় ডাবল লাইনের প্রভিশন (সুযোগ) রাখা হয়নি। এতে ভবিষ্যতে প্রকল্পটি ডাবল লাইন করতে ব্যয় অনেক বেশি হবে। এছাড়া প্রকল্পটির এক্সিট প্ল্যান নেই। পাশাপাশি চুক্তিপত্রের অন্তর্ভুক্ত মাটির কাজসহ অন্যান্য কাজের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্প ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

উল্লেখ্য, খুলনা-মংলা বন্দর রেলপথ নির্মাণে প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার ৭২১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে ভারতীয় ঋণ ছিল এক হাজার ২২ কোটি ৩১ লাখ টাকা ও সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৫১৯ কোটি আট লাখ টাকা সরবরাহের কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং বিস্তারিত নকশা প্রণয়নশেষে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায়। এতে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়ায় তিন হাজার ৮০১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এক হাজার ৪৩০ কোটি ২৬ লাখ টাকা ও ভারতীয় ঋণ পাওয়া যাবে দুই হাজার ৩৭১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে গেছে দুই হাজার ৮০ কোটি ২২ লাখ টাকা।

উৎসঃ ইনকিলাব

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here