তামাশার লকডাউন

0 ৭৬

দেশে করোনা সংক্রমণ হু হু করে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৬৬ জন। এ সময় নতুন করে আরো ৭২১৩ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। গতকাল একদিনে করোনায় মৃত্যু ও আক্রান্তে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অবস্থায় কঠোরভাবে লকডাউন পালিত না হলে করোনাভাইরাসের কারণেই দেশে স্বাস্থ্যসেবায় মহাবিপর্যয় নেমে আসবে। এখনই হাসপাতালে ঠাঁই নেই। তখন করোনা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।জানতে চাইলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, বাংলাদেশে লকডাউন বলতে প্রথম থেকে যে চিত্র আমরা দেখেছি এবং সরকারের যে ঘোষণা কোনোটাই বৈজ্ঞানিক নয়। আংশিক লকডাউন বলতে কোনো লকডাউন নেই। লকডাউন মানেই হলো লকডাউন। সরকার ঘোষিত চলমান লকডাউন যেহেতু বৈজ্ঞানিক নয়, তাই জনসাধারণ এটাকে সেভাবে নেয়নি। কারণ, এটার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, যেভাবে এটা ঘোষণা করা হয়েছে। জনগণকে সম্পৃক্ত করা ছাড়া লকডাউন কর্মসূচি সফল বা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এর আগে শুরু হয় লকডাউন।

কিন্তু পরিকল্পনাহীন, অব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণহীনতায় লকডাউন কার্যত ‘তামাশার লকডাউন’ হয়ে গেছে। লকডাউনে সন্ধ্যা ৬টার পর সবকিছু বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়া হলেও এ সময় দেখা গেছে সর্বত্রই ভিড়। মার্কেট-দোকান সবখানে মানুষের স্রোত। স্বাস্থ্যবিধি মানতে মানুষকে বাধ্য করতে গণপরিবহন বন্ধ রাখা হলেও মানুষ গাদাগাদি করে বিকল্প যানবাহনে চলাচল করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আংশিক লকডাউন সফল হয় না। এর বৈজ্ঞানিক ভিক্তি নেই। বিধিনিষেধ বা লকডাউন যাই বলা হোক তা আংশিক বাস্তবায়ন করলে সফলতা আসবে না। লকডাউন দিলে পুরো লকডাউন দিতে হবে। বাস্তবতা হলো প্রশাসন কার্যত আংশিক লকডাউন ঘোষণা করেছে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছর যখন লকডাউন ঘোষণা করা হলো, ওই সময় পুলিশ যা করণীয় সবই করেছে। দোকানপাট বন্ধে নির্দেশনা ও তদারকি, সড়কে অযথা ঘোরাফেরা বন্ধে নজরদারি, অনাহারির বাসায় খাবার পৌঁছে দেয়া, ওষুধ সরবরাহ, রোগী নেয়া, লাশ দাফনে সহায়তা, মাস্ক বিতরণসহ নানারকম কাজ করেছে। কিন্তু এবার দুই দিন পার হয়ে গেলেও পুলিশকে তেমন কোনো ভ‚মিকা পালন করতে দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে যাই বলুক শেষ পর্যন্ত পুলিশকেই ‘লকডাউন’ বাস্তবায়নে ভ‚মিকা রাখতে হবে। তবে সেটা আগে থেকে করলে প্রকৃত ফল পাওয়া যাবে। না হলে এরকম শতাধিক দিন ‘লকডাউন’ থাকলেও কোনো কাজে আসবে না। করোনা সংক্রমণ এড়াতে ‘লকডাউন’ ঢিলেঢালা নয়, সম্পূর্ণভাবে পালন করতে হবে।৪ এপ্রিল লকডাউন ঘোষণায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ১১ দফা নির্দেশনা জারি এবং তারও আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণায়ের ১৮ দফা নির্দেশনা সবকিছুই যেন ‘অপরিকল্পিত’ লকডাউনের নামান্তর। করোনার কারণে এক বছরের বেশি সময় ধরে স্কুল-কলেজ-মাদরাসা-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। এখন লঞ্চ, গণপরিবহন, ট্রেন, অভ্যন্তরীণ বিমান, মার্কেট, দোকান বন্ধ; অথচ একই সময়ে বাংলা একাডেমির ‘বইমেলা’ ও ‘বাংলাদেশ গেইম’ চালু রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন করোনায় স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকলে বইমেলা খোলা রাখা হচ্ছে কার স্বার্থে? বইমেলায় কি করোনা সংক্রমণ বাড়ায় না? বাংলাদেশে এই করোনার সময় খেলাধুলা অব্যাহত রাখার মাজেজা কি? মানুষের জীবনের চেয়ে বাংলা একাডেমির বইমেলা ও বাংলাদেশ গেইমের মূল্য বেশি? সারাদেশের বিভিন্ন মার্কেটের দোকান মালিক ও শ্রমিকরা আন্দোলনে নেমে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন বইমেলা খোলা রাখলে মার্কেট খোলা রাখতে অসুবিধা কি? কার স্বার্থ রক্ষায় গার্মেন্টস ও বইমেলা খোলা রাখা হয়েছে?বিশেষজ্ঞদের কথাই সত্যি হলো।

আংশিক লকডাউন সফল হবে না। গতকাল করোনার বিস্তার ঠেকাতে সারাদেশে এক সপ্তাহের জন্য গণপরিবহন বন্ধের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকাসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় ৭ এপ্রিল থেকে সকাল-সন্ধ্যা গণপরিবহন সেবা চালু থাকবে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন। প্রশ্ন হলো হঠাৎ করে গণপরিবহন বন্ধ করা হলো কেন আর দু’দিনের মাথায় চালু করার ঘোষণা দেয়া হলো কেন? সবই কি গণবিচ্ছিন্নতার কারণে অপরিকল্পিত চিন্তা-চেতনার ফসল?বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ খুবই শক্তিশালী। নতুন ভাইরাস খুবই ভয়ঙ্কর। লকডাউন দিয়ে মানুষের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সংক্রমণ ঠেকানো উচিত। আধা-লকডাউন ও ঢিলেঢালা লকডাউনে কোনো কাজ হবে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ৫ এপ্রিল থেকে সারাদেশে এক সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণা করা হচ্ছে। এক সপ্তাহের লকডাউন স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। করোনা ভাইরাসের সুপ্তিকাল ১৪ দিন। করোনা ভাইরাস শরীরে ১৪ দিন পর্যন্ত ঘাপটি মেরে থাকতে সমর্থ। শরীরে প্রবেশের ১৪তম দিনেও ভাইরাসটি রোগ তৈরিতে সক্ষম। এজন্য বৈজ্ঞানিক বিবেচনা থেকে লকডাউন দিলে কমপক্ষে ২ সপ্তাহ হওয়া উচিত। আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, যে লকডাউন চলছে তা ‘টার্গেটেড’ না ‘বø্যাাংকেট’ তা এখনও স্পষ্ট নয়। যেখানে অনেক মানুষের ভিড় হয়, সেখানে সংক্রমণ বেশি ছড়ায়। সেখানে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা এবং কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধির আওতায় নিয়ে আসা হলো টার্গেটেড পদ্ধতি। আর সারাদেশে যাতায়াত ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়ে সবাইকে ঘরে রাখা হলো বø্যাংকেট অ্যাপ্রোচ। করোনা ঠেকাতে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে যদি না পারি, সেখানে বø্যাংকেট দিতে হবে। এটা এক সময় লকডাউন তুলে নিতে হবে। এ কারণে টার্গেটেড পন্থা অনুসরণ করে তা অনেকদিন ধরে চালাতে হবে। এ ধরনের লকডাউন দিলে নিম্ন আয়ের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে হবে। না হলে তারা খাদ্যের জন্য বাইরে বেরিয়ে গেলে আমরা কেউ নিরাপদ থাকতে পারব না। এটা সফল হবে না, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিরূপ প্রভাব পড়বে।এর আগে গত ৪ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এক সাপ্তাহের লকডাউন সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। করোনার বিস্তার ঠেকাতে ১১ দফা নির্দেশনা দেয়া হয় ওই প্রজ্ঞাপনে। এতে বলা হয় ৫ এপ্রিল সোমবার থেকে আগামী ১১ এপ্রিল রোববার পর্যন্ত লকডাউন চলবে। তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে পরবর্তীতে আরো এক সাপ্তাহ লকডাউনের সময় বৃদ্ধি করা হতে পারে। লকডাউনে রেল, লঞ্চ, গণপরিবহন, অভ্যন্তরীণ বিমান, মার্কেট, শপিংমল বন্ধ থাকবে। তবে গার্মেন্টসহ জারুরি পণ্য বহন করা যাবে। এর আগে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন লকডাউন প্রসঙ্গে জানান, লকডাউন চলাকালে ব্যাংক-বীমা কোম্পানি, শেয়ারবাজারসহ জরুরি সেবা দেয় এমন প্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে।হঠাৎ করে লকডাউন ঘোষণায় মানুষের মধ্যে শুরু হয় অস্থিরতা। অফিস- আদালত চলবে অথচ গণপরিবহন বন্ধ থাকবে এমন স্ববিরোধী সিদ্ধান্তে অনেকেই বিপর্যয়কর অবস্থায় পড়েন। গণপরিবহন না চললে অফিসে যাবেন কেমন করে? কোনো বিকল্প ব্যবস্থা সরকার করেনি। আবার মার্কেট, শপিংমলে জনসমাগম বেশি হওয়ায় সেগুলো বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়া হয়। একই সঙ্গে বাংলা একাডেমির বইমেলা ও বাংলাদেশ গেইম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সরকারের দায়িত্বশীলদের এই স্ববিরোধী সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। অনেকেই দল বেঁধে সপরিবারে ঢাকা ছাড়েন। এতে গণপরিবহনে ঠাসাঠাসি করে ভ্রমণ করায় করোনার সংক্রমণ আরো বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়।

একই চিত্র দেখা গেছে ট্রেনেও। গাদাগাদি করে ট্রেনে মানুষ গ্রামে ফিরেছেন।রাজধানীর হোটেল খোলা রাখা হয়েছে; অথচ মানুষকে বলা হয়েছে খাবার ক্রয় করতে পারবেন কিন্তু হোটেলে বসে খেতে পারবেন না। ভোক্তাদের অভিযোগ এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত নয়। হয় হোটেল বন্ধ রাখতে হবে নয়তো হোটেলে গ্রাহকদের বসে খেতে দিতে হবে। আধাআধি কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় না।লকডাউন ঘোষণার প্রথম দিনই ঢাকার নিউ মার্কেট, গাউছিয়া মার্কেটসহ কয়েকটি মার্কেটের মালিক-শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন মার্কেট খোলা রাখার জন্য। তাদের দাবি স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা চললে মার্কেটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা রাখতে হবে। অতঃপর গতকালও ঢাকায় কয়েকটি মার্কেটের মালিক-শ্রমিক বিক্ষোভ করেছেন। রাজশাহী, রংপুর, সিলেটসহ কয়েকটি বিভাগীয় ও জেলা শহরের দোকান মালিকরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে মার্কেট খেলার রাখার দাবিতে বিক্ষোভ করছেন। মার্কেটের ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের যুক্তি হলো রমজান মাস হলো কাপড় ব্যবসায়ীদের জন্য রুটি-রুজির মাস। সারাবছর যা রোজগার হয় এই এক মাসে বিক্রিতে সে রোজগার হয়। গত বছর করোনার কারণে দোকান বন্ধ রেখে অনেককেই পুঁজি ভেঙে খেতে হয়েছে। এবার রমজানে দোকান বন্ধ রাখা হলে দোকান বিক্রি করে পেটের ভাত জোগাড় করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের নীতিনির্ধারকদের অপরিনামদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে মার্কেট ব্যবসায়ীরা মার্কেট খোলার দাবিতে কঠোর মনোভাব নিয়েছেন। করোনায় জীবন-মরণের কথা চিন্তা করে কঠোর লকডাউন দেয়া হলে তারা মাঠে আন্দোলন ও রাস্তা অবরোধ করার সাহস দেখাতেন না। দোকান মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মনে করেন গার্মেন্টস মালিকদের কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপি রয়েছেন; তারা লকডাউনের মধ্যে গার্মেন্টস খোলা রাখতে সরকারকে বাধ্য করেছেন। কয়েকজন প্রকাশক সরকারি দলের বুদ্ধিজীবী তাদের স্বার্থে বাংলা একাডেমির বইমেলা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একই কারণে বাংলাদেশ গেইম চালু রাখা হয়েছে। এগুলো কোনোটিই জনগুরুত্বপূর্ণ নয়। অথচ সরকার মানুষকে সময় ও প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়েই লকডাউন ঘোষণা করে সাধারণ মানুষকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে।এদিকে লকডাউনে অফিস-আদালত-ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠান খোলা রেখে গণপরিবহন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত গণবিচ্ছিন্নতার নামান্তর। ঢাকায় চাকরি করেন এমন শতকরা ৯০ থেকে ৯৫ জন কর্মজীবীর নিজস্ব কোনো বাহন নেই। সবাই গণপরিবহনে চলাচল করেন, অফিসে যান। কিন্তু গণপরিবহন বন্ধ রাখা হলে এই বিপুল সংখ্যক কর্মজীবী মানুষ কিভাবে অফিসে যাবেন এবং কিভাবে অফিস থেকে বিকেলে বাসায় ফিরবেন সে চিন্তা সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা করেননি। তারা এসি রুমে বসে নিজেদের সিদ্ধান্ত চালিয়ে দিয়েছেন।গত দু’দিন রাজধানীর বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখা গেছে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় অফিসগামী মানুষের দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এমনকি ২০ টাকার ভাড়ার দূরত্ব একশ’ থেকে দেড়শ’ টাকা দিয়ে যাতায়াত করতে হয়েছে। এমনও দেখা গেছে দুই থেকে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে কর্মজীবী নারীরা যানবাহন পাননি। কর্মজীবী মানুষ ৪ কিলোমিটার থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত হেঁটে অফিস করতে বাধ্য হয়েছেন।

পরিকল্পিতভাবে লকডাউন না দেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অথচ এর আগেই বিশেষজ্ঞরা প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আংশিক লকডাউনে কাজ হবে না। গণপরিবহন বন্ধ রেখে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অফিস খোলা রাখতে হলে রাজধানীতে বিআরটিসি বাস নামিয়ে মানুষকে আনা-নেয়া করতে হবে। কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীলরা গণমানুষের কথা চিন্তা না করেই লকডাউনের ডাক দিয়েছেন।‘কাজীর গরু কেতাবে রয়েছে গোয়ালে নেই’ প্রবাদের মতো ঢিলেঢালা লকডাউন হওয়ায় মানুষ নিজেদের মতো করে রাস্তায় নেমেছেন। সামাজিক দূরত্ব রক্ষা দূরের কথা স্বাস্থ্যবিধি মানতে আগ্রহী হননি। কেউ কেউ লকডাউন দেখতে রাস্তায় নেমেছেন। রাজধানীর অনেক এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পুলিশ রাস্তার দোকানপাট তুলে দিচ্ছেন; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চলে গেলে কিছুক্ষণ পর আবার দোকান বসানো হচ্ছে। গত দুই দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাথের দোকানদারদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন ‘টম আর জেরি’র খেলা দেখা গেছে। এ অবস্থায় গতকাল ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ৭ এপ্রিল বুধবার সকাল ৬টা থেকে এটা শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সব সিটি করপোরেশন এলাকায় গণপরিবহন সেবা চালু থাকবে। তবে শহরের বাইরের কোনো পরিবহন শহরে প্রবেশ করতে পারবে না এবং বের হতে পারবে না। তিনি আরো বলেন, লকডাউন পরিস্থিতিতে সরকারি-বেসরকারিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ও জনসাধারণের যাতায়াতে দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গণপরিবহন চলাচলের বিষয়টি শর্ত প্রতিপালন সাপেক্ষে পুনর্বিবেচনা করে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ সময় ঢাকা, চট্টগ্রাম মহানগরসহ গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকার সড়কে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অর্ধেক আসন খালি রেখে গণপরিবহন চলাচল করবে বলে জানান তিনি। প্রতি ট্রিপের শুরু এবং শেষে জীবাণুনাশক দিয়ে গাড়ি জীবাণুমুক্ত এবং পরিবহন সংশ্লিষ্ট ও যাত্রীদের বাধ্যতাম‚লক মাস্ক পরিধান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কোনোভাবেই সমন্বয় করা ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা যাবে না। তবে পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত দূরপাল্লায় গণপরিবহন চলাচল যথারীতি বন্ধ থাকবে।

দেশে করোনা সংক্রমণ হু হু করে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৬৬ জন। এ সময় নতুন করে আরো ৭২১৩ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। গতকাল একদিনে করোনায় মৃত্যু ও আক্রান্তে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অবস্থায় কঠোরভাবে লকডাউন পালিত না হলে করোনাভাইরাসের কারণেই দেশে স্বাস্থ্যসেবায় মহাবিপর্যয় নেমে আসবে। এখনই হাসপাতালে ঠাঁই নেই। তখন করোনা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।জানতে চাইলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, বাংলাদেশে লকডাউন বলতে প্রথম থেকে যে চিত্র আমরা দেখেছি এবং সরকারের যে ঘোষণা কোনোটাই বৈজ্ঞানিক নয়। আংশিক লকডাউন বলতে কোনো লকডাউন নেই। লকডাউন মানেই হলো লকডাউন। সরকার ঘোষিত চলমান লকডাউন যেহেতু বৈজ্ঞানিক নয়, তাই জনসাধারণ এটাকে সেভাবে নেয়নি। কারণ, এটার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, যেভাবে এটা ঘোষণা করা হয়েছে। জনগণকে সম্পৃক্ত করা ছাড়া লকডাউন কর্মসূচি সফল বা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এর আগে শুরু হয় লকডাউন। কিন্তু পরিকল্পনাহীন, অব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণহীনতায় লকডাউন কার্যত ‘তামাশার লকডাউন’ হয়ে গেছে। লকডাউনে সন্ধ্যা ৬টার পর সবকিছু বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়া হলেও এ সময় দেখা গেছে সর্বত্রই ভিড়। মার্কেট-দোকান সবখানে মানুষের স্রোত। স্বাস্থ্যবিধি মানতে মানুষকে বাধ্য করতে গণপরিবহন বন্ধ রাখা হলেও মানুষ গাদাগাদি করে বিকল্প যানবাহনে চলাচল করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আংশিক লকডাউন সফল হয় না। এর বৈজ্ঞানিক ভিক্তি নেই। বিধিনিষেধ বা লকডাউন যাই বলা হোক তা আংশিক বাস্তবায়ন করলে সফলতা আসবে না। লকডাউন দিলে পুরো লকডাউন দিতে হবে। বাস্তবতা হলো প্রশাসন কার্যত আংশিক লকডাউন ঘোষণা করেছে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছর যখন লকডাউন ঘোষণা করা হলো, ওই সময় পুলিশ যা করণীয় সবই করেছে। দোকানপাট বন্ধে নির্দেশনা ও তদারকি, সড়কে অযথা ঘোরাফেরা বন্ধে নজরদারি, অনাহারির বাসায় খাবার পৌঁছে দেয়া, ওষুধ সরবরাহ, রোগী নেয়া, লাশ দাফনে সহায়তা, মাস্ক বিতরণসহ নানারকম কাজ করেছে। কিন্তু এবার দুই দিন পার হয়ে গেলেও পুলিশকে তেমন কোনো ভ‚মিকা পালন করতে দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে যাই বলুক শেষ পর্যন্ত পুলিশকেই ‘লকডাউন’ বাস্তবায়নে ভ‚মিকা রাখতে হবে।

তবে সেটা আগে থেকে করলে প্রকৃত ফল পাওয়া যাবে। না হলে এরকম শতাধিক দিন ‘লকডাউন’ থাকলেও কোনো কাজে আসবে না। করোনা সংক্রমণ এড়াতে ‘লকডাউন’ ঢিলেঢালা নয়, সম্পূর্ণভাবে পালন করতে হবে।৪ এপ্রিল লকডাউন ঘোষণায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ১১ দফা নির্দেশনা জারি এবং তারও আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণায়ের ১৮ দফা নির্দেশনা সবকিছুই যেন ‘অপরিকল্পিত’ লকডাউনের নামান্তর। করোনার কারণে এক বছরের বেশি সময় ধরে স্কুল-কলেজ-মাদরাসা-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। এখন লঞ্চ, গণপরিবহন, ট্রেন, অভ্যন্তরীণ বিমান, মার্কেট, দোকান বন্ধ; অথচ একই সময়ে বাংলা একাডেমির ‘বইমেলা’ ও ‘বাংলাদেশ গেইম’ চালু রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন করোনায় স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকলে বইমেলা খোলা রাখা হচ্ছে কার স্বার্থে? বইমেলায় কি করোনা সংক্রমণ বাড়ায় না? বাংলাদেশে এই করোনার সময় খেলাধুলা অব্যাহত রাখার মাজেজা কি? মানুষের জীবনের চেয়ে বাংলা একাডেমির বইমেলা ও বাংলাদেশ গেইমের মূল্য বেশি? সারাদেশের বিভিন্ন মার্কেটের দোকান মালিক ও শ্রমিকরা আন্দোলনে নেমে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন বইমেলা খোলা রাখলে মার্কেট খোলা রাখতে অসুবিধা কি? কার স্বার্থ রক্ষায় গার্মেন্টস ও বইমেলা খোলা রাখা হয়েছে?বিশেষজ্ঞদের কথাই সত্যি হলো। আংশিক লকডাউন সফল হবে না। গতকাল করোনার বিস্তার ঠেকাতে সারাদেশে এক সপ্তাহের জন্য গণপরিবহন বন্ধের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকাসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় ৭ এপ্রিল থেকে সকাল-সন্ধ্যা গণপরিবহন সেবা চালু থাকবে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন। প্রশ্ন হলো হঠাৎ করে গণপরিবহন বন্ধ করা হলো কেন আর দু’দিনের মাথায় চালু করার ঘোষণা দেয়া হলো কেন? সবই কি গণবিচ্ছিন্নতার কারণে অপরিকল্পিত চিন্তা-চেতনার ফসল?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ খুবই শক্তিশালী। নতুন ভাইরাস খুবই ভয়ঙ্কর। লকডাউন দিয়ে মানুষের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সংক্রমণ ঠেকানো উচিত। আধা-লকডাউন ও ঢিলেঢালা লকডাউনে কোনো কাজ হবে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ৫ এপ্রিল থেকে সারাদেশে এক সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণা করা হচ্ছে। এক সপ্তাহের লকডাউন স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। করোনা ভাইরাসের সুপ্তিকাল ১৪ দিন। করোনা ভাইরাস শরীরে ১৪ দিন পর্যন্ত ঘাপটি মেরে থাকতে সমর্থ। শরীরে প্রবেশের ১৪তম দিনেও ভাইরাসটি রোগ তৈরিতে সক্ষম। এজন্য বৈজ্ঞানিক বিবেচনা থেকে লকডাউন দিলে কমপক্ষে ২ সপ্তাহ হওয়া উচিত। আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, যে লকডাউন চলছে তা ‘টার্গেটেড’ না ‘বø্যাাংকেট’ তা এখনও স্পষ্ট নয়। যেখানে অনেক মানুষের ভিড় হয়, সেখানে সংক্রমণ বেশি ছড়ায়। সেখানে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা এবং কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধির আওতায় নিয়ে আসা হলো টার্গেটেড পদ্ধতি। আর সারাদেশে যাতায়াত ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়ে সবাইকে ঘরে রাখা হলো বø্যাংকেট অ্যাপ্রোচ। করোনা ঠেকাতে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে যদি না পারি, সেখানে বø্যাংকেট দিতে হবে। এটা এক সময় লকডাউন তুলে নিতে হবে। এ কারণে টার্গেটেড পন্থা অনুসরণ করে তা অনেকদিন ধরে চালাতে হবে। এ ধরনের লকডাউন দিলে নিম্ন আয়ের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে হবে। না হলে তারা খাদ্যের জন্য বাইরে বেরিয়ে গেলে আমরা কেউ নিরাপদ থাকতে পারব না। এটা সফল হবে না, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিরূপ প্রভাব পড়বে।এর আগে গত ৪ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এক সাপ্তাহের লকডাউন সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। করোনার বিস্তার ঠেকাতে ১১ দফা নির্দেশনা দেয়া হয় ওই প্রজ্ঞাপনে। এতে বলা হয় ৫ এপ্রিল সোমবার থেকে আগামী ১১ এপ্রিল রোববার পর্যন্ত লকডাউন চলবে। তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে পরবর্তীতে আরো এক সাপ্তাহ লকডাউনের সময় বৃদ্ধি করা হতে পারে।

লকডাউনে রেল, লঞ্চ, গণপরিবহন, অভ্যন্তরীণ বিমান, মার্কেট, শপিংমল বন্ধ থাকবে। তবে গার্মেন্টসহ জারুরি পণ্য বহন করা যাবে। এর আগে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন লকডাউন প্রসঙ্গে জানান, লকডাউন চলাকালে ব্যাংক-বীমা কোম্পানি, শেয়ারবাজারসহ জরুরি সেবা দেয় এমন প্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে।হঠাৎ করে লকডাউন ঘোষণায় মানুষের মধ্যে শুরু হয় অস্থিরতা। অফিস- আদালত চলবে অথচ গণপরিবহন বন্ধ থাকবে এমন স্ববিরোধী সিদ্ধান্তে অনেকেই বিপর্যয়কর অবস্থায় পড়েন। গণপরিবহন না চললে অফিসে যাবেন কেমন করে? কোনো বিকল্প ব্যবস্থা সরকার করেনি। আবার মার্কেট, শপিংমলে জনসমাগম বেশি হওয়ায় সেগুলো বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়া হয়। একই সঙ্গে বাংলা একাডেমির বইমেলা ও বাংলাদেশ গেইম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সরকারের দায়িত্বশীলদের এই স্ববিরোধী সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। অনেকেই দল বেঁধে সপরিবারে ঢাকা ছাড়েন। এতে গণপরিবহনে ঠাসাঠাসি করে ভ্রমণ করায় করোনার সংক্রমণ আরো বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়। একই চিত্র দেখা গেছে ট্রেনেও। গাদাগাদি করে ট্রেনে মানুষ গ্রামে ফিরেছেন।রাজধানীর হোটেল খোলা রাখা হয়েছে; অথচ মানুষকে বলা হয়েছে খাবার ক্রয় করতে পারবেন কিন্তু হোটেলে বসে খেতে পারবেন না। ভোক্তাদের অভিযোগ এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত নয়। হয় হোটেল বন্ধ রাখতে হবে নয়তো হোটেলে গ্রাহকদের বসে খেতে দিতে হবে। আধাআধি কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় না।লকডাউন ঘোষণার প্রথম দিনই ঢাকার নিউ মার্কেট, গাউছিয়া মার্কেটসহ কয়েকটি মার্কেটের মালিক-শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন মার্কেট খোলা রাখার জন্য। তাদের দাবি স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা চললে মার্কেটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা রাখতে হবে। অতঃপর গতকালও ঢাকায় কয়েকটি মার্কেটের মালিক-শ্রমিক বিক্ষোভ করেছেন। রাজশাহী, রংপুর, সিলেটসহ কয়েকটি বিভাগীয় ও জেলা শহরের দোকান মালিকরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে মার্কেট খেলার রাখার দাবিতে বিক্ষোভ করছেন। মার্কেটের ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের যুক্তি হলো রমজান মাস হলো কাপড় ব্যবসায়ীদের জন্য রুটি-রুজির মাস। সারাবছর যা রোজগার হয় এই এক মাসে বিক্রিতে সে রোজগার হয়। গত বছর করোনার কারণে দোকান বন্ধ রেখে অনেককেই পুঁজি ভেঙে খেতে হয়েছে।

এবার রমজানে দোকান বন্ধ রাখা হলে দোকান বিক্রি করে পেটের ভাত জোগাড় করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের নীতিনির্ধারকদের অপরিনামদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে মার্কেট ব্যবসায়ীরা মার্কেট খোলার দাবিতে কঠোর মনোভাব নিয়েছেন। করোনায় জীবন-মরণের কথা চিন্তা করে কঠোর লকডাউন দেয়া হলে তারা মাঠে আন্দোলন ও রাস্তা অবরোধ করার সাহস দেখাতেন না। দোকান মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মনে করেন গার্মেন্টস মালিকদের কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপি রয়েছেন; তারা লকডাউনের মধ্যে গার্মেন্টস খোলা রাখতে সরকারকে বাধ্য করেছেন। কয়েকজন প্রকাশক সরকারি দলের বুদ্ধিজীবী তাদের স্বার্থে বাংলা একাডেমির বইমেলা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একই কারণে বাংলাদেশ গেইম চালু রাখা হয়েছে। এগুলো কোনোটিই জনগুরুত্বপূর্ণ নয়। অথচ সরকার মানুষকে সময় ও প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়েই লকডাউন ঘোষণা করে সাধারণ মানুষকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে।এদিকে লকডাউনে অফিস-আদালত-ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠান খোলা রেখে গণপরিবহন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত গণবিচ্ছিন্নতার নামান্তর। ঢাকায় চাকরি করেন এমন শতকরা ৯০ থেকে ৯৫ জন কর্মজীবীর নিজস্ব কোনো বাহন নেই। সবাই গণপরিবহনে চলাচল করেন, অফিসে যান। কিন্তু গণপরিবহন বন্ধ রাখা হলে এই বিপুল সংখ্যক কর্মজীবী মানুষ কিভাবে অফিসে যাবেন এবং কিভাবে অফিস থেকে বিকেলে বাসায় ফিরবেন সে চিন্তা সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা করেননি। তারা এসি রুমে বসে নিজেদের সিদ্ধান্ত চালিয়ে দিয়েছেন।গত দু’দিন রাজধানীর বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখা গেছে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় অফিসগামী মানুষের দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এমনকি ২০ টাকার ভাড়ার দূরত্ব একশ’ থেকে দেড়শ’ টাকা দিয়ে যাতায়াত করতে হয়েছে। এমনও দেখা গেছে দুই থেকে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে কর্মজীবী নারীরা যানবাহন পাননি। কর্মজীবী মানুষ ৪ কিলোমিটার থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত হেঁটে অফিস করতে বাধ্য হয়েছেন। পরিকল্পিতভাবে লকডাউন না দেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অথচ এর আগেই বিশেষজ্ঞরা প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আংশিক লকডাউনে কাজ হবে না। গণপরিবহন বন্ধ রেখে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অফিস খোলা রাখতে হলে রাজধানীতে বিআরটিসি বাস নামিয়ে মানুষকে আনা-নেয়া করতে হবে।

কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীলরা গণমানুষের কথা চিন্তা না করেই লকডাউনের ডাক দিয়েছেন।‘কাজীর গরু কেতাবে রয়েছে গোয়ালে নেই’ প্রবাদের মতো ঢিলেঢালা লকডাউন হওয়ায় মানুষ নিজেদের মতো করে রাস্তায় নেমেছেন। সামাজিক দূরত্ব রক্ষা দূরের কথা স্বাস্থ্যবিধি মানতে আগ্রহী হননি। কেউ কেউ লকডাউন দেখতে রাস্তায় নেমেছেন। রাজধানীর অনেক এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পুলিশ রাস্তার দোকানপাট তুলে দিচ্ছেন; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চলে গেলে কিছুক্ষণ পর আবার দোকান বসানো হচ্ছে। গত দুই দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাথের দোকানদারদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন ‘টম আর জেরি’র খেলা দেখা গেছে। এ অবস্থায় গতকাল ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ৭ এপ্রিল বুধবার সকাল ৬টা থেকে এটা শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সব সিটি করপোরেশন এলাকায় গণপরিবহন সেবা চালু থাকবে। তবে শহরের বাইরের কোনো পরিবহন শহরে প্রবেশ করতে পারবে না এবং বের হতে পারবে না। তিনি আরো বলেন, লকডাউন পরিস্থিতিতে সরকারি-বেসরকারিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ও জনসাধারণের যাতায়াতে দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গণপরিবহন চলাচলের বিষয়টি শর্ত প্রতিপালন সাপেক্ষে পুনর্বিবেচনা করে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ সময় ঢাকা, চট্টগ্রাম মহানগরসহ গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকার সড়কে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অর্ধেক আসন খালি রেখে গণপরিবহন চলাচল করবে বলে জানান তিনি। প্রতি ট্রিপের শুরু এবং শেষে জীবাণুনাশক দিয়ে গাড়ি জীবাণুমুক্ত এবং পরিবহন সংশ্লিষ্ট ও যাত্রীদের বাধ্যতাম‚লক মাস্ক পরিধান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কোনোভাবেই সমন্বয় করা ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা যাবে না। তবে পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত দূরপাল্লায় গণপরিবহন চলাচল যথারীতি বন্ধ থাকবে।

inqilab

Comments
Loading...