ব্যাংকগুলোর অপচয় ও অনিয়ম মোকাবেলায় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর অপচয় ও অনিয়ম মোকাবেলা করে আর্থিক শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার লক্ষে ইতিমধ্যে বেশ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

এ লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইন- ১৯৯১ এ অধিকতর সংশোধনী আনা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর অপারেশনাল এফিসিয়েন্সি বৃদ্ধি করা জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত তদারকি করছে।

বার্ষিক পারফরমেন্স চুক্তি করা হয়েছে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা গাইডলাইন যথাযথভাবে পরিপালন করা হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর ইন্টারকন্ট্রোল এ- কমপ্লায়েন্স বিভাগ শক্তিশালী করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।এছাড়াও ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত পরিদর্শন ও পরীবিক্ষণ করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সালমা ইসলামের এক প্রশ্নের জবাবে আবুল মাল আবদুল মুহিত এসব কথা বলেন।

মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমবে: আরেক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) তথা মোবাইল ব্যাংকিংকে জনপ্রিয় ও সম্প্রসারণ করার জন্য সরকারের নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের চার্জ সাধারণভাবে এজেন্টের অংশ, মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রোভাইডারের ইউএসএসডি মূল্য এবং মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের অংশ-এ তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল।

বর্তমানে ইউএসএসডি মূল্য এবং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের অংশ কমানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করে যাচ্ছে। এ দুটি চার্জ কমানো সম্ভব হলে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার চার্জ কমে আসবে বলে আশা করা যায়।

অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংকগুলোর ঋণযোগ্য তহবিল বৃদ্ধি পাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধির ফলে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাজেই সরকারের ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি বিনিয়োগে ঋণ প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি বস্তুনিষ্ঠ নয় বলে প্রতীয়মান হয়।

দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে: আরেক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দেশের অব্যাহত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভারসাম্য বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তারই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে দিন বদলের সনদ রচনা করেছেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথনকশা সে সনদে প্রথিত হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত ও সমৃদ্ধশালী দেশ গঠনে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি ধারণ করে সরকার সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

প্রবৃদ্ধি অর্জন: মুহা. গোলাম মোস্তফা বিশ্বাসের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আরও জানান, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য সরকার বেশকিছু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ, যা বিগত তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ই-ক্যালকুলেটর ব্যবস্থা: এম আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে আবুল মাল আবদুল মুহিত জানান, ভোক্তা-বান্ধব ও রাজস্ব-বান্ধব ডিজিটাল এনবিআর গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক বিভিন্ন উদ্ভাবনীমূলক ও কর-বান্ধব পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হয়েছে। সহজ আয়কর পরিগণনার জন্য ই-ক্যালকুলেটর ব্যবস্থা সংযুক্ত করা হয়েছে।

ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি: নিজাম উদ্দিন হাজারীর প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা সৃষ্টি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বিগত বছরগুলোতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঋণের এ প্রবৃদ্ধি দেশের বেসরকারি খাতের উৎপাদনমুখী উদ্যোগসমূহ বাস্তবায়ন এবং কাঙিক্ষত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

অন্যদিকে বিগত বছরগুলেতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ (নিট) গ্রহণ হ্রাস পেয়েছে।

তিনি জানান, চলতি বছরের ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ না করে পরিশোধ করেছে ৩ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা, যা বাজেটে ঘোষিত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ২৮ হাজার ২০৩ কোটি টাকার তুলনায় কম হারে ঋণ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ প্রশমন সম্ভব হয়েছে।

এম আবদুল লতিফের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠিকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার জন্য নূন্যতম ১০ টাকা জমায় ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ১৭০ লাখের বেশি। এ অ্যাকাউন্টে সঞ্চয়ের পরিমাণ ১৩শ’ কোটি টাকা।

মোস্তাফিজুর রহমানের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে কার্যরত কেসরকারি ব্যাংকের সংখ্যা ৪৯টি এবং চলতি ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো কৃষকদের মধ্যে ২ হাজার ৭৬০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ করেছে।

হ্যান্ডসেট আমদানিতে বিদেশে চলে যাচ্ছে ৮ হাজার কোটি টাকা: বজলুল হক হারুনের এক প্রশ্নের জবাবে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেছেন, দেশের বাজার মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসার অনুকূল থাকায় প্রতি বছর ৩ কোটি হ্যান্ডসেট আমদানি করতে হচ্ছে। এতে ৮ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, বর্তমানে দেশে মোবাইল গ্রাহক সংখ্যা ১৩ কোটি ৫৯ লাখ ৮২ হাজার এবং দিন দিন গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে মোবাইল ফোনের হ্যান্ডসেটের বাজার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে এই চাহিদা পূরণ করতে বিপুল পরিমাণ মোবাইল সেট আমদানি করতে হয়। যার ফলে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।

এ সময় তারানা হালিম জানান, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, দেশে সুদক্ষ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবল সৃষ্টি, এ খাতে কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, অবৈধ আমদানি বন্ধ এবং দেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সময়োপযোগী বিনিয়োগের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোনসেট সংযোজন ও উৎপাদনের জন্য যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে এক শতাংশ আমদানি শুল্ক নির্ধারণ করে গত পহেলা জুন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এসকেডি পদ্ধতিতে স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেট সংযোজন ও উৎপাদনের জন্য যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ এবং সিকেডি পদ্ধতিতে মোবাইল ফোন আমদানির ক্ষেত্রে এক শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রযোজ্য হবে। ফলে অচিরেই আমদানির পরিবর্তে মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেট বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সব ডাকঘরে ইএমটিএস সার্ভিস চালু হবে: হাবিবুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ২ হাজার ৭৫০টি পোস্ট অফিসে ইএমটিএস (মোবাইলের মাধ্যমে টাকা প্রেরণ) সেবা চালু আছে। পর্যায়ক্রমে সব ডাকঘরে এই সেবা সম্প্রসারণ করা হবে। এছাড়া এজেন্টের মাধ্যমে ২৬ হাজার আউটলেট ইএমটিএস (মোবাইলের মাধ্যমে টাকা প্রেরণ) সার্ভিস চালু করা হয়েছে।

পোস্টাল ক্যাশ কার্ড: মমতাজ বেগমের প্রশ্নের জবাবে ডাক প্রতিমন্ত্রী জানান, নিরাপদে দেশের ভেতরে এক স্থান হতে অন্য স্থানে টাকা পরিবহনের লক্ষ্যে ‘পোস্টাল ক্যাশ কার্ড’ নামে একটি নতুন সার্ভিস প্রবর্তন করা হয়েছে। সারা দেশে এ পর্যন্ত এক হাজার ৩৭৪টি পোস্টাল ক্যাশকার্ড সার্ভিস পিওএস মেশিনের মাধ্যমে চালু আছে।

মামুনুর রশীদ কিরনের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিটেন্সের পরিমাণ ৪ হাজার ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।

print

LEAVE A REPLY