মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে নিম্নবিত্ত মানুষের

54

দেহের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও ভিটামিনযুক্ত খাদ্য খেতে না পারায় দেশে নিম্ন আয়ের মানুষের একটি বড় অংশ এমনিতেই সারাবছর অপুষ্টিতে ভোগেন। এর ওপর সারাদেশে অঘোষিত লকডাউনে তারা উপার্জনহীন হয়ে পড়ায় এবং সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ হিসেবে শুধু চাল-ডাল-তেল-আলু পাওয়ায় সে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তারা কোনোভাবে দুমুঠো খেয়ে জীবন ধারণ করলেও মাছ-মাংস-ডিম, শাক-সবজি ও ফলমূলসহ প্রোটিন ও ভিটামিনযুক্ত খাদ্য খেতে না পারায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে তারা করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের মৃতু্য ঝুঁকি অনেক বেশি বাড়ছে।

করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, গত ৮ মার্চ থেকে ১৬ মে পর্যন্ত ৭০ দিনে দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে যে ২৯৮ জনের মৃতু্য হয়েছে তার প্রায় ৪০ শতাংশই নিম্নবিত্ত। বাকি ৬০ শতাংশের আরও একটি বড় অংশ নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির। যারা বেশিরভাগই অপুষ্টিতে ভুগছিলেন। বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও যেভাবে দ্রম্নত করোনার বিস্তার ঘটছে, তাতে নিম্ন আয়ের মানুষের পুষ্টি ঘাটতি দ্রম্নত পূরণ করা না গেলে তাদের মধ্যে সংক্রমিত হওয়ার সংখ্যা যেমন বাড়বে, তেমনি মৃতু্যর হার যথেষ্ট বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক স্বাস্থ্য বুলেটিনে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে সবাইকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও নিম্নবিত্তের ঘরে এ জাতীয় খাদ্য পৌঁছানোর এখনো কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার। এমনকি ঢাকাসহ সারাদেশের করোনার ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতেও চিকিৎসাধীন রোগীর জন্য যে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে তাও যথেষ্ট প্রোটিন ও ভিটামিনযুক্ত নয়। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালে এ দুরবস্থা অনেক বেশি। ফলে সেখানে চিকিৎসাধীন নিম্নবিত্তের রোগীরা চরম ঝুঁকিতে পড়ছে। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা নিয়ম অনুযায়ী খাবার দিচ্ছে। তবে রোগীর খাবারের জন্য সরকারি যে বরাদ্দ, তাতে ফলমূলসহ পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ করা অসম্ভব বলে তারা স্বীকার করেন।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা জানান, নিম্নবিত্তের মানুষ উপার্জনহীন হয়ে পড়ায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা অনেকটা তলানিতে এসে ঠেকেছে। এদের বেশিরভাগই এখন সরকারি-বেসরকারি ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল। অথচ প্রায় কোনো ত্রাণেই প্রোটিন ও ভিটামিনযুক্ত খাবার নেই। ফলে তাদের শরীরে ভিটামিন এ, ডি, ই, কে এবং সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম ইত্যাদি খনিজের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। আর অপুষ্টিজনিত কারণে একদিকে যেমন অ্যান্টিবডি তৈরি না হওয়ায় রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে কোষগুলোর কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে বা কোষ বার্ধক্য দ্রম্নতগামী করছে। পুষ্টিবিদরা জানান, এ, ডি, ই, সি, সেলেনিয়াম, ও কপার ‘অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট’ হিসেবে কোষকে সজীব, সতেজ রাখে। যার ঘাটতি করোনায় আক্রান্ত নিম্নবিত্তের মৃতু্যকে ত্বরান্বিত করছে।

দেশের প্রখ্যাত পুষ্টিবিদরা জানান, করোনায় মৃতু্যর হার কমানোর অন্যতম প্রধান উপায় হলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো। এছাড়া নূ্যনতম শারীরিক পরিশ্রম কোষ ও অঙ্গে রক্ত চলাচল ও লসিকা রসের অতিরিক্ত সঞ্চালন ঘটায়। ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কারণ এ লসিকাই শ্বেতরক্তকণিকা নামক অস্ত্রগুলো বহন করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে পৌঁছে দেয়। এছাড়া মানসিক সচলতা বৃদ্ধি পায়, স্ট্রেস কমায়। যথেষ্ট পরিমাণে ঘুমনোও ‘ইমিউন সিস্টেম’কে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। অথচ নিম্ন আয়ের মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ায় তাদের শারীরিক শ্রম যেমন কমেছে, তেমনি দুমুঠো খাবার সংগ্রহের দুশ্চিন্তায় স্ট্রেস বেড়েছে। আর এর বৃদ্ধিতে শরীরে কর্টিসল নামক স্টেরয়েড বেশি মাত্রায় ক্ষতি হয়, যা ‘ইমিউন সিস্টেম’কে যে শুধু ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তা-ই নয়, তার সঙ্গে রক্তচাপ বৃদ্ধি করে, ডায়াবেটিসের আশঙ্কা তৈরি করে। রক্তে শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে কোষে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপাদান ঢোকার বিষয়টি বাধাপ্রাপ্ত হয়। বিশেষ করে ভিটামিন সি-এর কার্যক্ষমতা, এতে কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পুষ্টিবিদরা জানান, মানবশরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক, অপ্রয়োজনীয় পদার্থ, জীবাণু ইত্যাদির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মানবশরীরের মধ্যেই একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। সংবহনতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র, শ্বাসতন্ত্রের মতো এটিও একটি ‘সিস্টেম’। একে বলা ‘ইমিউন সিস্টেম’ বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা। মানব শরীরের বিভিন্ন ধরনের শ্বেতরক্তকণিকা, যেমন- ম্যাক্রোফাজ, লিম্ফোসাইট, নিউট্রোফিলের মতো কোষ এবং এই কোষ নিঃসৃত কিছু নির্দিষ্ট জৈব যৌগ নিয়ে এই ‘ইমিউন সিস্টেম’ তৈরি হয়। থাকে কিছু অঙ্গও।

শরীরে যে ক্ষতিকারক পদার্থ প্রবেশ করে তা ‘অ্যান্টিজেন’। মানবশরীরে থাকা বিভিন্ন লিম্ফোসাইট এই অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তৈরি করে ‘অ্যান্টিবডি’। এ ‘অ্যান্টিবডি’ বা ইমিউনোগেস্নাবিউলিন তৈরি হয় যকৃৎ বা লিভারে তৈরি হওয়া ‘গেস্নাবিউলিন’ নামের সরল প্রোটিন সহযোগে। সহজভাবে বলতে গেলে মানবশরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার মূল সৈনিক ‘অ্যান্টিবডি’ বা ‘ইমিউনোগেস্নাবিউলিন’ তৈরিতে প্রয়োজন প্রোটিন। সুতরাং, যার যত পোক্ত লিভার ও যে যত প্রোটিনজাত খাদ্য খাবেন, তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তত ভালো হবে। অর্থাৎ পুষ্টির সঙ্গে জড়িত ‘ইমিউনিটি’ বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা। এছাড়া ‘ইমিউন সিস্টেম’ কর্মক্ষম ও কার্যকর থাকার পেছনে আরও দরকার ভিটামিন ও উৎসেচক। সেগুলো তৈরির উপকরণও খাদ্যের মধ্যে থাকা প্রয়োজন।

তাই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ, করোনা পরিস্থিতিতে আকস্মিক কর্মহীন হয়ে পড়া নিম্ন আয়ের মানুষ যাতে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন এবং প্রাণিজ প্রোটিন কিনে খেতে পারে সে জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া। সার্বিকভাবে পুষ্টিতে জোর দিলে রোগ প্রতিরোধে দেশ ‘আত্মনির্ভর’ হতে পারবে বলে মনে করেন তারা।

এদিকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় করোনায় মৃতু্যঝুঁকি বৃদ্ধির প্রধান যে ৫টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে পুষ্টিহীনতা এবং এ কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতিকে অন্যতম বলে উলেস্নখ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বলছে, কোভিড-১৯ নতুন রোগ। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য এবং এই কয়েক মাসের অভিজ্ঞতা বলছে, এই ভাইরাস অন্য রোগে আক্রান্তদের মৃতু্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া পুষ্টি ঘাটতির কারণে যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের মৃতু্যর দুয়ারে টেনে নিয়ে যেতে পারে। এ ধরনের মানুষ করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের লক্ষণ গুরুতরভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। তাদের লাইফ সাপোর্টে পর্যন্ত নিতে হচ্ছে। পরে বেশি সংখ্যক এ ধরনের মানুষ মারা যাচ্ছে।

বারডেম হাসপাতালের পুষ্টি বিভাগের প্রধান পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ বলেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধের প্রথম ধাপ হলো ব্যক্তিগত সচেতনতা গড়ে তোলা এবং প্রত্যেকের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্থাৎ ইমিউন সিস্টেম বাড়িয়ে তোলা। ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের যে মারাত্মক লক্ষণ অর্থাৎ শ্বাসযন্ত্র এবং পরিপাকতন্ত্রের সংক্রমণ, সেগুলো সহজে প্রতিরোধ করা সম্ভব। আর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রতিদিন বেশি পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে।

করোনার বিরুদ্ধে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে বিশিষ্ট এই পুষ্টিবিদ উজ্জ্বল রঙের ফল কমলালেবু, পেঁপে, আঙুর, আম, কিউই, আনার, তরমুজ, বেরি, জলপাই, আনারস এবং পারপেল-লাল পাতা কপি, বিট, ব্রোকলি, গাজর, টমেটো, মিষ্টি আলু ও ক্যাপসিকামসহ উজ্জ্বল রঙের সবজি খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়া ডিম, সবুজ শাক, মুরগির মাংস, কলিজা, দুধ জাতীয় খাবার, কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, পেস্তা বাদাম, বাদাম তেল, বিচি জাতীয় ও ভেজিটেবল অয়েল, জলপাইয়ের আচার, আমলকী, লেবুসহ বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন এ, ই, সি সমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খাদ্য তালিকায় যুক্ত রাখার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। গ্রিন টি, লাল চায়ে এল-থেনিন এবং ইজিসিজি নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা আমাদের শরীরে জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অনেক যৌগ তৈরি করে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে বলে জানান পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ।

এদিকে এসব প্রোটিন ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে স্বল্প সংখ্যক খাবারের কম দাম হওয়ায় তা খাওয়া নিম্নবিত্তের মানুষের পক্ষে কিছুটা সম্ভব হলেও বেশির ভাগ খাদ্যই তাদের ক্রয়ক্ষমতার অনেক বাইরে। ফলে করোনায় আক্রান্ত কিংবা সুস্থ থাকা নিম্নবিত্ত মানুষ এ মরণব্যাধি থেকে বাঁচতে এসব খাবার খাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানলেও তা কোনোভাবেই খেতে পারছেন না।

জ্বর, কাশি ও গলা ব্যথাসহ বেশকিছু উপসর্গ নিয়ে করোনা শনাক্ত হওয়ার পর হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা মুগদার ভ্যানচালক মফিজউদ্দিন জানান, চিকিৎসক তাকে বারবার প্রোটিন ও ভিটামিনযুক্ত নিয়মিত খাবার খাওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। অথচ উপার্জন না থাকায় তিনি ও তার পরিবার এখন শুধু সরকারি-বেসরকারি ত্রাণের ওপর নির্ভর করে জীবন চালাচ্ছেন। তার ভাষ্য, ত্রাণের আলু ভর্তা-ভাজি খেতে যে তেল-পিঁয়াজ-মরিচ-লবণ লাগবে তা কেনার টাকাই এখন তার হাতে নেই, সেখানে ফল-মূল, মাছ-মাংস, ডিম-দুধ কিনবেন কী দিয়ে?

একই ধরনের দুরবস্থার কথা জানিয়ে করোনায় আক্রান্ত যাত্রাবাড়ীর হকার অসীম সাহা জানান, কয়েক হাসপাতাল ঘুরে ভর্তি হতে না পেরে তিনি বাসাতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী উচ্চমাত্রার অন্টিবায়োটিক খাবার পর তার শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় চিকিৎসক তাকে বারবার প্রোটিন ও ভিটামিনযুক্ত খাবার খাওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন। অথচ অর্থাভাবে তার পুরো পরিবারই এখন আধাপেটা খেয়ে দিন পার করছে। এ অবস্থায় তিনি প্রোটিন ও ভিটামিনযুক্ত খাবার কীভাবে খাবেন- প্রশ্ন তোলেন অসীম।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা জানান, বেঁচে থাকার তাগিদ কর্মহীন নিম্নবিত্তরা ত্রাণ ও কাজের খোঁজে এদিক-ওদিকে বেশি ছোটাছুটি করছেন। এ কারণে করোনায় আক্রান্তের হার এ শ্রেণিতেই বেশি। এর ওপর পুষ্টিঘাটতির কারণে তারাই বেশি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তাই দেশের করোনায় আক্রান্তদের সার্বিক মৃতু্যর হার কমাতে হলে এ শ্রেণির মানুষকে যেকোনোভাবে নূ্যনতম পুষ্টিকর খাবারের জোগান দিতে হবে। তা না হলে করোনা সংক্রমণের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

উৎসঃ   Jaijaidinbd

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here