কর্মসূচি ছিল না তারপরও কেন সংঘাত বায়তুল মোকাররমে?

0 ১৩৬

গত শুক্রবার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদকেন্দ্রিক পূর্ব নির্ধারিত কোনো কর্মসূচি ছিল না কোনো দল বা সংগঠনের। যে যার মতো নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন মসজিদে। সেখানে হেফাজত, ইসলামী আন্দোলনসহ সমমনা ইসলামী দলের নেতাকর্মীরাও ছিলেন। মসজিদে নামাজ পড়তে যান আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও। নামাজ শেষে মুসল্লিদের একটি অংশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের প্রতিবাদে মিছিল বের করার চেষ্টা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তাদের মিছিল থামাতে নামাজে অংশ নেয়া অন্য একটি অংশ তৎপরতা শুরু করে। মিছিলকারীদের বাধা দেয়া ও মারধর থেকে শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। পরে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী চলে সংঘাত-সংঘর্ষ।

প্রশ্ন হলো মসজিদের ভেতরে মিছিল থামানোর জন্য কারা প্রবেশ করেছিল। তাদের কারা দায়িত্ব দিয়েছিল। কেউ তাদের সেখানে না পাঠালে কেন তারা অতিউৎসাহী হয়ে সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করলো। এসব প্রশ্ন এখন ঘুরপাক যাচ্ছে মুখে মুখে। হেফাজত বা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলছেন, তাদের কারোরই ওই দিন নির্ধারিত কোনো কর্মসূচি ছিল না।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মসজিদের পেশ ইমাম জুমার নামাজ শেষ করা মাত্রই উত্তর গেটের সিঁড়িতে কয়েকজন যুবক মোদি বিরোধী স্লোগান দেন। এ সময় সেখানে থাকা কয়েকজন যুবক তাদের ধাক্কা দিয়ে সিঁড়ি থেকে সরিয়ে দেন। এরপর শুরু হয় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ। মোদি বিরোধীরা মসজিদের ভেতরে অবস্থান নেন। বাইরে অবস্থান নেয় অন্যপক্ষ। পরস্পরের দিকে ঢিল ছুড়তে থাকেন তারা। একপর্যায়ে পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে। দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে সাধারণ মুসল্লিরা মসজিদে জিম্মি হয়ে পড়েন। তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে সংঘর্ষ। সংঘর্ষে দুই পক্ষের লোকজনই আহত হন। আহত হন অনেক পুলিশ সদস্যও। সাধারণ মুসল্লিদের দাবি মোদিবিরোধী মিছিলকারীরা মিছিল করে হয়তো চলে যেতেন। কিন্তু মসজিদে এসে তাদের মিছিল ঠেকানোর চেষ্টা করায় সংঘাত বাধে। বলা হচ্ছে বায়তুল মোকাররমে সংঘর্ষের ঘটনার পরই চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

এ সংঘর্ষের জন্য ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী, সাধারণ মুসল্লি ও হেফাজতের নেতাকর্মীরা একে অপরকে দায়ী করেছেন। তারা পরস্পরকে দুষছেন এবং আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করলেও মামলার এজাহারে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি।

পল্টন থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, ২৬শে মার্চ বায়তুল মোকাররমে দলীয় নেতাকর্মীদের নামাজ পড়তে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া ছিল না। তারা সেখানে যার যার মতো গেছেন। তবে ওইদিন মসজিদের ভেতরে গিয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে ছবি পোস্ট করে জানান দেন।

বায়তুল মোকাররমে নামাজ পড়তে যাওয়া গামছা বিক্রেতা সবুজ জানান, এ মসজিদে প্রায় সময় বিক্ষোভ মিছিল হয়। পরে বিক্ষোভকারীরা এখান থেকে চলে যায়। ওইদিন বাইরে থেকে কিছু লোকজন বিক্ষোভকারীদের পেটানোর কারণে সহিংস ঘটনা ঘটেছে।

মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়া লালবাগ মাদ্রাসার ছাত্র আমিরুল ইসলাম জানান, আমরা প্রত্যেক জুমায় এখানে নামাজ পড়তে আসি। মিছিলের উদ্দেশ্যে আসিনি। নামাজ শেষে হেফাজতের কর্মী বলে একদল লোক আমাদের বেধড়ক পেটায়।

বিষয়টি জানতে চাইলে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি মুফতি সাখওয়াত হোসেন রাজি মানবজমিনকে বলেন, ‘ওইদিনের সংঘর্ষের বিষয়টি দিবালোকের মতো পরিষ্কার। ছবি-ভিডিও দেখলে বোঝা যাবে কারা দায়ী।

মামলা: এ ঘটনায় শুক্রবার রাতেই পল্টন থানায় এস আই শামীম হোসেন বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলায় ৪০০ থেকে ৫০০ অজ্ঞাতনামাদের আসামি করা হয়েছে। ওই সংঘর্ষে পুলিশ প্রায় ১৩শ’ রাউন্ড রাবার বুলেট ছুড়েছে বলে জানানো হয়। এ ছাড়াও মামলায় কারও নাম বা রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি।

মামলার এজাহারে বলা হয় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের আগমনের বিরুদ্ধে বায়তুল মোকাররমে সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে থাকে। তখন বায়তুল মোকাররমে দুই গ্রুপের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। তারা পুলিশের ওপর মারমুখী আচরণ করে। তারা ৫টি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।

মামলায় যে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে তাদের কীভাবে চিহ্নিত করা হবে বিষয়টি জানতে চাইলে পুলিশের মতিঝিল জোনের এডিসি এনামুল হক মিঠু বলেন, মসজিদের আশপাশের সিসি ক্যামেরা দেখে আমরা আসামিদের চিহ্নিত করবো।’ তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বাম সংগঠনগুলোকে বাধা দিয়েছিল কারা: দেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমন ঠেকাতে বামপন্থি বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের বিক্ষোভে পরপর দু’দিন হামলার ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভকারী সংগঠনের নেতাকর্মীদের দাবি তাদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। তাদের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। ছাত্রলীগ বলছে, বাম সংগঠনের মধ্যে দুটি গ্রুপ আছে। তারা নিজেরাই সংঘাতে জড়িয়েছে। প্রশ্ন হলো তাহলে বাম সংগঠনের প্রতিবাদে কারা বাধা দিয়ে হামলা করে পরিবেশ উত্তপ্ত করেছে? কেন তারা এমন পরিবেশ তৈরি করেছে। প্রগতিশীল ছাত্র ফ্রন্টের সমন্বয়ক আল কাদেরি জয় মানবজমিনকে বলেন, ছাত্রলীগ তো সবসময়ই বলে তারা কোনো হামলায়ই থাকে না। আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট হামলা ছাত্রলীগই করেছে। বিক্ষোভের ছবি, ভিডিও বা ফুটেজে প্রমাণ আছে তারা হামলা করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস মানবজমিনকে বলেন, আমরা জেনেছি বাম সংগঠনের মধ্যে দুটি গ্রুপ আছে। কিছু উগ্রবাদী ধর্মীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আর কিছুটা প্রগতিশীল। তাদের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ছাত্রলীগ এসবের সঙ্গে জড়িত না। তারা নিজেরাই যে সংঘর্ষ করেছে এ বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য প্রমাণ আছে।

হামলার পরপরই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য্য গণমাধ্যমকে বলেছেন, বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে মারামারি করে ছাত্রলীগের ওপর দায় চাপাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় ইটপাটকেল ছুড়লে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা আহত হয় বলেও তিনি দাবি করেন।

উৎসঃ   মানবজমিন
Comments
Loading...