বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে বাংলাদেশে সাংবাদিকের হাতে হাতকড়া: শৃঙ্খলিত সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিক নির্যাতনের ভয়াবহতা

347

লোকমান আহম্মদ আপন 

বিশ্ব মহামারী করোনার কারণে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে নীরবেই পার হয়েছে মে ওয়ার্লড প্রেস ফ্রিডম ডে বা বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। দিবসটিকে সামনে রেখে বাংলাদেশের গণমাধ্যম এবং গণমাধ্যম কর্মী বা সাংবাদিকদের অবস্থা কেমন, এই প্রশ্নের এক শব্দের উত্তর খুঁজলে যথাযথ উত্তর হবেকরুণ। বাংলাদেশে গণমাধ্যম কর্মীরা করুণ এবং কঠিন সময় পার করছেন। সংবাদ মাধ্যমগুলো চলছে অঘোষিত আওয়ামী সেন্সরশীপের মধ্য দিয়ে। আওয়ামী লীগ সরকার, তাদের নেতাকর্মী এবং আওয়ামী প্রশাসন অবৈধ ক্ষমতার দাপটে এবং তাদের অপকর্ম ঢাকতে গণমাধ্যমকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছে। গণমাধ্যম কর্মীদেরকে দেদারছে করছে নানান রকম নির্যাতন। সেটা আবারও প্রমাণিত হলো করোনাকালীন সময়ে সারা বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক নির্যাতনের চিত্র দেখে।

প্রহসনের নির্বাচনের নামে জোর করে ক্ষমতায় জেঁকে বসা আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে কঠোরভাবে শৃঙ্খলিত  করে রেখেছে। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনসহ সবকটি নির্বাচনে সংবাদ মাধ্যমকে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রেখেছিলো আওয়ামী লীগ সরকার। তারই ধারাবাহিতকায় করোনা মহামারী সংক্রান্ত সংবাদ প্রচার করার কারণে বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক মামলা হামলাসহ বিভিন্ন রকম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে করোনা মহামারীর এই মহা দুর্যোগকালীন সময়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্যে বরাদ্দকৃত চাল, ডাল, তেলসহ বিভিন্ন পন্য সামগ্রী আত্নসাতের উৎসবে মেতে উঠেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান, মেম্বার স্থানীয় নেতকর্মীরা। সেসব খবর সংগ্রহ প্রচার করতে যেয়ে সারা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী প্রশাসনের মামলা হামলা শিকার হয়েছেনে অসংখ্য সংবাদকর্মী। তাদের অত্যাচারে অনেক সাংবাদিক জীবন নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। হুমকী দেয়া হচ্ছে প্রবাসী লেখক সাংবাদিকদের পরিবার পরিজনক।

বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ভয়াবহতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নিন্দা জানিয়েছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ অনেকে। বাংলাদেশের সাংবাদিক নির্যাতনের ভয়াবহতায়  গভীর উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার জন্যে কাজ করা প্যারিস ভিত্তিক বিশ্বের শীর্ষ সংস্থা রিপোর্টার সো ফন্টিয়ার বা রিপোর্টার উইদাউট বর্ডারস। এসব সংস্থার প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বশীলদের বরাবরে বারবার তাদের গভীর উদ্বেগ জানানোর পরেও কোন প্রতিকার হচ্ছেনা। উল্টো দিনদিন গণমাধ্যম কর্মীদের উপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়েই চলেছে। নির্যাতনের শিকার গণমাধ্যম কর্মীরা আইনের আশ্রয় নিয়েও তেমন কোন প্রতিকার বা সহায়তা পান না। ক্ষমাতাসীনদের ভয়ে তাই নির্যাতিত হয়েও অনেক সাংবাদিক আইনের আশ্রয় নিতে সাহস পান না বলে বিবিসি তাদের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।  

এদিকে সরকার দলীয় সাংসদ সাইফুজ্জামান শিখর এর দায়ের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার একদিন পর ১০ মার্চ ২০২০ নিজ অফিসের সামনে থেকে তুলে নিয়ে গুম করে ফেলা হয় সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে। সাংবাদিক কাজল যেদিন গুম হন সেদিনই কাজলের উপর আরেকটি মামলা দায়ের করেন আওয়ামী লীগের সদস্য উসমিন আরা বেলি। নানা উদ্বেগ উৎকন্ঠায় দিন কাটাতে থাকে নিখোঁজ সাংবাদিক কাজলের পরিবার। গুম হওয়ার ৫৩ দিন পর মে ২০২০ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে গুম হওয়া সাংবাদিক কাজলকে যশোরে গ্রেফতার দেখিয়ে হাতে হাতকড়া পরিয়ে জনসমক্ষে হাজির করে পুলিশ। গণমাধ্যম মুক্ত দিবসে সাংবাদিকের হাতে হাতকড়া পরিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার তাদের প্রশাসন বাংলাদেশের গণমাধ্যম কর্মীদেরকে রেড সিগনাল দিয়েছে প্রমাণ দিয়েছে তাদের অবৈধ ক্ষমতা অবৈধ দাপটের। আওয়ামী লীগ প্রমাণ দিয়েছে বাংলাদেশের গণমাধ্যম মুক্ত নয়, বাংলাদেশের গণমাধ্যম শৃঙ্খলিত। বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ভয়াবহতা প্রমাণ করে সাংবাদিকদের জন্যে বাংলাদেশ কতোটা ভয়ংকর, কতোটা অনিরাপদ। বাংলাদেশে সাংবাদিকদের পাশাপাশি মামলা হামলার শিকার হচ্ছেন মুক্তমনা অসংখ্য মানুষ।  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের কিংবা আওয়ামী লীগের কোন নেতা কর্মীর দুর্নীতি অপকর্ম সম্পর্কিত কোন কিছু পোষ্ট বা শেয়ার দিলেই হতে হচ্ছে তথাকথিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ নানান কঠিন আইনে মামলা হামলার শিকার। আওয়ামী দুঃশাসনের অবসান না হলে মুক্ত হবেনা বাংলাদেশের শৃঙ্খলিত গণমাধ্যম, কমবেনা সাংবাদিক নির্যাতনের ভয়াবহতাও।

 

 লোকমান আহম্মদ আপন : লেখক সাংবাদিক প্যারিস, ফ্রান্স।

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here