ভারতের মতো শ্রীলঙ্কাতে মুসলিম দমনে করোনার ব্যবহার

194

অস্থিতিশীলতা, দুর্দশা ও নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে বিশ্ব। মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে অনেক দেশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারকে অস্তিত্ব সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে এই ভাইরাস। এসব দেশের রক্ষণশীল রাজনীতিবিদরা এই জনস্বাস্থ্য সঙ্কটকে দ্রুত ও দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা সেই ব্যর্থতা ঢাকতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে মুসলমানদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, দায় চাপিয়ে দিচ্ছে তাদের ওপর।

এর ফলে লাখ লাখ মানুষ আজ হুমকির মুখে। শিকার হচ্ছেন চরম বৈষম্যের। অবশ্য মহামারি শুরুর আগে থেকেই এসব মানুষ অমানবিক নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছেন।

বিশ্বের অনেক দেশের মুসলমানরা করোনার কারণে শুধুমাত্র মানবেতর জীবন-যাপনই নয়; তাদের জীবন ও জীবিকাও হুমকির মুখে পড়েছে। বেঁচে থাকাটাও আজ চরম অনিশ্চিত। সেইসাথে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ইসলামোফোবিয়া।

ভারতে দুই শ’ মিলিয়ন মুসলমানের বসবাস। কোভিড- ১৯ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই এই ভাইরাসের জন্য মুসলমানদের “সুপার স্প্রেডার” বলে তকমা দেয়া হয়েছে। দেশটির মিডিয়া এবং ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার জন্য সেদেশের মুসলমানদের দায়ী করছে।

গেল মার্চ মাসে নয়াদিল্লিতে মুসলমানদের একটি সমাবেশের কারণে শহরটিতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠে। ভারতীয় জনতা পার্টির নেতারা ওই সমাবেশকে ‘করোনা টেরোরেজিম’ বলে তকমা লাগান। যারা মসজিদে নামাজ আদায়ের জন্য জড়ো হবেন তাদের সন্ত্রাসীদের মতো শাস্তি দেয়ার ঘোষণা দেন বিজেপি নেতারা। এর ফলে ‘করোনা জিহাদ’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। অনেক মুসলমান বিশেষ করে স্বেচ্ছাসেবী ও ত্রাণ বিতরণকারীদের অকথ্য গালিগালাজ ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়।

মুসলিম ব্যবসায়ীদের সবজিতে ‘করোনাভাইরাস রয়েছে’ অভিযোগ করে তাদের পণ্য বয়কটের আহ্বান জানান বিজেপির উত্তর প্রদেশের এক নেতা। ভারতের অনেক গণমাধ্যমও এই মহামারিতে মুসলমানদের ওপর দায় চাপানোর ভূমিকা রাখছে।

করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার জন্য কট্টরপন্থী রাজনীতিবিদরা মুসলিমদের দায়ী করছে। আর তাদের ঐসব ভিত্তিহীন অভিযোগ সরকার সমর্থিত গণমাধ্যম ও সংস্থাগুলো অনবরত প্রচার করছে। এর ফলে, যে মুসলমানরা কয়েক মাস আগে নয়াদিল্লিতে একটি অনুষ্ঠান থেকে বেঁচে ফিরে ছিল। এখন তার চেয়েও বড় আক্রমণের শিকার হচ্ছেন।

ভারতে ‘ইসলামোফোবিয়া’ ছড়িয়ে দিতে করোনাভাইরাসকে একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে বিজেপি সরকার। করোনা মোকাবিলায় নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এবং সাধারণ মানুষের মনোযোগ ভিন্নখাতে নিতে মুসলমানদের বলির পাঠা বানানো হয়েছে। এছাড়া, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের কুসংস্কারকেও এই কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কাতেও মহামারিতে সেদেশের সরকার মুসলমানদের কলঙ্কিত করছেন এবং করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার জন্য মুসলিমদের ওপর দায় চাপাচ্ছেন।

দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা বহুধর্ম ও বহুজাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য সম্পন্ন একটি প্রাণবন্ত দেশ। তবে কয়েক বছর ধরে দেশটির মিডিয়া ও রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে ক্রমাগতভাবে ইসলামোফোবির প্রচার ছড়িয়ে পড়ছে, উগ্র মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর হামলা এবং বিশ্বজুড়ে ইসলামোফোবিয়া দেশটির মূলধারার মুসলমানদের বৈষম্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ওই দেশের কট্টরপন্থীদের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকা হচ্ছেন মুসলিমরা। সংখ্যালঘু মুসলমানদের রক্ষা এবং হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনতে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

শ্রীলঙ্কায় করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর বর্তমান সরকারের ঘনিষ্ঠ কিছু গণমাধ্যম ও জাতীয়তাবাদীরা এই ভাইরাসের সংক্রমণের জন্য মুসলমানদের দায়ী করছে। অথচ দেশটির মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ মুসলমান। ভারতের মতো, তারাও মুসলমানদের ধর্মীয় অনুশীলনগুলোকে ‘সুপার স্প্রেডার ইভেন্ট” হিসাবে চিহ্নিত করেছে। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রীলঙ্কায় মুসলিম বিক্রেতাদের কাছ থেকে খাবার না কেনার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।

এপ্রিল মাসে, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ পোড়ানো বাধ্যতামূলক করে শ্রীলঙ্কা সরকার। যা ইসলামিক দাফনের রীতির লঙ্ঘন। শ্রীলঙ্কান সরকারের ঐ পদক্ষেপ কেবলমাত্র একজন মুসলমানকে তার মৌলিক ধর্মীয় অধিকার থেকেই বঞ্চিত করা হয়নি, সেই সাথে ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে মুসলিম ধর্মীয় অনুশীলনগুলো যে ব্যাপক অবদান রাখছে তাও আড়াল করা হয়েছে।

ইসলাম ধর্মে পবিত্রতা ও সম্মানের সাথে লাশ দাফনের বিধান রয়েছে। লাশ দাফনের জন্য চারটি নিয়ম অবশ্যই পালন করতে হয়। সেগুলো হলো- একজন ব্যক্তি ইন্তেকালের পর মরদেহ গোসল করানো। পরিষ্কার কাফনের কাপড় দিয়ে মরানো। অল্প সংখ্যক মানুষ হলেও জানাজার নামাজ আদায়ের পর সম্মানের সাথে দাফন করা।

ভাইরাসের বিস্তার রোধে লাশ দাফনের ক্ষেত্র যখন প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হলো। তখন শ্রীলঙ্কাসহ অন্যান্য দেশের বেশির ভাগ মুসলিম সম্প্রদায়, তাদের দাফন পদ্ধতি যথাযথভাবে সামঞ্জস্য করতে সম্মত হয়েছিল। বিশেষ করে প্রথম দুটি কর্তব্য সম্পর্কে।

করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির লাশ পোড়ানো হলে ভাইরাস ছড়াবে না, এর বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। ইউরোপ থেকে আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকা থেকে শুরু করে বিশ্বের সব দেশ করোনায় আক্রান্তের লাশ সেই দেশের সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দাফন করে থাকে, যাতে কোনো ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি না হয়।

কোভিড-১৯-এ আক্রান্তের লাশ পড়ানোর সিদ্ধান্তটি শ্রীলঙ্কা সরকারের জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় নয় বরং ইসলামোফোবিয়ার নির্মম আচরণ। অত্যন্ত আশঙ্কার সাথে বলতে হচ্ছে, মহামারির মধ্যে ভারত মডেলে শ্রীলঙ্কা সরকার তাদের জনগণকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করছেন।

করোনা সঙ্কটের কারণে শুধুমাত্র ভারত ও শ্রীলঙ্কাতেই মুসলমানরা চরম বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন না। চীনের উইঘুর এবং সংখ্যালঘু তুর্কি মুসলিমরাও চীনা সরকারের হাতে অকল্পনীয় ও নির্দয় নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

জাতিসঙ্ঘের তথ্যমতে, ১০ লাখ উইঘুর মুসলিম চীনা সরকারের কথিত ‘রি-এডুকেশন ক্যাম্প’-এ অস্বাস্থ্যকর এবং জটিল শর্তে বন্দি রয়েছেন। তাদের সঙ্কটের প্রাথমিক অবস্থা লিখেছি মাত্র। নভেল করোনাভাইরাস তাদের আরো ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। তারা জরুরি স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ পাচ্ছেন কিনা তাও জানা নেই।

এছাড়া, ২০১৭ সালে রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন ও নির্যাতন চালানো হয়। যার কারণে এরইমধ্যে জাতিসংঘের আদালতে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে ঐ নির্যাতন আরও বেড়েছে।

আজ, কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবের বসবাস করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনাকীর্ণ এসব শিবিরে কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়া প্রায় নিশ্চিত। আর যদি ছড়িয়ে পড়ে তাহলে মারাত্মক ক্ষতি হবে। রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে এরইমধ্যে গেল সপ্তাহে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে।

চীন এবং মিয়ানমার সরকার মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের অপরাধ থেকে মনোযোগ ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে মহামারি করোনাভাইরাসকে ব্যবহার করছে।

বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক নেতারা এই মহামারিকালীন সময়ে স্বল্পমেয়াদী লাভের জন্য বর্ণবাদ, জেনোফোবিয়া ও ইসলামফোবিয়াকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। কোভিড-১৯ যেন ফ্যাসিবাদের উত্থানে অবদান রাখতে না পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক নেতাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে বিশ্বকে অবিলম্বে জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

উৎসঃ   নয়াদিগন্ত

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here