গণপূর্তে আলাদীনের ‘প্রদীপ কুমার’ সিন্ডিকেট

0 ১১৪

আলোচিত জিকে শামীম সিন্ডিকেটের পতনের পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারা। প্রকল্পসহ অন্যান্য কাজ বাস্তবায়নে ফিরে এসেছিল স্বাভাবিকতা। কিন্তু বছর না পেরুতেই ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ‘সিন্ডিকেট’। তবে এবার জিকে শামীমের জায়গায় এসেছেন গোল্ডেন মনির নামের আরেক মাফিয়া। দুর্নীতির দায়ে সাজা খেটে আসা গণপূর্ত মেট্রোপলিটন জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার বসুর সহযোগিতায় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে একচ্ছত্র আধিপত্য চালাচ্ছে নয়া এই সিন্ডিকেটটি। ওপেন টেন্ডার হলেও বিশেষ একটি পদ্ধতীর মাধ্যমে বড় বড় সব কাজ ভাগিয়ে সিন্ডিকেটের সদস্যদের মাঝে ভাগ-ভাটোয়ারা করে নেয়া হচ্ছে। পূর্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রদীপ কুমার বসু এখন অনেকটাই আলাদীনের প্রদীপ হয়ে গেছেন। তার সাথে সখ্যতায় অনেকেই বনে যাচ্ছেন টাকার কুমির।

গত ৪ নভেম্বর গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে বসুর অনিয়ম খতিয়ে দেখতে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পেকু সার্কেল) কাজী মো. ফিরোজ হাসানকে আহ্বায়ক এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (পিপিসি) মোহাম্মদ মাহফুজুল আলমকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- নির্বাহী প্রকৌশলী লিল্টু গাজী, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোর্শেদ ইকবাল ও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তৌফিক আলম সিদ্দিকী। এ কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন করে ইতোমধ্যে ব্যাপক অনিয়ম পেয়েছে বলে জানা গেছে। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী মো. ফিরোজ হাসান এবিষয়ে জানান, আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে সময় লাগবে।

অবশ্য প্রদীপ কুমার বসুর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে এরইমধ্যে জাতীয় সংসদের সাংবিধানিক কমিটি সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা পাঠিয়েছে। সভাপতি রুস্তম আলী ফরাজী এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির ১২তম বৈঠকে এনিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জাতীয় সংসদের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. মিজানুর রহমান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ-২) ও গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীকে চিঠি পাঠিয়েছেন। কমিটির এই নির্দেশনার আলোকে গণপূর্ত অধিদফতর থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে দীর্ঘদিনেও কমিটির নির্দেশনা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বিপুল পরিমাণ অর্থ, ৬০০ ভরি স্বর্ণ এবং একটি বিদেশি পিস্তলসহ গত শনিবার টেন্ডার মাফিয়া গোল্ডেন মনিরকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। র‌্যাব জানিয়েছে, মোট এক হাজার ৫০ কোটি টাকার মতো সম্পদ আছে গোল্ডেন মনিরের। রাজধানীর বাড্ডা, গুলশান, নিকেতন, উত্তরা এলাকায় তার ৩০টির মতো ফ্ল্যাট রয়েছে।

তথ্যমতে, রাজধানীর আগারগাওয়ে নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউটের ১৫০ কোটি, র‌্যাব হেড কোয়ার্টারের ১৫০ কোটি, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল সার্ভিস কমপ্লেক্সের ৫৫ কোটি, ডেমরা পুলিশ টাওয়ারের ৯০ কোটি টাকার কাজসহ চলমান অন্যসব প্রকল্প থেকে কমিশন নিয়ে কাজ ভাগ-ভাটোয়ারা করে দেয়া হয়েছে। উত্তরার ঝমঝম টাওয়ারের একটি কক্ষে বসে লোকচক্ষুর অন্তরালে কাজ ও কমিশনের টাকার এই ভাগ-ভাটোয়ারা হয়।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, প্রদীপ কুমার বসুর এসব অনিয়মের বিষয়ে জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ১২তম সভায় বিশদ আলোচনা হয়। কমিটির সভাপতি রুস্তম ফরাজীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে কমিটি সদস্য আবুল কালাম আজাদ, মো. আফছারুল আমীন, মো. শহীদুজ্জামান সরকার, র.আ.ম. ওবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, জহিরুল হক ভুইয়া মোহন, আহসানুল ইসলাম টিটু, মুস্তফা লুৎফুল্লাহ, বেগম ওয়াসিকা আয়েশা খান, জাহিদুর রহমান অংশ নেন। ওই বৈঠকে কমিটি দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত প্রদীপ বসুসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এবিষয়ে কমিটি সদস্য মো. শহীদুজ্জামান সরকার ইনকিলাবকে বলেন, গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি অভিযোগ সঠিক বলে স্বীকার করেছেন। কমিটির সভাপতি রুস্তম আলী ফরাজী ইনকিলাবকে বলেন, অধিকাংশ কাজই সঠিকভাবে হয়নি এবং অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন বিলম্বিত করায় অধিদফতরের স্চ্ছোকৃত ভুলভ্রান্তি, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করার মতো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।

এদিকে প্রদীপ কুমার বসুসহ অনিয়মে জড়িত প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক লুটপাট ও অনিয়মের প্রমাণ প্রাপ্তি সাপেক্ষে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছে গণপূর্ত অধিদফতর। এছাড়া নির্মাণকালের ২৬টি অনিয়ম তুলে ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বরাবর সম্প্রতি চিঠি দিয়েছেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতালের পরিচালক। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িত প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করে যথাযথ ক্ষতিপূরণ আদায়ের পরামর্শ দিয়েছে জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুদ্দিন আহম্মেদের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, হাসপাতাল ও প্রশাসনিক ভবনের ছাদ চুইয়ে কক্ষের ভেতর পানি পড়ে। ডিপিপি মোতাবেক ১০০ কিলোওয়াট সোলার প্যানেল সংযুক্ত করার কথা থাকলেও ৬০ কিলোওয়াট স্থাপন করা হয়েছে। উপরন্তু প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাটারি অনেক কম দেয়া হয়েছে। সোলার প্যানেল সম্পর্কিত আরও জটিল অনেক সমস্যাও রয়েছে। বৃষ্টির পানিতে বিভিন্ন স্থানের বালু সরে গিয়ে নালায় পরিণত হয়েছে। দেয়ালের নিচের অংশে মাটির নিচে ইটের গাঁথুনি নেই। যেসব সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর ছবিও অস্পষ্ট। সিসি ক্যামেরা নিম্নমানের। এ পর্যন্ত সবগুলো ক্যামেরা সঠিকভাবে স্থাপন করা হয়নি। বিদ্যুতের কাজও অত্যন্ত নিম্নমানের হয়েছে। অধিকাংশ ভবনের নিচে মাটি ভরাট না করায় সেগুলোর নিচের অংশ ফাঁকা রয়ে গেছে।

অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার বসু বলেন, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব বড় প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। গোল্ডেন মনির সিন্ডিকেটের সাথে আমার কোনো সর্ম্পক নেই।

ইনকিলাব

Comments
Loading...