সরকারের সমালোচনা মানে দেশবিরোধিতা!

জোর করে ক্ষমতা দখলকারী সরকার হোক বা নির্বাচিত সরকার হোক, কাজ করে জনগণের জন্যে। মানে জনগণের জন্যে কাজ করার কথা। সংবিধান অনুযায়ী যেহেতু দেশের মালিক জনগণ। সরকার বা সরকারপ্রধান যিনি থাকেন, তিনিও জনগণেরই একজন। অর্থাৎ দেশের মালিকদের অর্থ ব্যয় করে কাজ করেন, যার পুরোটার মালিক জনগণ। সরকারের অর্থ বলে যে কথা বলা হয়, তা আসলে জনগণের টাকা। জনগণের অর্থ ব্যয়ে করা কোনো কাজ বা যে কোনো কাজ নিয়ে সমালোচনা করার অধিকার দেশের জনগণ সংরক্ষণ করেন। যে সংবিধান জনগণকে দেশের মালিক বানিয়েছে, সেই সংবিধানই জনগণকে সরকারের যে কোনো কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলার বা আলোচনা-সমালোচনা করার অধিকার দিয়েছে।

আমাদের মতো দেশে খুব চাতুরতার সঙ্গে সরকারের কাজের সমালোচনাকে দেশের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করা হয়। সরকারের কাজের সমালোচনাকে দেশের বা দেশবিরোধী সমালোচনা বা কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখাতে চায় সরকার। সরকারের সমালোচনা আর দেশের বিরুদ্ধে সমালোচনা সে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়, তা সরকারগুলো জনগণকে বুঝতে দিতে চায় না। তারা সরকার বলতে দেশকে বোঝাতে চায়। সরকারকে কথা বললে, দেশকে নিয়ে কথা বলা হচ্ছে বলে প্রচারণা নয়- প্রপাগাণ্ডা চালায়।

এমন আচরণ বাংলাদেশের সব সরকারের ভেতরে কম-বেশি দেখা গেছে। বর্তমানে যা অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।

সুনির্দিষ্ট বিষয়ের প্রেক্ষিতে সংক্ষিপ্ত আলোচনা।
১. রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। আইয়ুব খানের বহু আগের পরিকল্পনা। বর্তমান সরকার তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এখান থেকে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। বিদ্যুতের বিকল্প নেই। অবশ্যই প্রয়োজন। প্রশ্ন এসেছে, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কীভাবে নির্মাণ হচ্ছে?এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির বাজেট ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা রাশিয়ার থেকে নেয়া ঋণ। ৩ শতাংশ সুদে এই পুরো অর্থ বাংলাদেশকে শোধ করতে হবে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণের প্রায় কোনো লোকবল নেই বাংলাদেশে। রাশিয়ার থেকে ঋণ করে আনা টাকায় পুরোটা করে দেবে রাশিয়া। রক্ষণাবেক্ষণের কিছু কাজ করবে ভারতীয়রা। বিপুল অর্থ এবং বিপুল ঝুঁকির বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি শতভাগ বিদেশনির্ভর।
বলা হচ্ছে লোকবল তৈরির কাজ চলছে। হয়তো লোকবল তৈরি হবে একদিন। তবে এটা তো আর ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ নয় যে, দুই চার মাস ট্রেনিং দিলেই শিখে ফেলবে।

২. পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য সংরক্ষণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ-জটিল। রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ যখন ১ লাখ কোটি টাকার ঋণ চুক্তি করে, তখন বর্জ্য সংরক্ষণের বিষয়টি চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। পরবর্তীতে এটা আলোচনায় এসেছে। সরকার বলছে রাশিয়া বর্জ্য সংরক্ষণের জন্যে নিয়ে যাবে। এর প্রেক্ষিতে নতুন করে কত হাজার কোটি টাকার ঋণ চুক্তি হবে, তা সরকার জানায়নি। বর্জ্য নিয়ে যাওয়ার সময় যদি দুর্ঘটনা ঘটে, তার দায় রাশিয়া নেবে কিনা- তাও পরিষ্কার করে জানা যায়নি।

৩. বাংলাদেশের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী কোনো প্রকল্প প্রাথমিক বাজেট ও সময় অনুযায়ী শেষ হয় না। যেমন ৬০০ কোটি টাকার হাতিরঝিলের কাজ ২৫০০ কোটি টাকায়ও শেষ হয়নি। ৮ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতুর বাজেট হয়েছে ২৮ হাজার কোটি টাকা। আরও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর পরিকল্পনা চলছে। ৩৫০ কোটি টাকার ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ১৩০০ কোটি টাকায়। আরও অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রাথমিক বাজেট ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকার সঙ্গে বর্জ্য সংরক্ষণের একটা বড় অঙ্কের অর্থ যোগ হবে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় বাজেট বাড়বে, মানে ঋণ বাড়বে। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, বাজেট প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার মতো দাঁড়াতে পারে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক নানা কারণে কাজ একটা পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা আছে। ধরে নিলাম, কাজ হয়তো শেষ হবে।৩ শতাংশ সুদে ১ লাখ ৩০/৪০ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশকে শোধ করতে হবে। প্রায় সম্পূর্ণ লোকবল বিদেশি। জাতীয় বাজেট থেকেও তাদের পেছনে খরচ করতে হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর পরে মেরামতের কাজেও বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। যা জাতীয় বাজেট থেকে যাবে বা নতুন করে ঋণ নিতে হবে।
তাহলে মোট খরচ আসলে কত দাঁড়াবে?প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম হবে অত্যধিক। সরকার এখন বলছে প্রতি ইউনিট পাঁচ ছয় টাকা পড়বে। বাস্তবে এই সত্য সঠিক নয় বলে বিদ্যুৎ সেক্টরের অভিজ্ঞদের ধারণা। এক্ষেত্রে দাম জানানো নিয়ে লুকোচুরি চলছে।

৪. ধরে নেই, দেড় লাখ কোটি টাকার মধ্যে নির্মাণ সম্পন্ন হবে। পরবর্তী মেরামত-সংস্কার বা অন্যান্য খরচ এই আলোচনা থেকে বাদই দিলাম।
প্রশ্ন আসে, দেড় লাখ কোটি টাকা দিয়ে আর কোনো পদ্ধতিতে সমপরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত কিনা? এ বিষয়ে সরকার কোনো পর্যালোচনা করে দেখেছে বলে জানা যায়নি। সরকারের একটি বক্তব্য এই দেড় লাখ কোটি টাকা তো আমাদের নেই। এই খাতে রাশিয়া ঋণ দিচ্ছে বলে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা যাচ্ছে। হ্যাঁ, সরকারের এত টাকা নেই। রাশিয়া তার ব্যবসায়িক স্বার্থে ঋণ দিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ নিজে তো পর্যালোচনা করে দেখেনি যে, এত বিপুল ঋণ কতটা লাভজনক হবে, জনগণের কতটা উপকারে আসবে। ঋণ পাওয়া গেলেই নিতে হবে, এ কেমন মানসিকতা হয়েছে সরকার পরিচালনাকারীদের?

৫. যে কোনো প্রযুক্তিগত কাজেই দুর্ঘটনার সম্ভাবনা আছে। ঝুঁকি এবং ক্ষতির দিক দিয়ে পারমাণবিক কেন্দ্র সবচেয়ে এগিয়ে আছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুর্ঘটনার অনেক নজির পৃথিবীতে আছে। বাংলাদেশের এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নিয়ে ঝুঁকি থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক।
এই ঝুঁকি নিয়ে জনগণের উদ্বেগের প্রসঙ্গ সামনে এলেই সরকার বলছে, ‘এটা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে না।’
‘দুর্ঘটনা ঘটবে না’- এমন কোনো প্রযুক্তি পৃথিবীতে আবিষ্কার হয়নি। আবিষ্কারের সম্ভাবনাও আছে বলে মনে হয় না। অথচ সরকার এক নাগাড়ে বলে চলেছে ‘দুর্ঘটনা ঘটবে না’। আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়নে দুর্ঘটনা ঘটেছে, জাপানে ঘটল। আর বাংলাদেশে ঘটবে না? মানুষকে বিভ্রান্ত করা কেন? কেন মানুষকে সত্য তথ্য বলা হবে না?
সত্য তথ্য কী?
সত্য তথ্য হলো, যদি দুর্ঘটনা ঘটে তবে কী করে তা মোকাবিলা করা হবে। যেহেতু প্রযুক্তি থেকে লোকবল, সবই বিদেশনির্ভর- এ কারণে সরকার দুর্ঘটনার পরের বিষয়টি অর্থাৎ জননিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারছে না। দুর্ঘটনা ঘটলে কর্মরত রাশিয়া-ভারতের লোকজন চলে যাবে কিনা, এই প্রশ্ন জনমনে আছে। যদিও আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি, চাপে তা সম্ভব হবে না। কিন্তু কী হবে, তা তো মানুষকে জানাতে হবে। ‘দুর্ঘটনা ঘটবে না’- এটা তো কোনো কথা হতে পারে না।

৬. এসব প্রাসঙ্গিক আলোচনা যখন সামনে আনা হয়, তখন সরকারের কর্তারা বলেন, এসব কথা যারা বলেন তারা দেশের ‘উন্নয়ন’ চায় না। এসব কথা বলা মানে, বিদ্যুৎ উৎপাদন না চাওয়া। বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলে, দেশের ‘উন্নয়ন’ হবে না। ‘উন্নয়ন’ না হলে দেশ ‘এগিয়ে যাবে’ না। আর দেশের অগ্রগতি যারা চায় না, তারা ‘দেশবিরোধী’। ফুলস্টপ, কথা শেষ।

৭. রামপাল থেকে ফ্লাইওভার নির্মাণ, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি থেকে ড. ইউনূস। জিনিসপত্রের দাম, প্রশ্নফাঁস, ভোটারবিহীন নির্বাচন, গুম-অপহরণ, ত্বকী-তনু-সাগর-রুনী হত্যার বিচার, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, রেন্টাল কুইক রেন্টাল লুটপাট… যে কোনো প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বললেই ব্যাকরণে ফেলে ‘দেশবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে দেয়া হয়। প্রতিবছর নিয়ম করে ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাওয়া নিয়ে কথা বললে আপনি ‘দেশবিরোধী’। আপনি ‘দেশবিরোধী’ ব্যাংক লুট নিয়ে কথা বললেও।
সরকারের এসব কাজ ‘ভালো, খুব ভালো’ ইহাই ‘উন্নয়ন’ ইহাকেই ‘দেশ এগিয়ে’ যাওয়া বলে। আপনি ইহা বললেই ‘দেশপ্রেমিক’ হিসেবে উপাধি পাবেন।

সূত্র : সাপ্তাহিক.কম

print

LEAVE A REPLY