সবার জন্য সমান সুযোগ প্রসঙ্গে সিইসি । তফসিলের আগে কিছুই করার নেই

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের নেই। এমনকি এ মুহূর্তে কমিশন নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির বিষয়ে সরকারকে কোনো অনুরোধ করবে না।

গতকাল রোববার ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য কর্মপরিকল্পনা’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের সম্ভাবনা এখনো বাতিল করা হয়নি, এ নিয়ে দরজা খোলা আছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত এই পথনকশা প্রকাশ অনুষ্ঠানে ঘুরেফিরে আসে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি। সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি প্রসঙ্গে সিইসির বক্তব্য আইনের দৃষ্টিতে সঠিক বলেই মনে করেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তবে তাঁরা এও বলেছেন, কমিশনকেই রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন করতে হবে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধা বা আস্থার সংকটের কারণ হতে পারে সরকারের এমন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে নৈতিকতার জায়গা থেকে কমিশনকে তাদের অবস্থান তুলে ধরতে হবে।

নির্বাচন কমিশনের এই পথনকশাকে স্বাগত জানিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটসঙ্গীরা এবং সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী মনে করে, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এই পথনকশা কোনো কাজে আসবে না। কেননা, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকলে কমিশনের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়।

 এখন নির্বাচন সহায়ক পরিবেশ আছে বলে মনে করেন কি না, সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে গতকাল সিইসি বলেন, এগুলো নির্বাচন কমিশনের বিষয় নয়। এটি সরকারের বিষয়। কীভাবে সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা যায়, কমিশন শুধু সেটা নিয়ে ভাবে। তফসিল ঘোষণার পর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা হবে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাজ আইনে নির্ধারণ করা আছে। এ মুহূর্তে সরকারের কোনো কাজে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কমিশনের নেই। রাজনৈতিক দলগুলো সভা-সমাবেশ বা মিছিল-মিটিং করার অধিকার না পেলে তাতেও নির্বাচন কমিশনের কিছু করার নেই। তফসিল ঘোষণার পর এসব দেখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।

নুরুল হুদা বলেন, সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকার এবং নির্বাচন কমিশন উভয়ের দায়িত্ব আছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত পল্টনে বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রাজনৈতিকভাবে কে, কীভাবে বক্তব্য দেবে, কে সমাবেশ করতে পারবে বা কে পারবে না—এগুলো সরকারের বিষয়।

এ ব্যাপারে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান সিইসি ঠিকই বলেছেন। কেননা, ইসিকে কাজ করতে হবে আইনের ভিত্তিতে। সারা বছর রাজনৈতিক দলগুলোকে ইসি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এটা কেবল নির্বাচনকালীন ইসি করতে পারে। তিনি বলেন, সবাই যেন সমান সুযোগ পায়, সে জন্য নির্বাচন কমিশনকে সচেষ্ট থাকতে হবে। রাজনৈতিক অঙ্গনে কী হচ্ছে তা ‘নোটিশে’ রাখতে হবে। কিন্তু এখন ইসি বলতে পারবে না এই দলকে এই সুযোগ দাও, ওই দলকে দিয়ো না।

আরেক নির্বাচন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদও মনে করেন, সিইসি সঠিক কথাই বলেছেন।

 ইভিএমের দরজা বন্ধ হয়নি

কমিশনের কর্মপরিকল্পনায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) না থাকলেও সিইসি বলেছেন, তাঁরা আগামী নির্বাচনে ভোট গ্রহণে ইভিএম ব্যবহারের দরজা বন্ধ করে দেননি।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর এবং সরকার সহযোগিতা করলে ইভিএমের ব্যবহার অসম্ভব নয়। তিনি বলেন, ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। দলগুলো ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সংলাপ করে এ বিষয়ে কার কী চিন্তা বা প্রস্তাব, কেমন প্রস্তুতি আছে তা দেখা হবে। সিইসি বলেন, বর্তমানে ৭০০-৮০০ ইভিএম মেশিন আছে। সেগুলোও পাঁচ-ছয় বছরের পুরোনো প্রযুক্তির। নির্বাচনে মোট আড়াই লাখ ভোটকেন্দ্রের জন্য ইভিএম লাগবে। এখানে সরকারেরও আর্থিক সক্ষমতার প্রশ্ন রয়েছে। সব দিক বিবেচনা করে এবং সরকারের সহযোগিতা পেলে ইভিএমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

৩৩ কর্মকর্তার বদলি বিতর্ক

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা বদলির প্রক্রিয়া নিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে, অন্য কমিশনারদের না জানিয়ে সিইসি আর সচিব মিলে রদবদল করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কিছুটা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান সিইসি নুরুল হুদা। তিনি বলেন, ‘এটা তো তালুকদার (নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার) সাহেব জানে। এটা তালুকদার সাহেবের প্রোডাক্ট।’ সিইসি দাবি করেন, কর্মকর্তাদের বদলির বিষয়টি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের এখতিয়ারভুক্ত। এখানে কমিশনারদের সঙ্গে সমন্বয়ের কোনো প্রয়োজন নেই। কোনো কমিশনারের জানারও দরকার নেই।

সাত কর্মপরিকল্পনা জানাল ইসি

প্রায় দেড় বছরমেয়াদি এই পথনকশায় সাতটি কাজকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো আইনি কাঠামো পর্যালোচনা ও সংস্কার চলতি জুলাই থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করা হবে; নির্বাচন প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও যুগোপযোগী করতে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে পরামর্শ ৩১ জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত, সংসদীয় এলাকার নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ জুলাই থেকে ডিসেম্বর, নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও সরবরাহ জুলাই থেকে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত, বিধি অনুসারে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের কাজ ২০১৮ সালের জুন থেকে তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত, নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন এবং নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিরীক্ষা এ বছরের অক্টোবর থেকে আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট সবার সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ভোট গ্রহণের এক সপ্তাহ আগে শেষ করা হবে।

তবে এই কর্মপরিকল্পনা না থাকা বিষয় নিয়েও অংশীজনেরা সংলাপে মতামত দিতে পারবেন। সিইসি বলেছেন, এ কর্মপরিকল্পনা নির্বাচনের পথে কাজ শুরুর একটি সূচনা দলিল। এ কর্মপরিকল্পনাই সব নয়। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে এটি আরও বাস্তবায়নযোগ্য করে তোলা হবে।

পথনকশা অনুযায়ী সুশীল সমাজের সঙ্গে ৩১ জুলাই, গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আগস্টে, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষক, নারীনেত্রী ও নির্বাচন পরিচালনাকারী বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অক্টোবর মাসে পৃথক দিনে সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। সংলাপে পাওয়া সুপারিশগুলো চূড়ান্ত করা হবে ডিসেম্বরে।

অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন নির্বাচন কমিশনের সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। শুরুতে নির্বাচন কমিশনার বেগম কবিতা খানম বক্তব্য দেন। এ সময় মঞ্চে নির্বাচন কমিশনার মাহাবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম ও শাহাদাত হোসেন চৌধুরী এবং অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম প্রথম আলোকে বলেন, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে সরকার সর্বাত্মক সহায়তা করবে। অন্য দলগুলোও সহায়তা করবে বলে তাঁর আশা। রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিষয়ে কমিশনের অবস্থান সম্পর্কে নাসিম বলেন, এই কমিশন সরকারের সঙ্গে কাজ করে নিশ্চয় সন্তুষ্ট। এ জন্যই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে তারা আস্থাশীল। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করবে না। ইভিএমের বিষয়ে তিনি বলেন, ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট হলে ভালো। ইভিএম চালু করলে আওয়ামী লীগ খুশি হবে। তবে না করলেও আপত্তি নেই। সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির বিষয়ে আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য যা কিছু করা দরকার, নিশ্চয়ই নির্বাচন কমিশনের সেসব পরিকল্পনা আছে।

কমিশনের পথনকশা নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘কোনো আলোচনা ছাড়া ঘোষিত পথনকশায় একাদশ সংসদ নির্বাচনের উদ্যোগ চলমান সংকটের সমাধান দেবে না। বিএনপি এখন পর্যন্ত “রোড” দেখতে পাচ্ছে না। ম্যাপ তো পরের প্রশ্ন।’ প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের বিষয়ে ইসির আশাবাদের বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি একটা সভা করার অনুমতি পায় না। দেশে নির্বাচনের কোনো পরিবেশ আদৌ আছে কি না, আগে সেটা দেখতে হবে। তা ছাড়া নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার না হলে ভোট সুষ্ঠু হবে না।

 জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, বর্তমান কমিশন এখন পর্যন্ত ভালো ভূমিকা রেখেছে। তাদের অধীনে স্থানীয় সরকারের কয়েকটি নির্বাচনও ভালো হয়েছে। তাদের সন্দেহ করার মতো অবস্থা হয়নি। এটাও প্রমাণিত হয়নি যে তাঁরা সরকারের পক্ষে কাজ করছেন। এখন দেখতে হবে শেষ পর্যন্ত কী হয়।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেছেন, নির্বাচন কমিশন এক অর্থে বেঠিক কিছু বলেনি। সরকারের দায়িত্ব হলো দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ, সুশাসন বজায় রাখা। আর নির্বাচনের সুযোগ-সুবিধা সবাই যাতে সমানভাবে ব্যবহার করতে পারে, তা নিশ্চিত করা ইসির দায়িত্ব।

আদালতের রায়ে নিবন্ধন বাতিল হওয়া দল জামায়াতে ইসলামীর সেক্রটারি জেনারেল শফিকুর রহমান গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদৌ সম্ভব নয়। তাঁর সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলে তাতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেরই পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

 

আরও সংবাদ

print

LEAVE A REPLY