পোশাক খাতের সমালোচনা করে দেশের ক্ষতি করবেন না: অনন্ত জলিল

148
Ananta Jalil

পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা অর্থনীতিতে বড় অবদান রেখেও নানান সমালোচনার শিকার হচ্ছেন বলে জানালেন এজিআই গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অনন্ত জলিল। তিনি বলেছেন, দয়া করে সমালোচনার মাধ্যমে গার্মেন্টস মালিকদের নিরুত্সাহিত করে দেশের ক্ষতি করবেন না।

সম্প্রতি এক সাক্ষাত্কারে পোশাক শিল্পের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ‘র সমন্বয়ে এই নতুন গার্মেন্টস নীতিমালা তৈরির দাবি জানিয়েছেন এই উদ্যোক্তা।

চলচ্চিত্র অভিনেতার বাইরেও অনন্ত জলিলের বড় পরিচয় তিনি পোশাক খাতের একজন সফল উদ্যোক্তা। গার্মেন্টস ব্যবসার পাশাপাশি চলচ্চিত্র ব্যবসায়ও বিনিয়োগ করেছেন তিনি। নিজের সিনেমায় নতুনত্ব ও বৈচিত্র আনার চেষ্টা করে আলোচিত হন অনন্ত জলিল। ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার থেকে বিবিএ এবং ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন শেষে ১৯৯৯ সালে উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি।

সম্প্রতি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের মার্চ মাসের মজুরি, এই সংক্রমণের সময় কাজে করতে বাধ্য করা-এমন নানা সংকট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠে। এই সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে একজন পোশাক খাতের উদ্যোক্তা হিসেবে অনন্ত জলিল আবারও আলোচনায় উঠে আসেন।

তিনি বলেন, একটি পোশাক কারখানা তৈরি করা থেকে পরিচালনা করা পর্যন্ত অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয় একজন উদ্যেক্তাকে। নানা প্রতিবন্ধকতা আর দিন-রাত শ্রম দিতে যখন রাতে ঘুমাতে যায় তখনও সব চিত্র একে একে মাথায় ঘুরতে থাকে। চোখের সামনে ভাসতে থাকে অর্থলগ্নি থেকে শুরু করে নিজেদের স্থাবর সম্পদ ব্যাংকে মর্টগেজ। মজুরি দিতে না পেরে কখনো কখনো স্ত্রীর গয়না বিক্রির কথা। কাজ পেতে ক্রেতা সন্তুষ্টির গল্প আরো করুণ।

তিনি বলেন, একজন মালিককে ৬০ কেজি ওজনের নমুনার ব্যাগ নিয়ে ক্রেতাদের দরজায় দরজায় যেতে হয়। তুলে ধরতে হয় কারখানা ও দেশের ভাবমুর্তি। এরপর যদি কাজ আসে। শ্রমিক মজুরি, কারখানার খরচ, বিভিন্ন পরিষেবার বিল ব্যাংক ঋণের কিস্তি এবং অন্যান্য খরচ বিশাল বোঝা মাথায় নিয়ে প্রতিদিন পথ চলতে হয় একজন উদ্যেক্তাকে। এরপরও থাকে নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা। এগুলোকে মাথায় নিয়েই এগিয়ে যেতে হয় একজন উদ্যেক্তাকে।

তৈরি পোশাক খাতে বিশ্বব্যাপি আলোড়ন সৃষ্টি করা দুর্ঘটনার কথা তুলে ধরে অনন্ত জলিল কালের কণ্ঠকে বলেন, পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় দুঃসময় শুরু হয় রানা প্লাজা ধসের পর। এর ফলে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। চরম নেতিবাচক সংকটে পড়ে বাংলাদেশ। এই পরই দেশের উদ্যেক্তাদের ওপর নেমে আসে ক্রেতাজোটদের খড়গ। কারখানা সংস্কারে উত্তর আমেরিকার ক্রেতাজোট সংগঠন অ্যালায়েনস এবং ইউরোপের ক্রেতাজোট অ্যাকর্ডের আর্বিভাব ঘটে। এই ক্রেতাজোটের কারখানা সংস্কারের নামে নেমে উদ্যেক্তাদের মাঝে নেমে আসে এক ধরনের দমন-পীড়ন। তাদের কথামত কাজ করতে গিয়ে মালিকদের কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয়। অনেক মালিক কিছু বির্তকিত এবং তাদের চাপানো কাজ করতে গিয়ে আজ সর্বশান্ত।

নিজের কারখানার সংস্কারের কথা বলতে গিয়ে অনন্ত জলিল বলেন, আমার কারখানার সংস্কারে খরচ করতে হয় ১৮ কোটি টাকা। এই সময় মনে হয়েছিল গার্মেন্টস বন্ধ করে দিয়ে শুধুমাত্র বাণিজ্যিক সিনেমা করব। কারণ সেই সময়ের এক থেকে দেড় বছর সময়টার প্রতি মিনিট কিভাবে কেটেছে তা সহ্য করার ক্ষমতা ছিলো না।

সংস্কারের ক্রেতা গোষ্ঠির বিড়ম্বনার কথা তুলে ধরে অনন্ত জলিল আরো বলেন, অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স আসার আগেও সংস্কার কাজে পাঁচ কোটি টাকা খরচ করতে হয়। পরবর্তীতে অ্যার্কোড, অ্যালায়েন্স চলে যাওয়ার র সব বাতিল করে নতুন করে ইউ এল স্যাটিফাই সিস্টেম প্রতিঃস্থাপন করতে হয়। পুনরায় আমাকে আবার ১০ কোটি টাকা ওপরে খরচ করতে হয়। স্ট্রাগল করতে করতে আমার মত অনেক গার্মেন্টস মালিক আজ নিঃস্ব।

পোশাক খাত বাঁচিয়ে রাখতে উদ্যেক্তাদের কথা তুলে ধরে অনন্ত জলিল আরো বলেন, আমরা গার্মেন্টস মালিকরা অবিরাম চেষ্টা করে যাচ্ছি এই খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে। কাজ না থাকলেও ২০১৩ সালে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি পায় ৭০ শতাংশের বেশি। ২০১৮ সালে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি পায় ৫০ শতাংশের বেশি। এছাড়া প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধি পায়।

তিনি বলেন, মজুরি নিয়মিত করা এবং বৃদ্ধির বিষয়টি ক্রেতারা নজরদারি করলেও পোশাকের দাম বাড়ায়নি এক সেন্টও উল্টো কমেছে। গত সাত বছরে বিশ্ববাজারে পোশাকের দাম কমেছে ৩০ শতাংশের বেশি। নায্য দাম না পাওয়ায় এবং ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আমার কম্পানির ঋণ বেড়ে গেছে। ২০০৮ সালে যা ছিল ১৪ কোটি টাকা। ২০২০ সালে এসে দাড়িয়েছে ১৬৫ কোটি টাকা।

পোশাকের নায্য দাম নিয়ে নীতিমালা করার সময় এসেছে উল্লেখ করে এই উদ্যোক্তা বলেন, প্রতিটি পণ্যের কোড অনুযায়ী সর্বনিম্ন দাম নির্ধারণ করে নীতিমালা তৈরি করতে হবে। প্রতিটি গার্মেন্টসকে চারটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে এর মূল্য নির্ধারন করা যেতে পারে। এই নীতিমালার বাইরে কেউ কোন অর্ডার নিতে বা দিতে পারবে না। যদি কোন গার্মেন্টস মালিক নির্ধারিত মূল্যের নিচে অর্ডার নেয় তাহলে ব্যাংক ব্যাক টু ব্যাক এলসি করার অনুমতি দিবে না।

পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ প্রনোদনা প্যাকেজ সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই দুঃসময়ে তাঁর এই বিশেষ ঘোষণায় পোশাক খাতের মালিকরা চির কৃতজ্ঞ থাকবে। এই সিদ্ধান্তের কারণে এই লাখ লাখ শ্রমিকের মজুরি নিশ্চিত হবে।

অর্থনীতিতে পোশাক খাতের অবদান তুলে ধরে এজিআই গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, মোট রপ্তানি আয়ের এই খাতের অবদান ৮৪ শতাংশ। গত অর্থবছরে এই খাত থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। অথচ যাদের দেশের অর্থনীতিতে কোন অবদান নেই তাদের মুখেই সমালোচনার ফুলঝুরি। ঘরে বসে ভিডিও করে হিরো হতে চাচ্ছেন। যেখানে অর্থনীতিতে আপনাদের কোন অবদান নেই সেখানে স্যোশাল মিডিয়াতে গিয়ে এই ধরনের সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকুন। সমালোচনা করার পরিবর্তে দেশের জন্য কিছু একটা করে রোল মডেল হয়ে যান, যাতে মানুষ আপনাকে অনুসরন করতে পারে। দয়া করে কোন ধরনের তির্যক বক্তব্যের মাধ্যমে গার্মেন্টস মালিকদের নিরুসাত্সাহিত করে দেশের ড়্গতি করবেন না।

অনন্ত জলিল জানান, আমার প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ১১ হাজার কর্মী কাজ করছে। ২০২১ সালের মধ্যে আরো ১৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি।

সূত্রঃ কালের কণ্ঠ

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here