বিশ্বের পরিত্যক্ত যে শহরগুলোতে বাস করে না কোন মানুষ!

0 ১৯

সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অবধি পৃথিবীর বুকে গড়ে উঠেছে নানা সভ্যতা, যার মুল উপাদান মানুষ। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, কোন অঞ্চলে মানব বসতি গড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যতা। প্রকৃতির ঐশ্বর্যের ওপর নির্ভর করে যেমন সভ্যতা গড়ে ওঠে, তেমনি এর সমাপ্তির সাথে আবার বিনাশ ঘটে কোন সমৃদ্ধশালী জনপদের। পৃথিবীতে এমন অনেক শহর আছে, যা কালের বিবর্তনে আজ পরিত্যাক্ত শহর হিসেবে দাড়িয়ে আছে একাকী ও নিঃসঙ্গ অবস্থায়। আজ জানবো এমন কিছু শহরের কথা।

১. হাওটোওয়ান
চীনের পূর্বাঞ্চলের একটি দ্বীপে অবস্থিত হাওটোওয়ান শহরটিতে ৫০ বছর আগেও মানুষের বসতি ছিল। এ শহরে প্রায় ২০০০ পরিবারের বাস ছিল। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে জেলেদের ধরা মাছের চালান যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে বন্দরটির সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। জেলেরাও চলে যেতে থাকে অন্য জায়গায়। বর্তমানে এখানে দশ জনেরও কম মানুষ রয়েছেন। হাওটোওয়ান এখন শুধুমাত্র পর্যটকদের ভ্রমণ, ঘুরে বেড়ানো এবং ছবি তোলার জন্য পরিচিত।

Houtouwan Abandon City of China

২. বোডি 
যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমে সান ফ্রান্সিস্কো শহরের পূর্বে এবং নেভাডা সীমান্তের সাথেই রয়েছে ভৌতিক শহর হিসেবে পরিচিত বোডি। ১৮৫৯ সালে ডাব্লিউ এস বোডি নামক এক ব্যক্তি এখানে একটি স্বর্ণের খনি আবিষ্কার করেছিলেন। এর কিছুদিন পর প্রবল তুষার ঝড়ের কবলে পরে বোডি ও তার পরিবার পাশেই একটি ছোট লোকালয়ে আশ্রয় এবং ধীরে ধীরে লোকালয়টি বোডি নামেই পরিচিত হয়ে উঠে। কিছুদিন পরেই এখানে আরেকটি স্বর্ণের খনি আবিষ্কৃত হলে শহরটি খুব দ্রুত উন্নত হতে থাকে। ১৮৭৮ সালের মধ্যে বডিতে প্রায় ৫,০০০-৭,০০০ মানুষের বসবাস ছিল। অনেকের মতে ১৮৮০ দশকে বোডি ক্যালিফোর্নিয়ার দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় বৃহত্তম শহর ছিল।

Abandon city Bodie

কিন্তু কয়েক বছর পর খনির স্বর্ণ শেষ হয়ে গেলে, বোডিও ধীরে ধীরে একটি জনপ্রিয় শহর থেকে জন মানবহীন হতে থাকে। ১৯ শতকের শুরুতে এ শহরটি প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বিশাল একটি অগ্নিকান্ডে ব্যবসায়িক স্থাপনাগুলো পুড়ে যাওয়ার পর শহরে যাওয়ার রাস্তাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে এ শহরটি খোলা জাদুঘরে পরিণত হয়েছে।

৩. আকামারা
প্রায় ২৫ বছর আগে কয়লা খনির শহর আবকেজিয়ার আকামারায় বসবাস করত ৫,০০০ বেশি মানুষ। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ৩৬ জন মানুষ এখানে বাস করেন। কয়লা খনি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এ শহরের বাসিন্দারা অন্য শহরে চলে যেতে শুরু করেন। আর গোটা শহরটি পরিত্যক্ত শহরে পরিণত হয়ে যায়।

Abandon city Akarmara 

পরিত্যক্ত এ শহরটিতে এখনও একটি দোকান রয়েছে। যা আকামারাতে থেকে যাওয়া মানুষের প্রয়োজন মেটায়। পাহাড়ি অঞ্চলে শহরটি গড়ে উঠার কারণে আকামারাকে বসবাসের জন্য অভিজাত জায়গায় হিসেবে ধরা হত। কিন্তু এখন অসাধারণ কারুকাজের এ স্থাপনাগুলো প্রকৃতির ছায়ার নিচে লুকিয়ে আছে। বহু পর্যটক ঘুরতে আসেন এ হারিয়ে যাওয়া শহরটি দেখতে।

৫. বুর্য আল বাবাস
মূলত ধনীদের জন্য বিশাল একটি অভিজাত এলাকা হিসেবে তুরস্কের মুদুর্ণ শহরের কাছেই বুর্য আল বাবাসের নির্মাণ শুরু হয় ২০১৪ সালে। বিত্তশালীদের রাজকীয় অনুভূতি দেওয়ার জন্যই এখানে দুর্গের মত বাড়িগুলো তৈরি করা হয়। শহরের কেন্দ্রে একটি বিশাল অভিজাত শপিং মল, থিয়েটার, এবং অন্যান্য নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা রাখারও পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ২০০ মিলিয়নের এ প্রকল্পে একেকটি বাড়িতে ৪-৫ লাখ ডলার ব্যয় করা হয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ৫৮৭টি বাড়ির কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে মাত্র শ খানেক বাড়ি কাতার, দুবাই, সৌদি আরব এবং বাহরাইনের কিছু ধনাঢ্য ক্রেতার কাছে বিক্রি করা সম্ভব হয়েছিল।

Abandon city Burj Al Babas

ডেভেলপার কোম্পানিটি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার পর বাড়ি বিক্রির কাজও বন্ধ হয়ে যায়। মূলত বিশ্ব বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ার এর প্রভাব পড়েছিল এ প্রকল্পে। কিন্তু বর্তমানে এ বাড়িগুলো বাসিন্দার অভাবে ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে যাচ্ছে।

৬. ক্রাকো

এটি খুবি জনপ্রিয় একটি ভূতুড়ে শহর। ইতালির মাঝিরা প্রদেশে রয়েছে এই শহরটি। খ্রিষ্টপূর্ব  ৫৪০ অব্দে গ্রীকদের বসবাস ছিল এই শহরে। ১৮০৭ সালে এক সামরিক অভিযান অনেক মানুষের মৃত্যু  হয়। ১৮৯১ সালের দিকে এখানে হাজার দুয়েক মানুষের বসবাস ছিল। কৃষি উৎপাদন সমস্যার কারনে ১৮৯২-১৯২২ সালের মধ্যে শহর ছাড়তে বাধ্য হয় ১৩০০ এর মত অধিবাসী।

Abandon city Craco

১৯৬৩ সালের ভূমিধ্বস ও ১৯৭২ সালের বন্যা এবং ১৯৮০ সালের ভূমিকম্পের পড়ে শহরটি খালি হয়ে যায়। বৰ্তমানে শহরটি ভূতুড়ে শহরে পরিণত হয়েছে।

৭. প্রিপইয়াট 

উত্তর ইউক্রেন ও বেলারুশের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত এই শহরটি। ১৯৭০ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক শক্তি প্রকল্পের অংশ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল চেরনোবিল পাওয়ার প্লান্ট। কৰ্মি ও বিজ্ঞানিদের আবাসনের জন্য তৈরি হয়েছিল এই শহরটি।

Abandon city Pripyat

১৮৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল চেরনোবিলে ঘটে ইতিহাসের ভয়াবহতম পারমাণবিক দূর্ঘটনা। সেই দূর্ঘটনায় পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ায় ওই দিনের মধেই শহরের বাসিন্দাদের স্থানান্তর করা হয়েছিল। এরপর থেকেই জমজমাট এই শহরটি ভুতুরে শহরে পরিণত হয়।

Comments
Loading...