২২ আগস্টের রায়ে ১৫৩ এমপি অবৈধ!

প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা একটি চাঞ্চল্যকর রায় দিয়েছেন বলে বিভিন্ন দিক থেকে গুজব শোনা যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, ২২ আগস্ট প্রধান বিচারপতি তার বাসভবনে আদালত বসিয়ে একটি রায় দিয়েছেন। বলা হয়েছে, তিনি যে আপিল বিভাগের বিচারপতিদের নিয়ে রায় দিয়েছেন, সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, এই রায় কার্যকর ও বাস্তবায়নের আগে প্রকাশ করা হবে না। দেশে বিশৃঙ্খলা হতে পারে এমন আশঙ্কা করা হয়েছে। ওই রায়ে ১৫৩ জন এমপিকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেওয়া হয়েছে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে রায়টি কার্যকর করার জন্য বলা হয়েছে। সেখানে বর্তমান সরকারের অধীনে নয়, বর্তমান সংসদ ভেঙে দিয়ে আগামী দিনের নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার-পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে।

তবে ওই রায়ের ব্যাপারে এখনো সরকারের কেউ মুখ খুলছেন না। কেউ কেউ মনে করছেন, আওয়ামী লীগের সাজানো বাগান তছনছ করে দিয়েছেন ছুটিতে থাকা প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। তিনি বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ১৫৩ জন সংসদ সদস্যকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছেন। ওই পদ্ধতিতে নির্বাচিত হওয়াকে অবৈধ ঘোষণা করে এক রায় দিয়েছেন বলে বিভিন্ন মহল থেকে খবর আসছে। আর এই রায় বিশেষভাবে দেওয়া হয়েছে এমন খবরও আসছে।

১ আগস্ট ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া রায়ের পর সরকার তাকে ইমপিচমেন্ট করতে যাচ্ছে ও এ জন্য রাষ্ট্রপতি জরুরি সংসদ অধিবেশন ডেকেছেন এমন খবর পেয়ে তিনিও নিজেকে যাতে সরকার ইমপিচমেন্ট করতে না পারে, সেই ব্যবস্থাও নেন। সংসদে যাতে এমপিরা কোনো ধরনের ব্যবস্থা প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারেন ও বিচারপতিদের বিরুদ্ধে এমপিরা ব্যবস্থা নিতে না পারেন, সেই জন্য ১৫৩ সংসদ সদস্যকে অবৈধ ঘোষণা করেন। শোনা যাচ্ছে, ওই রায় বাস্তবায়ন করার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়েছিল। ওই রায় প্রকাশ করা হয়নি দেশে বিশৃঙ্খলা হবে এমন আশঙ্কায়। ওই রায় কার্যকর করার ব্যাপারে কোর্ট আদেশ দিয়েছেন। আর রায় কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্টদের সময় দেওয়া হয়েছে। রায় যাতে কার্যকর করার আগে প্রকাশ করা না হয়, এ জন্য একটি নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়। এই রায়ের বিষয়টি সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে। সেই সঙ্গে রায় কার্যকর করার ব্যাপারে সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। জানা গেছে, এখন ওই রায় বাতিলের নানা চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সিনহা কোনোভাবেই তাতে সম্মত ছিলেন না। এ কারণেই সিনহাকে আজকের পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। তার ছুটি শেষ হবে ৯ নভেম্বর। তবে এর আগে তিনি দেশে ফিরতে পারবেন কি না তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কারণ তিনি সরকারের সঙ্গে আপস ও সমঝোতা করলেই তার ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে, আর না হলে তিনি দেশে ফিরতে পারবেন না। তিনি দেশে ফেরার পর ১২ নভেম্বর থেকে আদালতে ফিরে যেতে চান ও নিজের পদে দায়িত্ব নিতে চান এমনটাই শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সেটি তাকে দেওয়া হবে এমন কোনো আভাস মেলেনি।

আরও গুজব আসছে, প্রধান বিচারপতি দেশে ফেরার আগেই এ ব্যাপারে সরকার যা করার করতে চাইছে। এ অবস্থায় ৫ নভেম্বর রাতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতিগণ বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেছেন। দেখা করে তারা সুপ্রিম কোর্টের সামগ্রিক কার্যক্রমের অগ্রগতি ও বিচার বিভাগের বিভিন্ন অবস্থা জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে প্রধান বিচারপতি সিনহা দেশে ফিরে আসার পর তার ব্যাপারে কী করা হবে, সেই বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। কারণ তার ব্যাপারে সরকারের মনোভাব নেতিবাচক। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তার ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। তিনি যাতে দায়িত্ব নিতে না পারেন, সেটা ছাড়া তারা এর কোনো বিকল্প ভাবছেন না। যদিও এখনো এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী, আইনসচিব ও সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের তরফ থেকে কথা বলা হয়নি। তবে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে বলে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এর আগে সবাইকে জানানো হয়েছে। এতে করে সিনহার ব্যাপারে পুরোপুরি নেতিবাচক মনোভাব যাতে সবার মধ্যে তৈরি হয়, সেই চেষ্টা করা হয়েছে। এ অবস্থায় তিনি তার পদে ফিরতে পারছেন না, এমনটাই নিশ্চিত।

এই অবস্থায় শেষ পর্যন্ত সিনহা যদি ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন বলে যে রায় দিয়েছেন, ওই রায় বাতিল করলেই কেবল তা সম্ভব হবে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সিনহা সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতায় যেতে রাজি নন। তার মতে, ১৫৩ জন যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, সেই নির্বাচিত ব্যক্তিরা অবৈধভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের সরানো হবে এবং সংসদ ভেঙে দিয়ে রায়ে যে রকম নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেভাবে কাজ করা হবে। তিনি এর বাইরে সরকারের সঙ্গে কোনো সমঝোতা করতে রাজি নন। তাতে তার যা-ই হোক না কেন, তিনি নিজেকে নিয়ে ও তার চাকরিতে ফিরে যাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব নন। তবে তিনি তার কাজগুলো যাতে বাস্তবায়ন করা হয় এবং এ ব্যাপারে তার যারা সহকর্মী ছিলেন, তারা ঐক্যবদ্ধ থাকেন সেটাই চাইছেন।

এদিকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৪৭টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর বাইরে ১৫৩ আসনে এর আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। যে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১২৯ জন, জাতীয় পার্টির ২০ জন, জাতীয় পার্টি জেপির ১ জন এবং জাসদ থেকে ৩ জনসহ মোট ১৫৩ জন রয়েছেন। এরপর বাকি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ সব মিলিয়ে ২৩৪, জাতীয় পার্টি ৩৪, ওয়ার্কার্স পার্টি ৬, জাসদ ৫, তরিকত ফেডারেশন ২, জাতীয় পার্টি জেপি ২, বিএনএফ ১, স্বতন্ত্র ১৬ জন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যারা নির্বাচিত হয়েছেন, এর মধ্যে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরসহ অনেক ডাকসাইটে ও প্রভাবশালী মন্ত্রী ও এমপিরা রয়েছেন। রায় কার্যকর করলে ওই সব মন্ত্রী আর সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন না। সেই সঙ্গে সরকার গঠন করার জন্য যে ৩০০ আসনের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্য সরকারি দলের থাকতে হবে, সেটাও থাকবে না। কারণ ১২৯ জন যারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন তাদের বাদ দিলে আওয়ামী লীগের হাতে থাকে কেবল ১০৫ জন সংসদ সদস্য। এই ১০৫ জন দিয়ে সংসদ চলবে না। ফলে সরকার গঠন করার জন্য যে যোগ্যতা, সেটাই থাকবে না আওয়ামী লীগের। এ কারণে ১৫৩ জনকে বাদ দিলে বাকিরা থেকেও সরকার রাখতে পারবেন না। সেই ক্ষেত্রে সরকার ভেঙে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।

তবে যেটি হতে পারে, সেটি হলো বর্তমান সরকার তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে পারে। নাম যেটাই দিক না কেন, ওই সরকারের অধীনেই নির্বাচন হতে হবে নতুন করে। সে জন্য ওই সরকার তেমন কোনো সময় পাবে না। কারণ সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে। সেই হিসাবে যেদিনই রায় কার্যকর করা হবে, সেই রায় কার্যকর করার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারকে নতুন সরকারের হাতে দায়িত্ব দিতে হবে। আর ওই সরকারের অধীনে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন হতে হবে। সে ক্ষেত্রে ২০১৯ সালে যে আওয়ামী লীগ নির্বাচন করার কথা এত দিন ধরে বলে আসছিল, সেটা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। ২০১৮ সালের প্রথমার্ধে নির্বাচন হতে হবে।

সংবিধানের চতুর্থ ভাগে নির্বাহী বিভাগের ২য় পরিচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার বিষয়ে বলা হয়েছে : ৫৬। (১) একজন প্রধানমন্ত্রী থাকিবেন এবং প্রধানমন্ত্রী যেরূপ নির্ধারণ করিবেন, সেইরূপ অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী থাকিবেন। (২) প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদিগকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দান করিবেন; তবে শর্ত থাকে যে, তাঁহাদের সংখ্যার অন্যূন নয়-দশমাংশ সংসদ সদস্যগণের মধ্য হইতে নিযুক্ত হইবেন এবং অনধিক এক-দশমাংশ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইবার যোগ্য ব্যক্তিগণের মধ্য হইতে মনোনীত হইতে পারিবেন। (৩) যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হইবেন, রাষ্ট্রপতি তাঁহাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন। (৪) সংসদ ভাঙিয়া যাওয়া এবং সংসদ সদস্যদের অব্যবহিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে এই অনুচ্ছেদের (২) বা (৩) দফার অধীন নিয়োগদানের প্রয়োজন দেখা দিলে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার অব্যবহিত পূর্বে যাঁহারা সংসদ সদস্য ছিলেন, এই দফার উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তাঁহারা সদস্যরূপে বহাল রহিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।

সংবিধানের পঞ্চম ভাগে আইনসভা বিষয়ে ১ম পরিচ্ছেদ সংসদ বিষয়ে বলা হয়েছে, সংসদ-প্রতিষ্ঠা ৬৫। (১) ‘জাতীয় সংসদ’ নামে বাংলাদেশের একটি সংসদ থাকিবে এবং এই সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইনপ্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত হইবে : তবে শর্ত থাকে যে, সংসদের আইন দ্বারা যে কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন বা আইনগত কার্যকরতাসম্পন্ন অন্যান্য চুক্তিপত্র প্রণয়নের ক্ষমতার্পণ হইতে এই দফার কোনো কিছুই সংসদকে নিবৃত্ত করিবে না। (২) একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহ হইতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত তিন শত সদস্য লইয়া এবং এই অনুচ্ছেদের (৩) দফার কার্যকরতাকালে উক্ত দফায় বর্ণিত সদস্যদিগকে লইয়া সংসদ গঠিত হইবে; সদস্যগণ সংসদ সদস্য বলিয়া অভিহিত হইবেন। ১(৩) সংবিধান (চতুর্দশ সংশোধন) আইন, ২০০৪ প্রবর্তনকালে বিদ্যমান সংসদের অব্যবহিত পরবর্তী সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে শুরু করিয়া দশ বৎসরকাল অতিবাহিত হইবার অব্যবহিত পরবর্তীকালে সংসদ ভাঙিয়া না যাওয়া পর্যন্ত (১) [পঞ্চাশটি আসন] কেবল মহিলা সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত থাকিবে এবং তাঁহারা আইনানুযায়ী পূর্বোক্ত সদস্যদের দ্বারা সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে একক হস্তান্তরযোগ্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হইবেন। তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার কোনো কিছুই এই অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন কোনো আসনে কোনো মহিলার নির্বাচন নিবৃত্ত করিবে না] ৩ [(৩ক) সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১ প্রবর্তনকালে বিদ্যমান সংসদের অবশিষ্ট মেয়াদে এই অনুচ্ছেদের (২) দফায় বর্ণিত প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত তিন শত সদস্য এবং (৩) দফায় বর্ণিত পঞ্চাশ মহিলা সদস্য লইয়া সংসদ গঠিত হইবে।] (৪) রাজধানীতে সংসদের আসন থাকিবে।

চতুর্থ ভাগ এর নির্বাহী বিভাগের ২য় পরিচ্ছেদ প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ সম্পর্কে বলা হয়েছে ৫৭। (১) প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হইবে, যদি (ক) তিনি কোনো সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করেন; অথবা (খ) তিনি সংসদ সদস্য না থাকেন। (২) সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারাইলে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিবেন কিংবা সংসদ ভাঙিয়া দিবার জন্য লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শদান করিবেন এবং তিনি অনুরূপ পরামর্শদান করিলে রাষ্ট্রপতি, অন্য কোনো সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন নহেন এই মর্মে সন্তুষ্ট হইলে, সংসদ ভাঙিয়া দিবেন। (৩) প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল থাকিতে এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই অযোগ্য করিবে না। জানা গেছে, সংবিধানের যে বিধান আছে, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারাইলে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিবেন কিংবা সংসদ ভাঙিয়া দিবার জন্য লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শদান করিবেন এবং তিনি অনুরূপ পরামর্শদান করিলে রাষ্ট্রপতি সংসদ ভাঙিয়া দিবেন। শেষ পর্যন্ত ওই রায় কার্যকর করতে হলে তখন দেখা যাবে সংসদে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠর সমর্থন থাকবে না। আর তা না থাকলে বিকল্প সরকার গঠন করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।

সূত্র জানায়, সিনহা এই ধরনের একটি রায় দিতে পারেন এমন খবর সরকারের কাছে আগেই ছিল। আর এ কারণে তাদের মধ্যে উদ্বেগও ছিল। তবে সরকার মনে করেছিল, এ ব্যাপারে সব ব্যবস্থাই নেওয়া হয়েছে, যাতে করে তিনি ওই ধরনের রায় দিতে পারবেন না। কিন্তু তিনি আপিল বিভাগকে নিয়ে এমন রায় দিতে পারেন এটা তাদের কল্পনার বাইরে ছিল। তাই এই ধরনের একটি ঘটনা সরকারকে বিপাকে ফেলে দিয়েছে। এদিকে হঠাৎ করেই বাংলাদেশের পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে সরকার ও আওয়ামী লীগের জন্য কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে। তারা যাকে মনে করেছিলেন প্রধান বিচারপতি হিসেবে সিনহা হবেন তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত। তিনিই যে বেঁকে বসবেন এবং এমন পর্যায়ে যাবে সেটা আগে ভাগে জানতে পারেননি। তবে আইনমন্ত্রী ও আইনসচিব দুজন এক মতে চললেও তারা দুজনের কেউই প্রধান বিচারপতির সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারেননি। এ কারণে তাদের বিরোধ সব সব সময়ই। তিনজনের দ্বন্দ্বের কারণেও সরকারকে বিপাকে পড়তে হয়েছে। সরকারের একটি অংশ প্রধান বিচারপতির বিরোধিতা করে আসছে। এদিকে জানা গেছে, আগামী ২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে জুডিশিয়াল কনফারেন্স। ওই কনফারেন্সে রাষ্ট্রপতিকে প্রধান অতিথি হওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টের তরফ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ও অনুরোধ জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রপতি ওই অনুষ্ঠানে যাবেন কি না তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।

প্রধান বিচারপতি যখন ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেন ও বাতিল করে দেন, তখনই তিনি জানতেন যে তার জন্য কঠিন সময় আসছে। তাকে ইমপিচমেন্ট করা হতে পারে, এমন খবরও জানতেন। এমনকি তাকে ইমপিচমেন্ট করার জন্য সংবিধানেও সংশোধনী আনা হতে পারে। সেসব দিক বিবেচনা করেই তিনি কাজ করেছেন। এখন তাকে ইমপিচমেন্ট করতে হলে ও সংবিধানে সংশোধনী আনতে হলে সেটা সম্ভব হবে না। কারণ ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেওয়ার কারণে এখন ওইসব সংসদ সদস্যকে দিয়ে সরকার সংসদে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না। তাকে বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই সরকারের হাতে। কিছু করতে হলে কেবল তার ব্যাপারে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছেই ফাইল পাঠানো যাবে। সেখান থেকেও তাকে সরানো সম্ভব হবে না। কারণ তিন মাসও তার মেয়াদ নেই। ৩১ জানুয়ারি তার মেয়াদ শেষ হবে। তিনি ওইদিন বিদায় নেবেন।

এছাড়া কোনো বিচারপতিও চান না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কিংবা অভিসংশন করুক। এ কারণে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া রায় আপিল বিভাগ সর্বসম্মতভাবেই দেন। রায়ের পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে নানা আলোচনা ও বিতর্ক, সমালোচনা হচ্ছে সেই ব্যাপারে সব বিচারপতি এক নন। কিন্তু সংসদ সদস্যরা তাদের অভিসংশন করবেন সেটা চাইছেন না।

জানা গেছে, প্রধান বিচারপতির ছুটি শেষ হবে আর দুই দিন পর। সেই হিসেবে তাকে হয় ছুটির মেয়াদ বাড়াতে হবে। আর না হয় দেশে ফিরতে হবে। তবে তিনি ছুটির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য এখনো আবেদন করেছেন বলে জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ছুটির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন না করলে তার বিরুদ্ধে বিনা অনুমতিতে ছুটিতে থাকা ও অনিয়মের কারণে রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা নিতে পারেন। যদিও প্রধান বিচারপতি নিজেই নিজের ছুটি নিতে পারেন। কেবল তিনি রাষ্ট্রপতিকে তার ছুটিতে যাওয়ার বিষয়টি অবহিত করবেন। এখন তার পরিবর্তে অপর একজন বিচারপতি দায়িত্বে থাকার কারণে তিনি না জানালে সমস্যা হবে কি না, এটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও তিন দিন।

সাপ্তাহিক ঠিকানা, নিউ ইয়র্ক যুক্তরাষ্ট্র

print

LEAVE A REPLY