উচ্চবিত্তের লালন মধ্যবিত্তের দমন করা হয়েছে

প্রতিবছর বিশাল বাজেট দেয়া হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয় না। অবাস্তব বাজেট এক ধরনের চাটুকারিতা। এটি প্রতারণার শামিল। এবারের বাজেটের বড় চ্যালেঞ্জ হল এর বাস্তবায়ন। এটি বিগত কয়েক বছর ধরে দেখেছি, প্রথমে বড় বাজেট দেয়া হলেও পরে কাটছাঁট করা হয়। অবশ্য এবারের বাজেটকে কেউ বড় বলতে চান না, যদিও সেটা আপেক্ষিক। তবে এটি যে বাস্তবায়নযোগ্য নয়, সেটা একমাত্র অর্থমন্ত্রী ছাড়া সবাই বলছেন। তাই বাজেট হতে হবে স্বচ্ছ, বস্তুনিষ্ঠ এবং বাস্তবায়নযোগ্য। সর্বোপরি এবারের বাজেটে উচ্চবিত্তের লালন, মধ্যবিত্তের দমন এবং নিুবিত্তের জন্য কিছু বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতকে ঢেলে সাজানোর জন্য একটি ব্যাংকিং কমিশন গঠনের কথা কয়েকদিন আগে অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন। এখন আবার সুর পাল্টিয়ে ফেলেছেন। বললেন, কমিশন গঠন করবেন না। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এভাবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন। এতে বিশ্বাসের ঘাটতি হয়। তিনি যদি এটি না-ই করেন, তাহলে ঘোষণা দিলেন কেন? এভাবে যখন-তখন সিদ্ধান্ত নেয়া এবং পরিবর্তন করা মোটেও সুখকর নয়।

ব্যাংকের কর্পোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে। দেশে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান তো আরও আছে। তাদের ক্ষেত্রে এটা কমানো হয়নি। এ ক্ষেত্রে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, ব্যাংকিং খাতকে অযাচিত সুবিধা দেয়া হচ্ছে কেন? আবার প্রশ্ন উঠেছে- কতিপয় দুষ্ট উদ্যোক্তা পরিচালক নির্বাচনে অর্থায়ন করবেন, সে জন্য কি এত সুবিধা?

আমি বলব, বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকদের আর কোনো সুবিধা দেয়া ঠিক হবে না। ধীরে ধীরে তারা গ্রাস করে ফেলছে ব্যাংকিং খাত। বাংলাদেশ ব্যাংকে নগদ টাকা জমার হার (সিআরআর) বাবদ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, সরকারি তহবিলের ৫০ শতাংশসহ চারটি সুবিধা নিয়েছে। বিনিময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ব্যাংক ঋণের সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে। কিন্তু তারা প্রধানমন্ত্রীর কথা শোনেনি। ঋণের সুদ এক টাকাও কমায়নি। উল্টো কোনো কোনো ব্যাংক আরও বাড়িয়েছে। এখন তারা রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের বিনিয়োগযোগ্য প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা নামমাত্র দেড় থেকে দুই শতাংশ সুদে নেয়ার ফন্দি করছে। এটা দেয়া কিছুতেই ঠিক হবে না।

এর আগে তারা নিজেদের প্রয়োজনে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করেছিল। যেখানে একই পরিবারের চার পরিচালক এবং টানা ৯ বছর থাকার বিধান রাখা হয়। এতে করে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো মাত্র কয়েকজন দুষ্ট উদ্যোক্তা পরিচালকের কাছে জিম্মি হয়ে গেল। খুব শিগগির আইনটি পরিবর্তন না হলে পাকিস্তান আমলের ২২ পরিবারের মতো গুটিকয়েকজনের হাতে চলে যাবে ব্যাংকিং খাতের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। যা কিছুতেই শোভনীয় নয় এবং বঙ্গবন্ধুর অর্থনীতির পরিপন্থী।

বাজেটে সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও সরকারি ব্যাংককে মূলধন ঘাটতি পূরণে টাকা দেবে বলে জেনেছি। যেখান থেকে হোক দেবে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে লুটতরাজ করে, বছর শেষে বাজেট থেকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা একটি অনৈতিক ব্যবস্থা, যা দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে। এ ব্যবস্থার বিলোপ চাই। টাকা না দিয়ে ঘাটতি পূরণে সময় দেয়া হোক। এর জন্য গ্যারান্টি রাখতে পারে। যে করে হোক এসব ব্যাংককে মুনাফা আয়কারী প্রতিষ্ঠান হতে হবে। তার আগে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে সরকারি ব্যাংক কখনও লাভের মুখ দেখবে না।

এবারের বাজেটে টাকা-পয়সার অপব্যবহার হতে পারে। এ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অর্থের অপচয় রোধে নজরদারি বাড়াতে হবে। এ ছাড়া সংসদ সদস্যরা নিজ এলাকায় জনতুষ্টির জন্য অনেক প্রকল্প নিয়ে নিতে পারেন, প্রকল্পগুলো সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই হওয়া উচিত। দেশে আয়বৈষম্য দূর করার কোনো উদ্যোগ নেই। যেটা বাজেটেও দেখা যায়নি। এ ছাড়া রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য আদায়যোগ্য নয়।

লেখক : সাবেক ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

print

LEAVE A REPLY