যাঁতাকলে মধ্যবিত্ত

0 ৬০

গত বছরের মার্চে করোনা সংক্রমণ শুরুর আগে বেসরকারি চাকরির আয়ে ভালোই চলছিল রিপন শেখের সংসার। দুই সন্তান নিয়ে আদাবরের একটি বাসায় থাকতেন। মহামারি শুরুর পর হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় তার প্রতিষ্ঠান। বন্ধ অবস্থায় দুই মাস বেতন ছিল স্বাভাবিক। পরে তা কমিয়ে অর্ধেক করে দেয়া হয়। চার মাস বন্ধ থাকার পর প্রতিষ্ঠান খুললেও আগের মতো পুরো বেতন পাচ্ছেন না রিপন। বাধ্য হয়ে অপেক্ষাকৃত একটু ছোট বাসা নিয়েছেন কয়েক মাস আগে। আগের চেয়ে অনেক খরচ কমাতে হয়েছে।

রিপন আশায় আছেন সামনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হয়তো আগের অবস্থায় ফিরতে পারবেন। কিন্তু কবে সেই সময় আসবে তা কারও জানা নেই।

শুধু রিপন শেখই নয়, তার মতো লাখো পরিবার করোনায় বিপদগ্রস্ত ও দিশাহারা হয়েছে। আয় কমেছে। কর্মসংস্থান হারিয়েছেন অনেকে। চাকরি বা ব্যবসা করে জীবন চলতো এমন অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার করোনায় অসহায় হয়ে পড়েছে। আর যারা এখনো টিকে থাকার লড়াই করছেন তাদের সামনেও রয়েছে অনিশ্চিত এক সময়। বড় চ্যালেঞ্জ ব্যয় সামলে সামনের দিনগুলোতে টিকে থাকার। এমন অবস্থার মধ্যেই মহামারিকালের দ্বিতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ৬ লাখ তিন হাজার ৬৮১ কোটি টাকার এই বাজেট অনেকটা গতানুগতিক হলেও ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বেশকিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে বাজেটে। আবার দরিদ্র ও অতিদরিদ্রের জন্য সামাজিক সুরক্ষা খাতের ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। এটি এখন লাখো কোটির ঘরে। কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিষয়ে বাজেটে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, এই শ্রেণিই মূলত দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কারোনার আগে থেকেই মধ্যবিত্ত শ্রেণি চাপের মধ্যে রয়েছে। নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম, শিক্ষা-চিকিৎসাসহ নানা খরচের চাপে তাদের ত্রাহি অবস্থা। এ অবস্থায় করোনা এক বড় অভিশাপ হয়ে আসে এই শ্রেণির মানুষের জন্য। বিশেষ করে মহামারির সময়ে সরকারি ও সামাজিক নানা উদ্যোগে দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষ কিছুটা হলেও সহায়তা পাচ্ছেন। তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ না পারছেন চলতে, না পারছেন হাত পাততে।

জাতীয় সংসদে পেশ করা বাজেটে মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য তেমন কোনো সুখবর আসেনি। বরং তাদের আশঙ্কা বাজেটের পর স্বাভাবিকভাবেই কিছু পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়ে। এই বাড়তি মূল্য প্রকারান্তরে সবাইকে দিতে হবে। এতে নতুন করে চাপ বাড়বে জীবন-জীবিকায়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, যে বাজেট পেশ করা হয়েছে তা বাস্তবায়ন এক বড় চ্যালেঞ্জ। বাজেটে মিশ্রভাবে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য দিকনির্দেশনা রয়েছে। তবে মধ্যবিত্তের জন্য কোনো নির্দেশনা নেই। বাজেটের পর এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ পণ্যের দাম ও সেবার মূল্য বাড়লে সবাইকে তা পরিশোধ করতে হবে। তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবেই মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাজেটের পর ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ওদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে করোনাকালের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন কোনো দিকনির্দেশনা নেই। বরং বলা হচ্ছে ব্যবসা ও শিল্পের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোয় কর্মসংস্থান বাড়বে। এই সুবিধা সবাই পাবে। কিন্তু করোনকালে বন্ধ থাকা সরকারি চাকরিতে নিয়োগসহ অন্যান্য স্বায়ত্তশায়িত প্রতিষ্ঠানের শূন্য থাকা পদে নিয়োগ ও নিয়মিত জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি প্রস্তাবিত বাজেটে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যবসা ও শিল্প বিনিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষিত জনবলকে কাজে লাগাতে সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়াও সচল রাখতে হবে। এতে অন্তত কিছু পরিবারের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। ওদিকে করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই শিক্ষার্থীদের বেতন-ফি নিয়মিত আদায় করে যাচ্ছে। সন্তানদের নিয়ে হতাশায় থাকা অভিভাবকরা এই বেতন-ভাতা দিতে গিয়ে বাড়তি চাপ অনুভব করছেন। সরকারের তরফে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন ফি সমন্বয়ের কথা আগেই বলা হয়েছিল। কিন্তু এতো দিনেও তা কার্যকর হয়নি।

গতকাল দুপুরে রাজধানীর মালিবাগ বাজারে কেনাকাটা করতে এসেছিলেন সফিজল নামের একজন ক্রেতা। বাজারে এসে তিনি প্রথমে দোকানির কাছে জানতে চান বাজেটের পর কোনো পণ্যের দাম বেড়েছে কিনা। বাজার পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই পণ্যে দাম বেড়ে যায়। এতে প্রতিবারই লাভবান হয় একটা গ্রুপ। সরকার বড় অর্থের বাজেট দিলেও সাধারণ দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন আসে না। গরিব আরো গরিব হচ্ছে, ধনীরা এই বাজেটকে কাজে লাগিয়ে নিজেরা সুবিধা নিচ্ছে। তিনি বলেন, করোনার সময়ে আয় বাড়ছে না। বরং কমেছে। এই অবস্থায় নতুন বাজেট আসায় কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়বে। এতে বাড়তি চাপ আসবে।

কাওরান বাজারে বাজার করতে আসা মো. হারুন সিকদার বলেন, দেশে করোনার মহামারি চলছে। এই সময়ে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতেও সরকার দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট উপস্থাপন করেছে। বাজেট নিয়ে দেশের মানুষ অনেক বড় স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু গরিব ও নিম্নবিত্ত এবং কৃষকদের এসব নিয়ে ভাবনা নেই। তারা বাজেট থেকে কিছুই পান না। সাধারণ মানুষের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার মতো বাজেট বাস্তবায়ন হলে দেশে উন্নয়ন ঘটবে। সরকারকে এই বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

৬৫ বছর বয়সী রিকশাচালক নসু মিয়া রিকশার প্যাডেলেই তার চার সদস্যের সংসারের জীবিকা খোঁজেন। তিনি বলেন, প্রতি বছর এই সময়ে বাজেট নিয়ে আলোচনা শুনি। বাজেট বুঝি না। এসব বাজেট আমাদের কোনো কাজে আসে না। কিছুই তো পাই না। সরকারের কোনো সাহায্য সহযোগিতা মিলে না। তিনি বলেন, এক কেজি চাল কিনতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা লাগে। এক লিটার তেলের দাম দেড়শ’ টাকা। অন্যসব নিত্যপণ্যের দামও আকাশছোঁয়া। একবেলা খেলে অন্য বেলার চিন্তা করতে হয়। ১৭ বছর ধরে রিকশা চালিয়ে এভাবেই সংসার চলছে। কোনো পরিবর্তন আসেনি। আজাহার উদ্দিন নামের এক ক্রেতা জানান, প্রতি বছর বড় বড় বাজেট ঘোষণা হয়। আর এই বাজেটের চাপে পড়েন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। বাজেট ঘোষণা হলে প্রতিটি পণ্যে দাম বাড়ে। বাড়ে ট্যাক্স। কিন্তু গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের আয় বাড়ছে না।

ওদিকে বাজারে মাছ, মাংস থেকে শুরু করে চাল, ডাল, তেল, পিয়াজসহ সবধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। নিয়মিত বিরতিতেই বাড়ে এসব পণ্যের দাম। একবার কোনো কারণে বাড়লে তা আর কমে না। এতে বেশি অস্বস্তিতে ভোগেন মধ্য ও নিম্নআয়ের মানুষ। কারণ প্রতিদিনের বাজারের হিসাব মেলাতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হয়। গতকাল রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, মাছ-মাংস, শাকসবজিসহ সবকিছুর দামই বাড়তি। চালের ভর মৌসুমেও খুব একটা কমছে না দাম। মোটা চালের দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে। মাঝারি মানের চাল ৬০ টাকা কেজি। ভালোমানের সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭৫ টাকা কেজি। একইভাবে বোতলজাত সয়াবিন তেলের মূল্য উঠেছে লিটারে ১৫২ টাকা। কোম্পানি ভেদে এর দামে তফাৎ থাকলেও ক্রেতারা বলছেন, এর আগে সয়াবিনের এতো দাম কখনো ছিল না। সম্প্রতি পিয়াজ এবং ডালের দাম বেড়েছে নতুন করে। মৌসুমি সবজি ও মাছ মাংসের বাজারেও স্বস্তি মিলছে না ক্রেতাদের।

উৎসঃ   mzamin
Comments
Loading...