প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা!

0 ১৪

গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নে অস্বাভাবিক ব্যয়ের প্রস্তাব করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বিটুমিনাস কার্পেটিং (বিসি) করতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় (প্রাক্কলন) ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অথচ বাস্তবে সর্বোচ্চ ব্যয় হওয়ার কথা ১ কোটি টাকা। অপরদিকে আরসিসি (রড, সিমেন্ট, কংক্রিট) রাস্তা নির্মাণ করতে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট একাধিক ঠিকাদার ও প্রকৌশলী যুগান্তরকে জানিয়েছেন, এটিও অস্বাভাবিক প্রাক্কলন। এখানে বড়জোর প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হতে পারে দেড় কোটি টাকা। ‘রাজশাহী বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্ত ও শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক প্রস্তাবিত প্রকল্পে এমন প্রস্তাব করা হয়েছে।

এই যখন অবস্থা, তখন পরিকল্পনা কমিশনের চৌকশ কর্মকর্তাদের চোখ এড়াতে পারেনি অস্বাভাবিক ব্যয়ের এই প্রস্তাব। তারা জোরালো আপত্তি দিয়ে প্রস্তাবটি ফেরত পাঠিয়েছে।

এছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে পরামর্শক খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ২৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। যদিও এ বিষয়টি নিয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করেনি। কিন্তু প্রতিটি প্রকল্পে কেন এভাবে পরামর্শ নিতে টাকার শ্রাদ্ধ করতে হয়, তা নিয়ে এ খাতের বিশেষজ্ঞদের রয়েছে হাজারো প্রশ্ন।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের প্রস্তাব শুধু সংশোধন করার জন্য ফেরত দিলে হবে না, এদের জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। এক্ষেত্রে দায়িত্বহীনতার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি মনে করেন, এ ধরনের অভিযোগ তো নতুন নয়। প্রায়ই শোনা যায়। ফলে এদের ছাড়া যাবে না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই কাজের ক্ষেত্রে পরামর্শক কেন লাগবে, তা আমার বোধগম্য নয়। আর লাগলেও এত টাকা কেন? এটিও তদন্তের দাবি রাখে।’ এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা যদি সঠিক না হয় তাহলে ধরে নিতে হবে গোড়াতেই গলদ। কেননা এর ফলে প্রকল্প প্রস্তাবে যেমন নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকে, তেমনই বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়েও দেখা দেয় নানা জটিলতা। শেষ পর্যন্ত সময়মতো বাস্তবায়ন হয় না। অপরদিকে মেয়াদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যয়ও বেড়ে যায়, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। এজন্য উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব থাকলে সেটি পরিকল্পনা কমিশনকে আরও শক্তভাবে দেখা উচিত।’

সূত্র জানায়, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অনুমোদন পেলে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। ২৯ সেপ্টেম্বর প্রকল্পটি নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। ওই সভার কার্যপত্রে বলা হয়েছে, বিদ্যমান পরিপত্র অনুযায়ী ২৫ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে প্রাক্কলিত ব্যয় সংবলিত প্রকল্পের ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা সমীক্ষা) করানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এই প্রকল্পে সংযোজিত সমীক্ষা প্রতিবেদনে স্থানীয়ভাবে প্রকল্প এলাকার কোনো তথ্য নেই। কেবল কিছু জাতীয় পরিসংখ্যান যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া সমীক্ষা প্রতিবেদনটিতে পরিকল্পনা বিভাগের নির্ধারিত ফরম্যাট অনুযায়ী তথ্য সংযোজন করা হয়নি। এ অবস্থায় তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে নির্ধারিত ফরম্যাট অনুযায়ী ফিজিবিলিটি স্টাডি করতে হবে।

জানতে চাইলে এলজিইডির পরিকল্পনা, ডিজাইন ও গবেষণা ইউনিটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (গ্রেড-২) সেখ মোহাম্মদ মহসিন রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে সুনির্দিষ্টভাবে একটি প্রকল্পের বিষয়ে বলা কঠিন। তবে যে কোনো প্রকল্পের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি অঙ্কের বেশি ব্যয় হলে সেটি সমীক্ষা ছাড়া প্রস্তাব করার কথা নয়। কেননা একটি প্রকল্প যখন প্রস্তাব করা হয়, তখন অনেক ধাপ পার হয়েই পরিকল্পনা কমিশনে যায়। তবে আমরা পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনা মেনে চলার চেষ্টা করি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ঠিকমতো না হওয়ায় সঠিকভাবে ব্যয় প্রাক্কলন করা যায় না। অনেক সময় ধারণা করেই ব্যয় প্রস্তাব দেওয়া হয়। এমনকি কখনো ইচ্ছা করেই বেশি ব্যয়ের প্রস্তাব করে। এর পেছনে দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্যের মানসিকতা কাজ করে। কেননা শুরুতেই প্রকল্পের ব্যয় বাড়াতে পারলে ঠিকাদারের কাছ থেকে আগাম বেশি ঘুস নেওয়া সহজ।

প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রস্তাবে বলা হয়েছে, রাজশাহী বিভাগের ৮টি জেলার ৬৭টি উপজেলার পল্লি এলাকায় আধুনিক নাগরিক সুবিধা স্থাপন করে উন্নত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করা হবে। এজন্য ১৬ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ উপজেলা সড়ক ও শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালী করতে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে।

jugantor
Comments
Loading...