ভারতের ভ্যারিয়েন্টে বিপাকে বাংলাদেশ

সীমান্ত জেলাগুলোতে ডেল্টা সংক্রমণ ছড়াচ্ছে টিকা জোগাড় করাই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ : ডা. মুজাহেরুল হক সামাজিক সংক্রমণ ঠেকাতে আরো সতর্কতা বাড়ানো দরকার : তাহমিনা শিরীন

0 ১৫৪

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ডেল্টায় বিপাকে পড়ে গেছে বাংলাদেশ। একদিকে টিকার সঙ্কট আর অন্যদিকে সীমান্ত বন্ধ করেও করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ঠেকানো যাচ্ছে না। সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন লোক আসা যাওয়া করায় সীমান্তের রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে ব্যাপকভাবে ডেল্টা ছড়িয়ে পড়ায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে আবারো উদ্বেগ বাড়ছে। গত কয়েকদিন ধরে রাজশাহী মেডিক্যাল ও খুলনা মেডিক্যালে মৃত্যু ও সংক্রমণ ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে।রাজধানী ঢাকায় করোনার সংক্রমণ কমে গেলেও ঢাকার বাইরে সীমান্তবর্তীসহ অর্ধেকের বেশিÑ জেলা-শহরে করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সংক্রমণের উর্ধ্বগতির এ বাস্তবতায় প্রায় দেড় মাস ধরে গণটিকা কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। ১৭ কোটি মানুষের দেশে ৫ লাখ, ১০ লাখ টিকা সংগ্রহের রেকর্ড বাজানো হলেও সেগুলো দেশে আসছে না। মানুষ তীর্থের কাকের মতো টিকার জন্য উন্মুখ হয়ে রয়েছেন। গতকালও শনাক্ত রোগীর সংখ্যা এবং মৃত্যুর সংখ্যায় এগিয়ে ছিল রাজশাহী বিভাগ। গত একদিনে মারা যাওয়া ৪৩ জনের মধ্যে ১১ জনই রাজশাহী বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন। ১০ জন ছিলেন চট্টগ্রামের বাসিন্দা। এছাড়া ৮ জন ঢাকা বিভাগের, ৭ জন খুলনা বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত একদিনে ঢাকা বিভাগে যেখানে ৪৮০ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে; সেখানে রাজশাহী বিভাগে পাওয়া গেছে ৬৮২ জন নতুন রোগী। খুলনায় সংক্রমণ ধরা পড়েছে ৫৯৯ জনের মধ্যে। একক জেলা হিসেবে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ ৩৩৯ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। অথচ এ সময়ে ঢাকা জেলায় ২৮৫ জন এবং খুলনা জেলায় ১৫৬ জন, যশোর জেলায় ১২৮ জন, সাতক্ষীরা জেলায় ১১১ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে।ঢাকা বিভাগে দৈনিক শনাক্তের হার ৫.৭ শতাংশে নেমে এলেও রাজশাহী বিভাগে তা বেড়ে ১৭ দশমিক ৩১ শতাংশ হয়েছে। খুলনা বিভাগে তা সামান্য কমে ৩৫ শতাংশ হয়েছে। জেলাওয়ারি হিসেবে এদিন বাগেরহাটে শনাক্ত রোগীর হার ৪৩ শতাংশ, খুলনায় ৩৬ শতাংশ, যাশোরে ৩২.৪ শতাংশ, রাজশাহীতে ২০ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১৩ শতাংশ আর ঢাকায় ৪ শতাংশের কিছু বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ সীমান্ত জেলাগুলোতে করোনা শনাক্তের হার ঊর্ধ্বমুখী। এর কারণ সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে যারা দেশে প্রবেশ করছেন তারা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বহন করে এনে দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ফলে সীমান্ত জেলাগুলোতে সামাজিকভাবে সংক্রমণ বাড়ছে। অথচ ১৫ লাখ মানুষের অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার ২য় ডোজ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে চীনের কাছ থেকে দেড় কোটি ডোজ টিকা কিনতে গিয়ে তার দাম প্রকাশ করে দেয়ায় আরেক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। গতকালও পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন বলেছেন, বিশ্বের সবাই আমাদের টিকা দিতে চায়; কিন্তু কখন দেবে তা কেউ বলে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতার কারণে টিকা পেতে বিলম্ব হচ্ছে। জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা জিএম কাদের বলেছেন, টিকা নিয়ে সরকারি আশ্বাসে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন সাধারণ মানুষ। আন্তর্জাতিক টিকা কূটনীতিতে সাফল্য পাচ্ছে না বাংলাদেশ। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিদিন টিকা পাওয়ার ব্যাপারে আশার বাণী শোনানো হচ্ছে, কিন্তু দৃশ্যমান কোনও সাফল্য নেই।বাংলাদেশে এখন কোন ধরনের করোনাভাইরাস বেশি ছড়াচ্ছেÑ সেটি খুঁজে দেখতে সংক্রমিত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ৫০টি নমুনার জিনম সিকোয়েন্সিং করে চারটি ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে। চারটি ভ্যারিয়েন্টের মধ্যে ৮০ শতাংশই ভারতীয় বা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হার্ড ইমিউনিটির জন্য অন্তত ৭০-৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে। ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক উপদেষ্টা ডা. মুজাহেরুল হক বলেন, টিকা জোগাড় করাই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা যদি ধরে নেই যে ৭০ শতাংশ লোককে আমরা টিকা দেব, তাহলে এখন বাংলাদেশকে এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ২৫ কোটি ডোজ টিকা জোগাড় করতে হবে। এই ২৫ কোটি ডোজ পাওয়া সহজ কথা নয়। আবার যদি বুস্টার ডোজ লাগে তাহলে আরো সাড়ে ১২ কোটি ডোজ লাগবে। তার মানে আমাদের ৪০ কোটি ডোজ টিকার একটা মজুদ রাখতে হবে বা সম্ভাবনা রাখতে হবে। এইটা তখনই সম্ভব যখন আমরা নিজে টিকা তৈরি করতে পারব।রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট বা আইইডিসিআরর সাম্প্রতিক তথ্যে বলা হচ্ছে, নমুনার বাকি ১৬ শতাংশ বিটা বা দক্ষিণ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট আর একটি নমুনা বা ২ শতাংশ হলো অজানা ভ্যারিয়েট।গত ১৬ মে বাংলাদেশে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল আইইডিসিআর। আর এখন তারা বলছে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের ডেল্টা বা ভারতীয় ভ্যারিয়ান্টের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিক সংক্রমণ হয়েছে।জানতে চাইলে আইইডিসিআরের পরিচালক তাহমিনা শিরীন বলেন, সীমান্ত জেলাগুলোতে সতর্কতা এখন আরো বাড়ানো দরকার। যে কোনো ভ্যারিয়েন্টের থেকে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ডেল্টার ভাইরাস ছড়ানোর ক্ষমতা কিন্তু বেশি। সেক্ষেত্রে সাবধানতাটা আমাদের আরো বেশি পালন করতে হবে। যেখানে কিন্তু আমরা কোনো রকমের সচেতনতা কারো মধ্যে দেখছি না সেইভাবে।সংক্রমণের এ পর্যায়ে জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, কার্যকর বিধিনিষেধ, স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার সাথে গণহারে টিকা দিতে পারলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতো। সরকারিভাবে জানা যাচ্ছে, চীন, রাশিয়ার কাছ থেকে টিকা কেনা এবং কোভ্যাক্স থেকে টিকা পাওয়ার অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশ।এ অবস্থায় গণটিকা কার্যক্রম আবার কবে শুরু করা যাবে, সেটি এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারছে না স্বাস্থ্য বিভাগ। উপহার হিসেবে চীন থেকে একদফা পাঁচ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় দফায় উপহারের ৬ লাখের মতো টিকা ১৩ জুন আসবে বলে জানা যাচ্ছে। তবে চীনের সিনোফার্মের কাছ থেকে প্রথমে দেড় কোটি ডোজ টিকা কেনার সিদ্ধান্ত হয়। দামও নির্ধারিত হয় দুই পক্ষের মধ্যে। কিন্তু টিকা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। অথচ ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট হিসেবে পরিচিত ডেল্টা সীমান্ত জেলাগুলোতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

inqilab

Comments
Loading...