রাজধানীর চার কেন্দ্রে ফাইজারের টিকা দেওয়া হবে

0 ৩৬

রাজধানীর চারটি কেন্দ্রে দেওয়া হবে ফাইজার-বায়োএনটেক কোভিড-১৯ টিকা। ম্যাসেঞ্জার আরএনএ (এমআরএনএ) ভিত্তিক এ টিকা তাপ ও আলোর প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।

তাই এটা কোনো ভাবেই আলো ও তাপের সংস্পর্শে রাখা যাবে না। এ টিকাও দুই ডোজ দেওয়া হবে। প্রতি ডোজে শূন্য দশমিক ৩ এমএল সমপরিমাণ, যা ২৮ দিনের ব্যবধানে প্রয়োগ করা হবে। সুরক্ষা অ্যাপসের মাধ্যমে নিবন্ধিত জনগোষ্ঠীকে এই টিকা দেওয়া হবে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগ নিশ্চিত করেছে।

অধিদপ্তর জানিয়েছে- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ফাইজারের টিকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

টিকা বৃত্তান্ত : ইন্ট্রামাসকুলার ইনজেকশন অর্থাৎ বাহুর উপরের মাংসপেশিতে প্রয়োগ করতে হবে। সঠিকভাবে টিকা দিতে শূন্য দশমিক ৩ এমএল এডি সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে হবে। যেহেতু ফাইজারের টিকা জমানো, জীবাণুমুক্ত, প্রিজারভেটিভ এবং এডজুভেন্ট মুক্ত, মাল্টি-ডোজ কন্সেট্রেট অর্থাৎ ঘনীভূত তাই মানবদেহে প্রয়োগের আগে অবশ্যই সংমিশ্রণ করতে হবে। এক্ষেত্রে এক ভায়ালের সঙ্গে ডাইলুয়েট মিশ্রণের পর ৬ ডোজ টিকা প্রস্তুত হবে। সংমিশ্রণের জন্য দুই এমএলের সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে হবে।

যাদের টিকা দেওয়া যাবে না : ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা গর্ভবতী মা এবং দুগ্ধদানকারী মায়েদের দেওয়া যাবে না। এলার্জি প্রতিক্রিয়ার ইতিহাস (অ্যানাফাউল্যাক্সিস) থাকলে সেসব ব্যক্তিদের টিকা দেওয়া যাবে না। প্রথম ডোজ দেওয়ার পরে যদি এলার্জিক প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে তাহলে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া যাবে না। কোনো ব্যক্তির শরীরে জ্বর থাকলে (৩৮.৫) ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের বেশি টিকা দেওয়া যাবে না। এমনকি গ্রহীতার যদি কোভিড-১৯ রোগের লক্ষণ থাকলে সেরে না ওঠা পর্যন্ত টিকা দেওয়া যাবে না। এছাড়া অসুস্থ ও হাসপাতালে ভর্তি ব্যক্তিকেও এ টিকা দেওয়া যাবে না।

দ্বিতীয় ডোজ দেয়ার আগে লক্ষণীয় : দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়ার আগে দেখতে হবে, প্রথম ডোজের পর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছিল কিনা। বিশেষ করে ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা, লাল হয়ে যাওয়া, ইনজেকশনের স্থান ফুলে যাওয়া, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, পেশির ব্যথা, সর্দি, আর্থালজিয়া, জ্বর, বমি বমি ভাব ইত্যাদি। এছাড়া ম্যালেইজ, লিম্ফঅ্যাডিনোপ্যাথি, অ্যানফাউল্যাক্সিস ইত্যাদি দেখা গেলেও ব্যবহার করা যাবে না। তাছাড়া টিকা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১৪ দিনের বিরতি থাকতে হবে।

সংরক্ষণের তাপমাত্রা : ফাইজারের টিকা উৎপাদন পর্যায়ে হিমাঙ্কের নিচে ৯০ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ হয়ে থাকে। বিমানবন্দরে একই তাপমাত্রায় এটি সংরক্ষণ ও পরিবহণ করা হয়। ঢাকায় আসার পর কেন্দ্রীয় সংরক্ষণাগারে হিমাঙ্কের নিচে ৮০ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা হয়েছে। তবে নির্ধারিত টিকাদান কেন্দ্র ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা হবে।

টিকাদান কেন্দ্র সরবরাহ পদ্ধতি : টিকা আল্ট্রা কোল্ড ফ্রিজার থেকে বের করার পর ৬ ঘণ্টা ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড তাপমাত্রায় আইএনআর ফ্রিজে রেখে গলিয়ে ব্যবহারে উপযোগী করে নিতে হবে। শূন্য দশমিক ৬ লিটারের ৪টি আইসপ্যাকসহ ফ্রিজ-প্রিভেন্টিভ অথবা ফ্রিজ ফ্রি ভ্যাকসিন ক্যারিয়ারের মাধ্যমে টিকাদান কেন্দ্রর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সরবরাহ করা হবে।

ডাউলুয়েন্ট মেশানোর আগে টিকার ভায়াল অবশ্যই কক্ষের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় পৌঁছাতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট টেবিলের ওপর রাখতে হবে। সংমিশ্রণের পর ভায়ালের লেবেলে সংমিশ্রণের তারিখ এবং সময় লিখে রাখতে হবে। একবার গলানো ভায়াল পুনরায় জমানো যাবে না। সরাসরি আলোর নিচে টিকা রাখা যাবে না। টিকার সঙ্গে সূর্যের আলো এবং আল্ট্রা ভায়োলেট আলোর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে।

সোমবার রাত ১১টা ১৩ মিনিটে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন-গ্যাভির কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটি থেকে ফাইজার বায়োএনটেক উৎপাদিত ১ লাখ ৬০২ ডোজ টিকা ঢাকায় পৌঁছায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভ্যাকসিন ডেপলয়মেন্ট কমিটির সদস্য সচিব ডা. শামসুল হক এ তথ্য জানান। প্রাপ্ত টিকা বিমানবন্দর থেকে মহাখালীতে অবস্থিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির হিমাগারে রাখা হয়।

৩১ ডিসেম্বর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ফাইজার বায়োএনটেক টিকা কোভিড-১৯ মহামারী প্রতিরোধে জরুরি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন করে। এ টিকা বর্তমানে ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সি, যুক্তরাষ্ট্রে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, হেলথ কানাডাসহ আরও অনেক দেশেই অনুমোদন পেয়েছে।

দরিদ্র দেশগুলোর টিকাপ্রাপ্তি নিশ্চিতে গঠিত আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফরম গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের (গ্যাভি) কাছ থেকে ফাইজারের এ টিকা আসছে। প্রাণঘাতী ও সংক্রামক ব্যাধি থেকে দরিদ্র দেশগুলোর শিশুদের জীবন রক্ষায় টিকা প্রদানে ভূমিকা রাখা গ্যাভি বিশ্বের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ৯২টি দেশকে করোনাভাইরাসের টিকা সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। দরিদ্র দেশগুলোর টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে গঠন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম কোভ্যাক্স।

কোভ্যাক্সের প্রথম চালানকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাগত : কোভ্যাক্স থেকে টিকার প্রথম চালান দেশে আসায় স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ সহায়তা বিগত ২০ বছর ধরে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি স্বাস্থ্য অনুদানের সঙ্গে যুক্ত হলো। যুক্তরাষ্ট্র ২০২০ সালের মার্চ থেকে শুধু কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ৭৬ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি সহায়তা করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ টিকার ন্যায্যতার সঙ্গে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে বৃহৎ দাতা দেশ হিসাবে বৈশ্বিক জোট গাভিকে পরিকল্পিত ৪ বিলিয়ন ডলার সহায়তার অংশ হিসাবে সম্প্রতি ২ বিলিয়ন ডলার দেয়ার কথা ঘোষণা করেছে। যা দিয়ে গাভি কোভ্যাক্স অ্যাডভান্স মার্কেট কমিটমেন্টের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ন্যায্যতার সঙ্গে টিকা পৌঁছে দেয়ার কাজ করছে। কোভিড-১৯ মহামারি এ বার্তাই দিয়েছে যে বৈশ্বিক মহামারির বিরুদ্ধে কোনো একটি দেশ একা কাজ করতে পারে না।

সে কারণেই যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ এবং বৈশ্বিক অংশীদাররা এ মহামারি মোকাবিলায় একসঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিলার। তিনি বলেন, এ অভূতপূর্ব বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকটসহ ভবিষ্যতের সংকটগুলো মোকাবিলায় আরও বেশি সংগঠিত ও সহনশীল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি-এর মাধ্যমে কোভ্যাক্সকে দেয়া অনুদান নিরাপদ ও কার্যকর টিকা ক্রয় এবং বিশ্বের ৯২টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও অরক্ষিত মানুষের কাছে টিকা পৌঁছাতে সহায়তা করবে।

jugantor
Comments
Loading...