পদ্মা সেতুতে গাড়ি যাবে কোন পথে; রাজধানী ঘিরে সার্কুলার রুটের খবর নেই

0 ৯৪

গাবতলীর গাড়ি পদ্মা সেতু ব্যবহার করে দক্ষিণাঞ্চলে যেতে চাইলে যানজটে ভরা রাজধানীর ভেতর দিয়ে যেতে হবে। একই অবস্থায় পড়তে হবে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দক্ষিণবঙ্গমুখী যানবাহনকে। অথচ রাজধানী ঘিরে সার্কুলার রুট নির্মাণের বহু পুরোনো পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে শহরের ভেতরে প্রবেশ না করেই মহাসড়কের যানবাহন পদ্মা সেতু ব্যবহার করতে পারত।

পদ্মা সেতুর কাজ আগামী বছর দেড়েকের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেতুর দুই প্রান্তে ঢাকার দোলাইরপাড় থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শেষ। কিন্তু রাজধানীর দুর্গম যানজট অতিক্রম করা ছাড়া অন্য মহাসড়কের যানবাহন এই এক্সপ্রেসওয়েতে যাওয়ার সুযোগ নেই।

পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলমুখী যানবাহন চলাচল বাড়বে। এসব গাড়ি ঢাকার ভেতর দিয়ে যেতে হলে রাজধানীর অসহনীয় যানজট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, রাজধানী ঢাকা ঘিরে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এ দুর্ভোগে পড়ার শঙ্কা থাকত না।

পদ্মা সেতু নির্মাণের সঙ্গে সংশ্নিষ্টরা বলছেন, বছর দেড়েকের মধ্যে মূল সেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া যাবে। তবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) জানিয়েছে, এখনই শুরু করা গেলেও কমপক্ষে চার বছর লাগবে ইনার সার্কুলার রুটের গাবতলী থেকে কদমতলী অংশের কাজ শেষ করতে। এ অংশ ঢাকা-আরিচা মহাসড়ককে কেরানীগঞ্জের কদমতলীতে যুক্ত করবে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে। রাজধানীর পশ্চিম প্রান্তে বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় ধরে গাবতলী থেকে বছিলা, হাজারীবাগ, সোয়ারীঘাট হয়ে কদমতলী অংশে সড়ক নির্মাণের পর উত্তরবঙ্গের গাড়ি শহরে প্রবেশ না করেই পদ্মা সেতুতে যেতে পারবে। গাবতলী থেকে চলা বাসগুলোও একই সুবিধা পাবে।

সওজ জানিয়েছে, ঢাকা শহর ঘিরে ৮৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ইনার সার্কুলার রুট নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। দুটি ভাগে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। ইনার সার্কুলার রুট ফেজ-১-এর আওতায় আবদুল্লাহপুর রেলগেট থেকে তেরমুখ, পূর্বাচল, বেরাইদ, ডেমরা পর্যন্ত ২৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে নতুন করে এই অংশে সড়ক নির্মাণ করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ।

অন্যদিকে, পরিকল্পনা অনুযায়ী আবদুল্লাহপুর রেলগেট থেকে ধউর, বিরুলিয়া, গাবতলী, বছিলা, হাজারীবাগ, সোয়ারীঘাট, কদমতলী, তেঘরিয়া, পোস্তগোলা, ফতুল্লা, চাষাঢ়া, শিমরাইল হয়ে ডেমরা পর্যন্ত ৬৩ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে ইনার সার্কুলার রুট ফেজ-২-এর আওতায়। এখানে আগে থেকেই সড়ক আছে, যা প্রশস্ত করতে হবে। তবে সাকল্যে সড়ক নির্মাণ করতে হবে ৪৭ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। কারণ তেঘরিয়া থেকে পোস্তগোলা পর্যন্ত সাড়ে ৮ কিলোমিটার পথ ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের অংশ। আবদুল্লাহপুর রেলগেট থেকে ধউর পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার পথ সেতু কর্তৃপক্ষ নির্মাণ করবে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের আওতায়। অবশিষ্ট ৪৭ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ১২ হাজার ১২৫ কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করে প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (পিডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে সওজ।

সওজের পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রাধিকার পাচ্ছে সাড়ে ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ গাবতলী থেকে কমদতলী অংশ। সংস্থাটির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিন খান জানিয়েছেন, ইনার সার্কুলার রুট ফেজ-২-এর বিস্তারিত সমীক্ষার কাজ শেষ। গাবতলী থেকে কমদতলী অংশের বিস্তারিত নকশাও হয়েছে। এ অংশে সোয়ারীঘাট থেকে কদমতলী পর্যন্ত বড় একটি সেতুর পরিকল্পনা থাকায় বিনিয়োগের জন্য এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (আইআইআইবি) কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাকি অংশ সরকারি অর্থায়নে নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। গাবতলী থেকে কমদতলী অংশের বিস্তারিত নকশাও হয়েছে। বিদ্যমান বেড়িবাঁধে এ সড়ক করা হবে। জমি অধিগ্রহণের ঝামেলা নেই।

১৯৮৭ সালে আবদুল্লাহপুর থেকে সোয়ারীঘাট পর্যন্ত বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়, যা বেড়িবাঁধ নামে পরিচিত। এর ওপরে বর্তমানে দুই লেনের সড়ক রয়েছে। দুই পাশে বাঁধের বিস্তর জমি রয়েছে। সওজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইনার সার্কুলার রুট সব মিলিয়ে ২২০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত হবে। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের আদলে চার লেনের মূল সড়কের দুই পাশে থাকবে ধীরগতির যান চলাচলের জন্য পৃথক লেন। মূল সড়কে উভয়মুখী ৯ দশমিক ৮ মিটার প্রশস্ত ডাবল লেন থাকবে। মূল সড়কের দু’পাশে দেড় মিটার চওড়া শোল্ডার থাকবে। এর পর থাকবে ধীরগতির যান চলাচলে ৬ দশমিক ২ মিটার চওড়া সড়ক। সড়কের দু’পাশেই সার্ভিস লেনের পর তিন মিটার করে জায়গা খালি রাখা হবে। এক পাশে ১০ মিটার জায়গা খালি রাখা হবে ভবিষ্যতে মেট্রোরেল নির্মাণের জন্য।

সওজের ঢাকা জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিন খান জানিয়েছেন, গাবতলী থেকে সোয়ারীঘাট পর্যন্ত জমির সমস্যা নেই। সোয়ারীঘাট থেকে বাবুবাজার সেতু পর্যন্ত অংশ সরু। এরপর সদরঘাট। এই এলাকা দিয়ে সড়ক নির্মাণ করলে বহু স্থাপনা ভাঙা পড়বে। তাই সোয়ারীঘাট থেকে কেরানীগঞ্জের কদমতলী পর্যন্ত সেতু নির্মাণ করা হবে। এখানে ঢাকা-মাওয়ার সঙ্গে যোগ হবে সার্কুলার রুট। তবে এখনও সেতুর বিস্তারিত নকশা হয়নি। সড়ক যেখানে সরু এমন কয়েকটি অংশ এলিভেটেড হবে। এ সড়ক হলে গাবতলীর গাড়ি ঢাকায় ঢুকতে হবে না। উত্তরবঙ্গের গাড়িও এ পথে পদ্মা সেতুতে যেতে পারবে।

সওজ প্রকল্প প্রস্তাব শেষ করলেও আসল কাজ শুরুর বহু ধাপ এখনও বাকি। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিপিপি প্রণয়ন, অর্থায়ন নিশ্চিতের কাজ বাকি। এর পর প্রকল্প সরকারের অনুমোদন পেলে দরপত্রের দীর্ঘ প্রক্রিয়া বাকি থাকবে। অন্তত বছর দুয়েক লাগবে এতে। সড়ক নির্মাণের কাজ শুরুর পর কমপক্ষে আরও বছর দুই লাগবে রাস্তা খুলে দিতে।

অথচ পরিকল্পনার খাতা ছেড়ে বেরুতে না পারা ইনার সার্কুলার রুট নির্মাণের সুপারিশ বহু পুরোনো। ২০০৪ সালে যানজট নিরসনের মহাপরিকল্পনায় (এসটিপি) ছিল এ প্রস্তাব। ২০১৪ সালের সংশোধিত এসটিপিতে (আরএসটিপি) ঢাকা ঘিরে তিনটি বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণের সুপারিশ রয়েছে, যা দুই বছর পর মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। এর পর চার বছর কেটে গেলেও সার্কুলার রুট পরিকল্পনাতেই রয়ে গেছে।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামছুল হক সমকালকে বলেন, ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। পদ্মা সেতু হচ্ছে, কিন্তু সেতুতে গাড়ি কীভাবে যাবে তার পথ করা হয়নি। অথচ আরএসটিপি অনুসরণ করে সার্কুলার রুটগুলো করলে আজ এ সমস্যা হতো না।

পরিবহন খাত সংশ্নিষ্টরাও বলছেন একই কথা। তারা জানিয়েছেন, ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের গাড়ি যানজটে পূর্ণ রাজধানী পেরিয়ে পোস্তগোলা বা বাবুবাজার সেতু হয়ে ঢাকা-মাওয়ায় যেতে হবে। সার্কুলার রুট হলে অনায়াসে আবদুল্লাহপুর দিয়ে সার্কুলার রুট ধরে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে যাওয়া যেত। পদ্মা সেতু চালুর পর আরিচা ঘাটও গুরুত্ব হারাবে। পদ্মা নদী পারাপারে এ ঘাট ব্যবহার কমবে। কিন্তু আরিচামুখী গাড়ি পদ্মা সেতু ব্যবহার করতে চাইলে ঢাকায় প্রবেশ ছাড়া পথ নেই। এতে রয়েছে যানজট বৃদ্ধির শঙ্কা।উৎসঃ   সমকাল

Comments
Loading...