ভারতের বাধার মুখে কুশিয়ারা থেকেও পানি পাচ্ছে না বাংলাদেশ

0 ৭৮

দীর্ঘ সময় লাগলেও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের তিন বিঘা করিডোর ও স্থল সীমানা সংক্রান্ত বিরোধের সমাধান হয়েছে। তবে গত ১০ বছর ধরেই আটকে রয়েছে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি। এখন কুশিয়ারা নদী থেকে মাত্র ৫ শতাংশ পানিও উত্তোলন করতে পারছে না বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের বাধার মুখেই নদীর পানিবণ্টন সংক্রান্ত বিরোধগুলোর নিষ্পত্তি হচ্ছে না।

কূটনৈতিক একাধিক সূত্রে জানা গেছে, চলমান ভারতের নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রাথমিক আলোচনা সূচিতে কুশিয়ারা থেকে পানি উত্তোলনের বিষয়টি ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতের অনাগ্রহের কারণে আলোচনার সূচি থেকে তা প্রত্যাহার করা হয়। অর্থাৎ তিস্তার মতো এবারও কুশিয়ারার সমাধান হচ্ছে না।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, এবারের নরেন্দ্র মোদির সফর মূলত বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপনকে ঘিরে। এবারের সফরে পানি বিষয়ে কোনো ইস্যু থাকবে না।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের অনাগ্রহের কারণেই কুশিয়ারা নদীর সমস্যাও সমাধান হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে দায়ী ভারতের ‘বড় ভাইসুলভ’ আচরণ। যদিও বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী বলছেন, ভারত কখনো বাংলাদেশের ওপর ‘বড় ভাইসুলভ আচরণ’ করে না।

ঢাকার কূটনৈতিক বিটের প্রতিবেদকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি বিক্রম দোরাইস্বামী বলেন, ‘সৎভাবে বলতে চাই, এমন কিছু ধারণা করাও ঠিক না। কেননা বাংলাদেশ একটি বড় দেশ। এমন চিন্তা করার কোনো কারণই নয়। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের প্রধান বিষয় হচ্ছে উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাই ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে বড় ভাইসুলভ আচরণ করে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।’

নদী বিশেষজ্ঞরা অবশ্য তার এমন মন্তব্যের সঙ্গে একমত নন। জাতীয় নদী কমিশনের সদস্য এবং বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের বিশেষজ্ঞ সদস্য মালিক ফিদা এ খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘সেচের জন্য কুশিয়ারা নদী থেকে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এটি খুবই ছোট একটি প্রকল্প, যার মাধ্যমে মাত্র ৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়ার কথা। ওই নদী থেকে কিছু পানি উত্তোলন করে তা তিনটি ইনটেক খালের মাধ্যমে পানি পাম্প হাউজে নিয়ে সেচ দেওয়ার কথা। কিন্তু যখনই আমরা খাল বানাতে গেলাম, ভারতের পক্ষ থেকে বাধা এলো। তারপর থেকেই এই প্রকল্পের আর কোনো অগ্রগতি নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘যৌথ নদী কমিশনের সদস্য পর্যায়ে যে বৈঠক হয় সেখানে আমরা এই বিষয়টি তুলে ধরেছি। তখন ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা বিষয়টি তাদের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করবে এবং তারা আলোচনা করেছেও।’

মালিক ফিদা এ খান বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে আমরা বলেছি যে এই নদী বিষয়ে আমরা যদি এখনই কোনো চুক্তিতে যেতে না পারি, তবে কমপক্ষে একটি সমাঝোতা স্মারক যেন সই করি। এই সমাঝোতা স্মারকের মাধ্যমে আমরা ৫ শতাংশ পানি উত্তোলন করতে চাই। তাহলে যেটা হবে, আমাদের সেচকাজটা কোনো রকমে চালু করা যাবে। কিন্তু পানিটা উত্তোলন করতে না পারার কারণে যেটা হচ্ছে, আমাদের সেচ প্রকল্পের যে পাম্প হাউজ, এটা হয়তো একটা সময় অকেজো হয়ে যাবে। এই ছোট বিষয়ের জন্য শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনার প্রয়োজন নেই। এ বিষয়ে ২০১৯ সালে সচিব পর্যায়ের বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কোনো মীমাংসা হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভারত বলেছে, এখান থেকে পানি উত্তোলন করলে কী পরিমাণ ঝুঁকি তৈরি হবে তা তারা পরীক্ষা করে জানাবে। একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি বলব, এখানে কোনো ঝুঁকি নেই। যে স্বল্প পরিমাণ পানি এখান থেকে উত্তোলন করা হবে, তার জন্য কোনো ভাঙনের আশঙ্কা থাকবে না। প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছার।’

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘কুশিয়ারা সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক নদী না। কুশিয়ারায় যেখানে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তা ভারতের ডাউনস্ট্রিম। এই জলধার আর ভারতে প্রবেশ করছে না। অর্থাৎ ডাউনস্ট্রিমেও পানি উত্তোলনকে ভারত বাধা দিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে, আপস্ট্রিমে ভারত তিস্তার পানি বন্ধ রেখেছে। অথচ বাংলাদেশের অনুমতি নেয়নি। আবার ভারত আপস্ট্রিমে ফারাক্কা ব্যারাজ করেছে, সেখানে কিন্তু বাংলাদেশের আপত্তিকে আমলে নেওয়া হয়নি।’

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘ভারত সবসময় বলে থাকে, তারা নেইবার হুড ফার্স্ট (প্রতিবেশী প্রথম) নীতি অনুসরণ করে। কিন্তু তাতে আমরা দেখেছি, প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষেত্রে অনেক সময়ই তা ঠিকমতো প্রয়োগ করা হয় না। এক্ষেত্রে ভারতের মধ্যে এক চোখা নীতি কাজ করে থাকে।’

সারাবাংলা

Comments
Loading...