একজন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর

বহুভাষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ১৩৩তম জন্মদিন আজ। তিনি ১৮৮৫ সালের এই দিনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অবিভক্ত চব্বিশ পরগণা জেলার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি তার জীবন কর্মের ওপর একক বক্তৃতার আয়োজন করেছে বলে জানান তারই নাতি ও দৈনিক আমাদের সময়ের ফিচার এডিটর শান্তা মারিয়া। তিনি বলেন, কাল বিকেল ৪টায় বাংলা একাডেমি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে এটি অনুষ্ঠিত হবে।

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের একজন স্মরণীয় বাঙালি ব্যক্তিত্ব, বহুভাষাবিদ, বিশিষ্ট শিক্ষক ও দার্শনিক। তিনি ১৯০৪ সালে হাওড়া জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স এবং ১৯০৬ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ এ (বর্তমান এইচএসসির সমমান) পাস করেন। ১৯১০ সালে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে সম্মানসহ বি এ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলিনামূলক দর্শনতত্ত্বে এম এ (১৯১২) ডিগ্রি অর্জন। এ ছাড়াও ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্যারিসের সরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি (১৯২৫) লাভ করেন। পড়াশোনা শেষ করার পূর্বেই কিছুকাল তিনি যশোর জেলা স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।

এন্ট্রান্স পাসের সময় থেকেই মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বিভিন্ন ভাষার প্রতি উৎসাহী ও আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং একাধিক ভাষা শিক্ষা শুরু করেন। ১৯১৫ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত চব্বিশ পরগণার বশিরহাটে আইন ব্যবসা করেন। ১৯১৯ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেনের সহকর্মী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পাশাপাশি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২২ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত আইন বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৩৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও রিডার হিসেবে নিযুক্ত হন। সেখান থেকে ১৯৪৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের পর তিনি বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৩-১৯৫৫ সালে তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ফরাসি ভাষার খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও পালি বিভাগে যোগদান করে ১৯৫৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

বিভিন্ন ভাষায় ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর দখল ছিল অসাধারণ ও অসামান্য। উর্দু ভাষার অভিধান প্রকল্পেও তিনি সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। পরে পূর্ব পাকিস্তানি ভাষার আদর্শ অভিধান প্রকল্পের সম্পাদক হিসেবে বাংলা একাডেমিতে যোগ দেন। ১৯৬১-১৯৬৪ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমির ইসলামি বিশ্বকোষ প্রকল্পের অস্থায়ী সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক গঠিত বাংলা একাডেমির পঞ্জিকার তারিখ বিন্যাস কমিটির সভাপতি নিযুক্ত হন। তার নেতৃত্বে বাংলা পঞ্জিকা একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত রূপ পায়।

ড. শহীদুল্লাহ সকল সময়ই সাহিত্য কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এম এ পাস করার পরই তিনি বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সম্পাদক হন। ১৯৪৮ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অনেক বই লিখেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ভাষা ও সাহিত্য, বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, দীওয়ানে হাফিজ (অনুবাদ), রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম (অনুবাদ), বিদ্যাপতি শতক, বাংলা সাহিত্যের কথা (২ খণ্ড), বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা প্রমুখ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে মরণোত্তর ‘ডি লিট’ উপাধি দেয়। ১৯৮০ সালে মরণোত্তর বাংলাদেশের স্বাধীনতা পদক দেয়া হয়।

১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পাশে সমাহিত করা হয়। ভাষাক্ষেত্রে তার অমর অবদানকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে ওই বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ঢাকা হলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় শহীদুল্লাহ হল। এ ছাড়াও তার নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কলা ভবনের নামকরণ করা হয়। – মানবকণ্ঠ

print

LEAVE A REPLY