ক্ষমতাধররা চালাচ্ছেন নিবন্ধনহীন গাড়ি!

এ তালিকার শীষের্ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী অনিবন্ধিত যানবাহন কত জানে না কেউ ফাঁক ঠেকাতে উদ্যোগ নেই প্রশাসনের আইন মানতে পুলিশকে নিদের্শনা।

সড়কপথের নৈরাজ্য ঠেকাতে সারাদেশে ফিটনেস, রুট পারমিট ও ইন্স্যুরেন্সবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হলেও নিবন্ধনহীন যানবাহন আটকের ক্ষেত্রে প্রশাসনের ততটা গা নেই। সারাদেশে এ ধরনের যানবাহনের সংখ্যা কত তার হিসাব মেলাতেও এখনো কোনো খেরোখাতা খোলেনি বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোটর্ অথরিটি (বিআরটিএ) কিংবা ট্রাফিক পুলিশ। এমনকি রাস্তায় নতুন গাড়ি নামানোর সময়ই যাতে সংশ্লিষ্ট মালিক বা প্রতিষ্ঠান এর নিবন্ধন করিয়ে নিতে বাধ্য হয়, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো উদ্যোগও এখনো নেয়া হয়নি। অথচ রাস্তায় যানবাহন নামানোর প্রথম শতর্ই নিবন্ধনকরণ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ফিটনেস, রুট পারমিট কিংবা ইন্স্যুরেন্সবিহীন কোনো যান রাস্তায় কোনো ধরনের দুঘর্টনা ঘটিয়ে পালিয়ে গেলেও এর নিবন্ধন নাম্বার শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট মালিক-চালকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব। প্রয়োজনে দুঘর্টনা সংঘটনকারী গাড়িটি জব্দও করা যায়। অথচ নিবন্ধনহীন যানবাহন শনাক্ত করা যেমন দুস্কর, তেমনি ঘটনাস্থলে এ ধরনের যান আটক করা না গেলে সংঘটিত অপরাধ প্রমাণ করাও অসম্ভব। এ ছাড়াও সময়মতো যানবাহনের

নিবন্ধন না হলে সরকার এ খাত থেকে প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। তাই বহিবিের্শ্বর প্রায় সব দেশেই গাড়ি ক্রয়ের সময়ই নিবন্ধনকরণের প্রাথমিক পবর্ চুকিয়ে ফেলা বাধ্যতামূলক। ফলে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ক্রেতাকে গাড়ি ডেলিভারি দেয়ার আগেই এর নিবন্ধনকরণ ফি জমা দিতে বাধ্য করেন। অথচ দেশে অনিবন্ধিত যান চালানোর ফাঁক ঠেকাতে প্রশাসনের এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেই। যদিও ব্যবসায়িক স্বাথের্ই গণপরিবহন মালিকরা যানবাহনের নিবন্ধনকরণের বিষয়টি যথেষ্ট মেনে চলছেন।

পরিবহন খাতের পযের্বক্ষকরা জানান, বাস-মিনিবাস, ট্রাক-লরিসহ বিভিন্ন গণপরিবহনে নিবন্ধনহীন যান নেই বললেই চলে। অনিবন্ধিত যানের একটি বড় অংশ মোটরসাইকেল, সিডান কার, মাইক্রোবাস ও জিপ। এসব যানবাহনের অধিকাংশ মালিকই রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিকভাবে ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা। পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিবন্ধনহীন যানবাহন পরিচালনার শীষের্ রয়েছে। পরবতীর্ অবস্থান রাজনৈতিক নেতাদের। এ ছাড়া বিভিন্ন সেবা সংস্থা এবং সাংবাদিক ও প্রেস লেখা বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত যানবাহনও রাজপথ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পাশাপাশি ভুয়া নম্বরপ্লেট ব্যবহারকারী যানের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। যা সচরাচর ধরা না পড়লেও অপহরণ-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কমর্কাণ্ড সংঘটনের পর তথ্য যাচাইয়ে বেরিয়ে আসছে।

এদিকে দেশে কত ভুয়া নম্বর প্লেটযুক্ত গাড়ি আছে, নিবন্ধন না নিয়ে কত গাড়ি চলাচল করছে, তার সুনিদির্ষ্ট কোনো হিসাব নেই ট্রাফিক পুলিশ কিংবা রোড ট্রান্সপোটর্ অথরিটির (বিআরটিএ) কাছে। তবে বিআরটিএ’র সংশ্লিষ্ট সূত্রের এক খসড়া হিসেবে সারাদেশে নিবন্ধনবিহীন গাড়ির সংখ্যা দেড় লাখেরও বেশি। এর মধ্যে ঢাকাতে আছে অন্তত ২৫ হাজার। যার এক তৃতীয়াংশই মোটরসাইকেল। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় নিবন্ধন না নিয়ে চলছে হাজার হাজার সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন বাহন। সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ ও বিআরটিএর কমর্কতাের্দর মাসোয়ারা দিয়ে অথবা প্রভাব খাটিয়ে রাস্তায় চলাচল করছে এসব গাড়ি।

এতে একদিকে যেমন সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে অপহরণ, ছিনতাই, চোরাচালান, মাদকদ্রব্য বহনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কমর্কাণ্ডে এসব যানবাহনের ব্যবহার বাড়ছে। সম্প্রতি দেশে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু অপরাধের কারণ অনুসন্ধানে নেমে পুলিশ বিপুলসংখ্যক গাড়ি ভুয়া নম্বর প্লেট থাকার প্রমাণ পেয়েছে।

এদিকে সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন থানা ও ট্রাফিক পুলিশ স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, তাদের ব্যবহৃত বিপুলসংখ্যক সরকারি মোটরসাইকেল ও জীপের নিবন্ধন নেই। এ ছাড়া তাদের অনেকের ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলও নিবন্ধনহীন। ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর পদমযার্দার বেশ কিছু কমর্কতার্ নম্বর প্লেটবিহীন সরকারি মোটরসাইকেল চালিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভিন্ন থানার ওসিদের ব্যবহার এবং টহল ডিউটির জন্য দেয়া ইসুজু ডি-ম্যাক্স মডেলের পিকআপগুলোরও বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন নেয়া হয়নি। এসব গাড়ির কোনোটার পেছনে নম্বর প্লেটের জায়গায় ইঞ্জিন নম্বর লেখা রয়েছে। আবার কোনোটার তা-ও নেই। একই রঙের এসব গাড়ির গায়ে শুধু ‘পুলিশ’ লেখা থাকায় তা কোন থানার, তা বোঝার উপায় নেই। এ ছাড়া এসপি পদমযার্দার পুলিশ কমর্কতাের্দর বেশ কিছু আনকোরা সরকারি জীপে কোনো নিবন্ধন নম্বর দেখা যায়নি। উঁচুদরের এসব গাড়ির নিবন্ধন নম্বর না থাকার ব্যাপারে পুলিশের ঊধ্বর্তন কমর্কতার্রাও কারো কাছ থেকে কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. নুরুল ইসলাম যায়যায়দিনকে বলেন, পুলিশের এ অনিয়মের ব্যাপারে কেউ লিখিত অভিযোগ না করায় বিষয়টি এতদিন নজরে আসেনি। তবে শিক্ষাথীের্দর নিরাপদ আন্দোলনের সময় এ বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ায় গাড়ির নিবন্ধনকরণের পাশাপাশি সব ধরনের ট্রাফিক আইন মেনে চলার জন্য পুলিশ বাহিনীকে অফিসিয়াল নিদের্শ দেয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘আইন সবার জন্য সমান। তাই রাস্তায় গাড়ি চালালে অবশ্যই সবাইকে আইন মেনে চলতে হবে। পুলিশ ট্রাফিক পরিচালনা করে বলে তাদের ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং তাদেরই সবার আগে নিয়ম মানা জরুরি। আপনারা (সাংবাদিকরা) নিজেরাই দেখেছেন, শিক্ষাথীের্দর আন্দোলনের সময় পুলিশের নামেও মামলা হয়েছে। শুধু পুলিশ নয়, এমপি-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’

এদিকে নিবন্ধনহীন বেশ কিছু মোটরসাইকেলে নাম্বার প্লেটের জায়গায় মোটা হরফে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ লেখা দেখা গেছে। যদিও এসব মোটরসাইকেলের মালিক কারা, কিভাবে তারা নিবন্ধন না নিয়ে এসব যান রাস্তায় নামিয়েছেন, এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের প্রথম সারির কোনো নেতা কিছু বলতে চাননি। তবে এসব মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় দাপিয়ে বেড়ানো কমীের্দর ভাষ্য, বড় ভাইরা (দলীয় নেতা) মিছিল-মিটিংয়ে যাওয়ার জন্য এসব মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছেন। তা নিয়ে তারা নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন কমর্সূচিতে যোগ দিচ্ছেন। এ সময় ট্রাফিক পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ তাদের চ্যালেঞ্জ করছেন না বলে জানান তারা।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার পদমযার্দার একজন কমর্কতার্ জানান, মোটর যান আইন অনুযায়ী নিবন্ধনবিহীন গাড়ি চালানো সম্পূণর্ নিষিদ্ধ। গাড়ি কেনার পর বাসা বা নিবন্ধন অফিসে নেয়া পযর্ন্ত এছাড় পেতে পারে। তবে নিবন্ধনের আবেদন করে গাড়ি রাস্তায় নামালে পুলিশ একটি নিদির্ষ্ট সময় দেয়। পরবতীের্ত এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। সাধারণত পুলিশ কারাদণ্ড না দিয়ে আথির্ক জরিমানা করে। অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি আটক করে থানা পুলিশের হেফাজতেও দেয়া হয়। গাড়ির নিবন্ধন করে এসব গাড়ি থানা থেকে ছাড়িয়ে নেয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে আইনের আরও কঠোর প্রয়োগ দরকার বলে মনে করেন এই ঊধ্বর্তন ট্রাফিক কমর্কতার্।

বিআরটিএর উপ-পরিচালক পদমযার্দার একজন কমর্কতার্ বলেন, আইনেই বলা আছে, রাস্তায় রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কোনো গাড়ি রাস্তায় চালানো যাবে না। শুধু পুলিশ কেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী যে কোনো বাহিনী, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কাযার্লয়ে ব্যবহৃত গাড়িরও নিবন্ধন নেয়া বাধ্যতামূলক। এর বাইরে গাড়ি চালানোর কোনো সুযোগ আইনে নেই।

প্রসঙ্গত: মোটরযান আইনের ৩৩ ধারা অনুযায়ী যে কোনো মোটরযানের নিবন্ধন নেয়া বাধ্যতামূলক। একই আইনের ৩৫ ধারার তিনটি উপধারায় সাধারণ মানুষের বাইরে ক‚টনীতিক ও প্রতিরক্ষা বিভাগের গাড়ির জন্য বিশেষ নিবন্ধনের কথা বলা হয়েছে। আইনের ১৫২ ধারায় বলা হয়েছে ‘রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস সাটিির্ফকেট অথবা পারমিট ছাড়া মোটরগাড়ি ব্যবহার করলে ৩২, ৪৭, ৫১ (১) উপধারা অনুযায়ী প্রথমবার অপরাধের জন্য সবাির্ধক তিন মাস কারাদণ্ড অথবা সবোর্চ্চ দুই হাজার টাকা পযর্ন্ত জরিমানা কিংবা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডিত হবে।’

আইনের ১৫৬ নম্বর ধারায় কোনো ব্যক্তি কোনো মোটর যানের কিংবা অন্য কোনো আইনানুগ কতৃর্পক্ষের অনুমতি ছাড়া সংশ্লিষ্ট মোটরগাড়ি চালালে সবোর্চ্চ তিন মাস কারাদণ্ড অথবা সবাির্ধক দুই হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় শাস্তি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

print

LEAVE A REPLY