বিপদের শঙ্কায় বাংলাদেশ

স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই, প্রতিদিনই বাড়ছে সংক্রমণ নিজের-পরিবার-দেশের স্বার্থে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানার তাগিদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন দেশের মতো বড় অঙ্কের জরিমানা করার তাগিদ বিশ

0 ১১৯

মানুষের মধ্যে গত কয়েক মাস থেকে মাস্ক ব্যবহারে অনীহা, ব্যাপকভাবে সামাজিক অনুষ্ঠান পালন, বেপরোয়া চলাফেরা ও সামাজিক দূরত্ব মানার বালাই নেই। আর তাই হঠাৎ করেই করোনার সংক্রমণ ও হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এদিকে চুক্তি অনুযায়ী সিরামের তৈরি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার যে পরিমাণ বাংলাদেশকে দেয়ার প্রতিশ্রুতি করে, বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি ভারত। সঠিক সময়ে টিকা না পাওয়ায় দেশে চাহিদা অনুযায়ী টিকার সংস্থানও করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি কখন টিকা পাচ্ছি তারও সঠিক কোন তথ্য জানাতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদফতর। একদিকে সংক্রমণ বাড়ছে, অপরদিকে চাহিদা অনুযায়ী টিকা না পাওয়ায় প্রতিদিনই মানুষের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ। এছাড়া আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের আইসিইউগুলোতে আসন সঙ্কট দেখা দিয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যাবধানেই বড় ধরনের এই পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন চিকিৎসকরা। আর স্বাস্থ্যবিধি না মানায় প্রতিদিনই করোনা পরিস্থিতি ঘোলাটে হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে না মানা গেলে দেশে ভয়াবহ আকারে করোনা ছড়াতে পারে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।সংক্রমণ বাড়ার বিষয়টি স্বীকার করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, কয়েকদিন ধরে যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছে, তাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সামাজিক অনুষ্ঠান ও মানুষের বেপরোয়া চলাফেরার কারণে করোনার সংক্রমণ বাড়ছে বলেও মনে করেন তিনি। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করার তাগিদ দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, দেশে করোনার সংক্রমণের হার বেড়ে চলছে। হাসপাতালে রোগী বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক রোগীর অবস্থা ভালো নয়। আর তাই স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক নিজের, পরিবারের এবং দেশের স্বার্থে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহবান জানিয়ে বলেছেন, জনসমাগমস্থল এড়িয়ে চলা এবং সামাজিক অনুষ্ঠান সীমিত করতে হবে। এমনকি এখন অনুষ্ঠান না করারও তাগিদ দেন।এদিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল বাশার মো. খুরশীদ আলম বলেছেন, সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে তাতে দেশ বড় বিপদে পড়তে যাচ্ছে। তিনি বলেন, গেল দুই মাস স্বস্তিতে থাকায়, কেউ এখন স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। এমনকি তার পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, নতুন করে আক্রান্তদের বেশিরভাগই তরুণ, তাদের অধিকাংশেরই আইসিইউ লাগছে।তিনি বলেন, চলমান করোনা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হওয়ায় আবারও কঠোর স্বাস্থ্যবিধির নির্দেশনা দিতে যাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে দেশের সমস্ত হাসপাতালকে প্রস্তুত রাখতে প্রশাসনসহ সিভিল সার্জন অফিসগুলোতে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সারা দেশে আইসিইউগুলো প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। গতকাল বিকেলে সিভিল সার্জনদের সঙ্গে সভায় নতুন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মহাপরিচালক বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি জোরদার করতে এরই মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাই উদ্বিগ্ন চিকিৎসকরাও। তাদের মতে, মহামারীর ভয়াবহতা থেকে দেশের মানুষকে বাঁচাতে এখনই স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করা উচিত। এমনকি স্বাস্থ্যবিধি না মানলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বড় অঙ্কের জরিমানা করারও তাগিদ দেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে করোনা মোকাবিলায় আবারও দেশের সমস্ত হাসপাতাল ও আইসিইউ প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। এছাড়াও চুক্তি অনুযায়ি বাংলাদেশের প্রাপ্ত টিকা দ্রুত পাওয়ার জন্য সিরামকে চাপ প্রয়োগ করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, মানুষের মাঝে এখন টিকা নেয়ার আগ্রহ যে হারে বাড়ছে, তাতে টিকার যোগানে ঘাটতি হলে চাহিদা সামলানো কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে যারা টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণ করেছেন, তাদের সময়মতো টিকা দেয়ার জন্য একই পরিমান দ্বিতীয় ডোজ রেখে দিতে হবে। দ্বিতীয় ডোজ শুরু হচ্ছে আগামী ৭ এপ্রিল। আর তাই চুক্তি অনুযায়ী সিরাম থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে টিকা না পেলে বাংলাদেশের জন্য টিকা কার্যক্রম নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নুসরাত সুলতানা বলেছেন, বাংলাদেশে করোনা আক্রান্তের হার প্রতিদিনই ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। গতকাল সারা বাংলাদেশে এই হার ছিল ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি ল্যাবে যা ছিল ১৭ শতাংশ এবং চিকিৎসক আক্রান্তের হার ৩৩ শতাংশ। তাই তিনি সবাইকে সচেতনতা অবলম্বনের তাগিদ দিয়েছেন।সূত্র মতে, আগামী ৩০ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগেই দেশের সব শিক্ষক ও ১৮ বছরের ওপরের বয়সী শিক্ষার্থীদের টিকা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই ঘোষণার পরপরই নড়েচড়ে বসেন টিকার দায়িত্বে নিয়োজিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কর্মকর্তারা। সঠিক সময়ে টিকা পাওয়া নিয়ে যোগাযোগ রক্ষা করছেন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। চলমান টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি কিভাবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের টিকা নিশ্চিত করা যাবে, তা নিয়ে রীতিমতো উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে। আর এই উদ্বেগ বাড়িয়েছে সঠিক সময়ে সিরাম থেকে টিকা না পাওয়ায়। এদিকে দেশে প্রতিদিনই চাহিদা বাড়ছে টিকা গ্রহীতাদের। আগামী ৭ এপ্রিল থেকে যারা প্রথম ডোজ নিয়েছেন তাদের দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেয়ার কথা রয়েছে। যদিও টিকা প্রদানের হার ইতোমধ্যে কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া সঠিক সময়ে টিকার সংস্থান করতে না পাড়ায় রেজিস্ট্রেশন করেও টিকা না পাওয়ায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, টিকার জন্য এ পর্যন্ত নিবন্ধন করেছেন ৫৬ লাখ ৮০ হাজার ৬৪৩ জন। আর টিকা গ্রহণ করেছেন ৪৩ লাখ ৯৮ হাজার ৯৪ জন।স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. এ বি এম খুরশীদ আলম বলেছেন, টিকার চাহিদা অনুযায়ী যোগানের বিষয়ে আমরা কিছুটা চিন্তিত। তবে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি।

আমরা আশাবাদী, তার মানে আমরা টিকা পাব। তবে কবে নাগাদ টিকা পাচ্ছেন তা নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি।স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, টিকার জোগান অনেকটাই ঝুলে গেছে। এতে করে চলমান টিকাদান কার্যক্রম নিয়েই তারা একরকম হিমশিম খাচ্ছেন। এর মধ্যে এখন কিভাবে মার্চ মাসের মধ্যেই সব শিক্ষক ও ১৮ ঊর্ধ্ব শিক্ষার্থীদের টিকা নিশ্চিত করা যাবে, সেটা বড় চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও করোনার সংক্রমণ বাড়ায় ৩০ মার্চ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার কথা থাকলেও এ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দিপু মনি ইতোমধ্যে এ বিষয়ে আবারো জাতীয় পরামর্শক কমিটির মতামত নেয়ার কথা বলেছেন।স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় ১১৫৯ জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এই সময়ে মারা গেছেন ১৮ জন। আগের দিন শনিবার করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন এক হাজার ১৪ জন, মারা গেছেন ১২ জন। দুই মাসের ব্যবধানে গত বুধবার প্রথমবারের মতো শনাক্তের সংখ্যা হাজারের ঘরে পৌঁছায়। এদিন এক হাজার ১৮ জন শনাক্ত হয়েছেন। ১১ মার্চ এক হাজার ৫১ জন, ১২ মার্চ শনাক্ত হন এক হাজার ৬৬ জন।বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের সর্বোচ্চ হার ছিলো গত জুলাই মাসে। এ পর্যন্ত মাস হিসেবে মোট সংক্রমণের ২২ দশমিক ৪৬ ভাগ হয়েছে ওই মাসে। আর গত ফেব্রুয়ারি মাসে সর্বনিম্ন দুই দশমিক ৮২ ভাগ সংক্রমণ হলেও এখন তা আবার বাড়ছে। চলতি বছরের মার্চ মাসের প্রথম সাত দিনেই তা চারভাগ ছাড়িয়েছে।কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ’র প্রধান ও অ্যানেস্থেসিওলজি প্রফেসর ডা. শাহজাদ হোসাইন মাসুম বলেন, পরিস্থিতি আবার খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমরা নিজেরাই নতুন পরিস্থিতিতে হতভম্ব। এটা যে টিকা আসার পর মানুষ গাছাড়া দিয়েছে শুধু সেই কারণেই হচ্ছে তা আমার মনে হয় না। তাহলে তো আগেই হতো। তিনি বলেন, করোনার নতুন কোন ধরনের বিস্তার ঘটছে। সেটি হতে পারে বাইরে থেকে এসেছে অথবা বিদ্যমান ভাইরাসই নিজেকে বদলে আরো শক্তিশালী হয়েছে। তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আমাদের সামাজিক দূরত্ব অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। টিকা আসছে বলে গাছাড়া দিলে হবে না। আর মাস্ক অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে।ডা. শাহজাদ হোসাইন মাসুম জানান, করোনা টিকার দ্বিতীয় ডোজ নেয়ার দুই সপ্তাহ পর তা কার্যকর হয়। প্রথম ডোজ নিয়েই শরীরে কোভিড প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। কাজেই টিকা নিয়েই নিশ্চিত হওয়া বা স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করা ভয়ঙ্কর বলে উল্লেখ করেন এই চিকিৎসক।ঢাকা মেডিকেলের ভাইরোলজিস্ট ডা. নুসরাত সুলতানা করোনার সংক্রমণ বাড়ার বিষয়ে বলেন, নতুন কোন স্ট্রেইনের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। অনেকে ইউকে স্ট্রেইনের কথা বলছেন। ইউকে স্ট্রেইন মারাত্মক সংক্রামক, যা অন্য স্ট্রেইনের চেয়ে ৭০ শতাংশের বেশী। এছাড়া বারবার মিউটেশনের ফলে বাংলাদেশেই নতুন কোন স্ট্রেইনের জন্ম হতে পারে। যেহেতু আমাদের দেশে জেনোম সিকুয়েন্সিং একেবারেই নগন্য মাত্রায় হচ্ছে, তাই এখনও শনাক্ত হচ্ছে না। আর তাই সবাই মাস্ক পরুন, সঠিকভাবে মাস্ক পরুন। নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখুন এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার আহবান জানান।

inqilab

Comments
Loading...