ঢামেকের এত ডাক্তার করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন কেন?

0 ৫৩

সম্প্রতি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনায় আক্রান্তের হার বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। ৪ নভেম্বর ঢামেকের কোভিড ইউনিটে কাজ করা চিকিৎসকসহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত করোনার ফলাফল আসে। তাতে পজিটিভ আসে ৫ জনের। চিকিৎসক দুইজন, বাকিরা স্বাস্থ্যকর্মী।৫ নভেম্বর ১২ জনের রিপোর্ট আসে। সবাই করোনা আক্রান্ত। ১১ নভেম্বর ৩৪ জনের মধ্যে ১৮ জনই পজিটিভ। ১৩ নভেম্বরও ১৪ জন। ১১ নভেম্বর শনাক্ত হন ১৮ জন-চিকিৎসক ৯ জন আর অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী ৯ জন।

অনেকসময় স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হলেও তাদের তথ্য দেওয়া হয় না চিকিৎসকদের। স্বাস্থ্যকর্মীরাও সেটা সহজে প্রকাশ করেন না। তাই করোনায় যে আরো কত ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হতে চলেছেন তা আন্দাজ করা যাচ্ছে না এখনই। এমনকি ঢামেকের মোট কতজন চিকিৎসক আক্রান্ত, সে হিসাবও নেই।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)র গত ১৪ নভেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন আট হাজার ১২৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী। তাদের মধ্যে দুই হাজার ৮৭৬ জন চিকিৎসক, এক হাজার ৯৭৩ জন নার্স এবং তিন হাজার ২৭৬ জন অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী।

করোনার প্রাদুর্ভাবের পরপর হাসপাতালগুলোতে ব্যবস্থাপনা ঠিক না থাকায় শুরুর দিকে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সংক্রমিত হওয়ার হার বেশি ছিল। কিন্তু দীর্ঘ আটমাস পরও দেশের সবচেয়ে বড় এই হাসপাতালের চিকিৎসকসহ অন্যরা কেন এভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন সে নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে সবার মাঝে।

চিকিৎসকরা বলছেন, এই সংক্রমণের হার বাড়ার কারণগুলো জানতে হবে। যদি সেটা জানা যায় তাহলে হয়তো একটা সমাধানে আসা যাবে। নয়তো এটি প্রতিরোধ করা যাবে না।

কিন্তু ঢাকা মেডিক্যালেই কেন এভাবে আক্রান্ত বাড়ছে জানতে চাইলে চিকিৎসকরা বলছেন, এর কারণ অনেক রোগীদের রোগের লক্ষণ দুর্বল বা কোনো লক্ষণ নেই। একটা স্বস্তির বিষয় হলো যারা সংক্রমিত হচ্ছেন তারা গুরুতর অসুস্থ হচ্ছেন না। এটা মন্দের ভালো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানালেন এক ঘটনা। ঢামেকের কোভিড ইউনিটে ভর্তির পর এক রোগীর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। তিনি কর্তব্যরত চিকিৎসককে বললেন, স্যার আমি বাইরে যাব, আপনার জন্য কিছু আনতে চাই। রোগীর একথা শুনে চিকিৎসক হতভম্ব। রোগীরাও রোগটার গুরুত্ব সম্পর্কে ঠিকমতো জানে না বা জানলেও পাত্তা দেন না। পরে ওই চিকিৎসক রোগীকে বাইরে যেতে দেননি।

চিকিৎসকরা বলছেন, হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণের অনেক কারণ থাকে। এখানে ইনফেকশন প্রিভেনশন কন্ট্রোল (আইপিসি) বা সংক্রমণ প্রতিরোধে কয়েকটি ব্যবস্থা আছে।

এর মধ্যে রয়েছে একটি মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট ডিজইনফেক্ট করাসহ এনভায়রনমেন্ট কন্ট্রোল, নেগেটিভ প্রেসার রুম বা ওয়েল ভেন্টিলেটেড রুম ও ইঞ্জিনিয়ারিং কন্ট্রোল অ্যাডমিনেস্ট্রেটিভ কন্ট্রোল। এর আওতায় রয়েছে ভিজিটর ঢুকতে না দেওয়া, রোগীদের বাইরে যেতে না দেওয়া। অন্য বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মতো এগুলোতেও যদি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকত, তবে ডিএমসির অবস্থা এমন হতো না।

উদাহরণ দিয়ে ডিএমসির চিকিৎসকরা বলছেন, কুর্মিটোলা হাসপাতালে এসব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেবিনে রাখা হচ্ছে কোভিড রোগীদের। তাই ‘ক্রস ইনফেকশন’ হওয়ার সুযোগ থাকে না।

সব রোগী এবং তার স্বজনদের মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক। তারা মাস্ক না পরলে চিকিৎসকরা ঝুঁকিতে থাকে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেটাও মানা হচ্ছে না। অনেকসময় স্টাফরাও মাস্ক ব্যবহার করছেন না, শুধু চিকিৎসকরাই করছেন।

ঢামেকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কোভিড ডেডিকেটেড ইউনিটে কাজ করা একাধিক চিকিৎসক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যখন একজন রোগী আসবে তাকে শনাক্ত করে তাকে পরীক্ষা করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আবার বাড়তি সতর্কতা হিসেবে যখন একজন সন্দেহভাজন রোগী আসবে তখন তার জন্য ফেসশিল্ড, গগলসসহ সম্পূর্ণ সুরক্ষা সামগ্রী পরতে হয়।

তারা বলছেন, মাস্ক যেগুলো ব্যবহার করছেন চিকিৎসকরা সেগুলো এন-৯৫ হলেও ‘ফিট টেস্ট’করে মাস্ক দেওয়া হচ্ছে না। একেক জনের মুখের গড়ন এবং ধরন অনুযায়ী মাস্ক দেওয়ার নিয়ম হলেও সেটা করা হচ্ছে না। যার কারণে মাস্কের কোথাও না কোথাও গ্যাপ থেকে যায়। গ্যাপ থাকলে সেই মাস্ক সুরক্ষা দেবে না। আবার দিনে চারবার কিংবা ছয়বার হেলথ কেয়ার প্রভাইডাররা বারবার স্পর্শ করে যে জায়গাগুলো, সেগুলো স্যানিটাইজ করতে হয়।

কোভিড ইউনিটে কাজ করা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক চিকিৎসক বলেন, কোভিড এবং নন-কোভিড বলতে কিছু নেই। এই রুটিন পরীক্ষা যদি সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হপসপাতালেও করা হতো তাদেরও সংখ্যাও এমনই পাওয়া যাবে।

তিনি আরও বলেন, ‘ডিএমসি করোনা ডেডিকেটেড। তাই এখানকার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের রুটিন টেস্ট হয়। নন–কোভিড হাসপাতালগুলোতে টেস্ট হয় না। বেশিরভাগ রোগীই এখন উপসর্গহীন। ঢাকা মেডিক্যাল যেহেতু করোনা ডেডিকেটেড তাই টেস্ট হচ্ছে বলে এই সংখ্যাটা জানতে পারছি।’

সচেতনতা একেবারেই কমে গেছে উল্লেখ করে এই চিকিৎসক বলেন, ঢাকা মেডিক্যালে যারা রোগীর সঙ্গে থাকেন, তারা একেবারেই মাস্ক ব্যবহার করছেন না। কেউ করলেও একটা মাস্কে কাটিয়ে দিচ্ছেন এক সপ্তাহ। সেটা খুলে রেখে আবার রোগীর শয্যায় রাখছেন। পকেটে-হাতে-থুতনিতে রাখছেন। আর এখান থেকেই চিকিৎসকরা আক্রান্ত হচ্ছেন।

অপরদিকে, আগে ডফিং (পিপিই খোলার জায়গা) রুমসহ অন্যান্য যে সতর্কতা ছিল সেগুলোতে ঢিলেঢালা ভাব চলে এসেছে। আবার ডফিং করার পর টোটাল যে কালেকশন হয় পিপিই-র সেগুলো স্টাফরা সব সংগ্রহ করে যে কোনও জায়গায় জড়ো করে রাখছে। এদের যথাযথভাবে প্রশিক্ষণ না দেওয়া হলে যেখানে সেখানে ভাইরাস ছড়াবে। আসলে কেউ করোনাকে গুরুত্বই দিচ্ছে না।

সরকারি নির্দেশনা যেগুলো দেওয়া হয় সেগুলো সবার দেখার সুযোগও থাকে না। আমরা কেবল মন্ত্রণালয়ে ওয়েবসাইটে ঢুকে দেখি যে মাস্ক ব্যবহার না করলে জরিমানা হবে। কিন্তু এগুলো পাবলিকলি প্রচার হচ্ছে না। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ডায়াগনোস্টিক সেন্টার, বেসরকারি চেম্বার বা দেশের যে কোন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে এগুলো বিজ্ঞপ্তি আকার টাঙিয়ে দেওয়া উচিত।

চিকিৎসকরা কেন এভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন জানতে চাইলে ভাইরোলজিস্ট ডা. জাহিদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মেডিক্যাল বর্জ্য নিষ্কাশন কোনও হাসপাতলেই ঠিকমতো করা হয় না। কোভিড আসার পর এ বিষয়ে আরও মনোযোগ দেওয়া দরকার ছিল। করোনার বর্জ্য ঠিকমতো ডিসপোজাল না হওয়া চিকিৎসকদের সংক্রমিত হবার অন্যতম কারণ।’

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. নাজমুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে এটা হচ্ছে। আমরা এ নিয়ে কাজ করেছি। কিছুটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছি। তবে আমি আবার দেখবো কেন এটা হচ্ছে। দেখে ব্যবস্থা নেবো।’

উৎসঃ   বাংলা ট্রিবিউন

Comments
Loading...