রুয়েটে চাকরিপ্রার্থী উপাচার্যের খালু শ্বশুর-শ্যালক-ছোটভাই-ভাগ্নে!

0 ৬৬

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একের পর এক বিধি লঙ্ঘন করার অভিযোগ উঠেছে উপাচার্য অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম শেখের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ৭৮ জনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে রুয়েট। এরমধ্যে বেশিরভাগ প্রার্থীই উপাচার্যের ‘জ্ঞাতিগুষ্টি’ বলে পরিচিত। এছাড়া ভিসির বন্ধুমহল ও নিয়োগ বোর্ডের অন্যান্য সদস্যদেরও রয়েছে নিজ নিজ চাকরিপ্রত্যাশী প্রার্থী।

রুয়েটের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, নিয়ম অনুসারে অফিসার নিয়োগ বোর্ডে থাকেন উপাচার্য, মনোনীত একজন শিক্ষক, স্ব-স্ব বিভাগীয় প্রধান (যখন যে বিভাগের প্রার্থী থাকেন তখন সেই বিভাগীয় প্রধান উপস্থিত থাকেন) এবং একজন এক্সটারনাল (বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের) সদস্য। চার সদস্যের এই নিয়োগ বোর্ডে নিয়ম অনুসারে নিয়োগ বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন উপাচার্য। এছাড়া কর্মচারী বোর্ডে উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, মনোনীত শিক্ষক ও একজন এক্সটারনাল সদস্য থাকেন। কিন্তু এখানে ঘটনা পুরোই উল্টো।

সূত্রগুলো বলছে, নিয়োগ বোর্ডের প্রত্যেকের রয়েছে নিজ নিজ চাকরিপ্রত্যাশী প্রার্থী। যে কারণে নিয়োগ বোর্ডে চারজনের বদলে দুজনকেও দেখা গেছে। ওই পরীক্ষাগুলোতে নিজ নিজ প্রার্থী থাকেন বিধায় লোক দেখানো নিয়ম পালনে তারা বোর্ডে থাকেন না। আবার অনেক ক্ষেত্রে উপাচার্য নিজ প্রার্থীদের নিয়োগ পাকাপোক্ত করার জন্য কিছু কিছু বিভাগীয় প্রধানদের বোর্ডেই রাখেন না।

সূত্র আরও জানায়, গত ২২ ও ২৩ মার্চ অনুষ্ঠিত নিয়োগ বোর্ডের সভাপতির দায়িত্বে উপাচার্য ছিলেন না। ২৩ মার্চ সেকশন অফিসার পদে পরীক্ষায় অংশ নেন সোহেল আহমেদ নামের উপাচার্যের শ্যালক। অপরদিকে ওই দিনই নিয়োগ বোর্ডের সদস্য শিক্ষক ড. রবিউল আওয়ালের স্ত্রী তাশনুভাও সেকশন অফিসার পদে পরীক্ষা দেন। সে কারণে মাত্র দুজন নিয়োগ বোর্ডের সদস্য নিয়েই ভাইভা পরীক্ষা সম্পন্ন হয়।

২৩ মার্চ নিয়োগ বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন রেজিস্ট্রার, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবর্হিভূত। এর আগেও ড. রবিউল আওয়ালের স্ত্রী সহকারী প্রকৌশলী পদে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করায় বোর্ডে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন।

এদিকে রুয়েট অফিসার্স সমিতির একাধিক সূত্র বলছে, শুধু শ্যালকই নয়, উপাচার্যের আপন ছোটভাই লেবুরুর রহমান (লেবু) পরীক্ষা দিয়েছেন দ্বিতীয় শ্রেণির জুনিয়র সেকশন অফিসার হিসেবে। বর্তমানে তিনি ট্রিপল-ই বিভাগের ল্যাব সহায়ক পদে দায়িত্বরত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। কিন্তু তার (লেবু) দ্বিতীয় শ্রেণির অফিসার পদের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

সূত্র আরও বলছে, ভিসির খালু শ্বশুর পিএ-টু-ভিসি পদের পদপ্রার্থী। ভিসির ভাগ্নে ও নিকটাত্মীয়রাও কয়েকটি পদের পদপ্রার্থী। তবে শুধু উপাচার্যই নয়, বোর্ডের প্রত্যেক সদস্যের রয়েছে নিজস্ব চাকরিপ্রত্যাশী প্রার্থী।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে রুয়েটের এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, ‘নিয়ম অনুসারে প্রথমে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তার ফলাফল প্রকাশ হয়। পাস-ফেল হওয়ার পর উত্তীর্ণদের ভাইভা নেয়া হয়। অথচ, এখানে লিখিত পরীক্ষার ফলাফল ছাড়াই গড়ে সবার ভাইভা নেয়া হচ্ছে। আবার এক পদের বিপরীতে একাধিক লোক সিলেকশন করছে রুয়েট প্রশাসন। যেমন-সেকশন অফিসার পদ ৬টি কিন্তু সেখানে নিচ্ছেন ১২ জন। এমন একাধিক পদে জনবল নেয়ার নিয়ম ইউজিসি বা মন্ত্রণালয় অনুমোদিত কি-না তা জানা নেই।’

তিনি বলেন, ‘ভিসি ও নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ছাড়াও রুয়েটকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদেরও রয়েছে চাকরিপ্রত্যাশী প্রার্থী। এছাড়া বাইরের তদবির ও চাপতো আছেই। এমন অনিয়ম ও দুর্নীতি পুরোপুরি রুয়েটের প্রচলিত গেজেটের ১৯ জুলাই, ২০০৩ এর চাকরির শর্তাবলীর (২) ও (৪) ধারার পরিপন্থী। নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে রুয়েট প্রশাসনের এমন কার্যকলাপে নিয়োগ প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এনিয়ে যোগ্য প্রার্থীদের মাঝে দেখা গেছে চরম ক্ষোভ। এর আগেও নিয়োগ নিয়ে ক্যাম্পাসে ভাঙচুর ও সংঘাত সংঘঠিত হয়েছিল।’

রুয়েট সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, রুয়েট ভিসি অনেকটায় নির্ভরশীল রুয়েটের জনসংযোগ কর্মকর্তা এএফএফ মাহমুদুর রহমান দিপনের ওপর। তারা জানান, জনসংযোগ কর্মকর্তা দিপনের বাবা শিক্ষাবিদ শফিকুর রহমান বাদশা। মন্ত্রণালয়ে ভালো প্রভাব থাকায় তিনি (বাদশা) মূলত রুয়েটে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম শেখকে রুয়েটের উপাচার্য হিসেবে পদায়নে সহযোগিতা করেছেন। বর্তমানে তিনি কর্মচারী নিয়োগ বোর্ডের এক্সটারনাল হিসেবে রয়েছেন। আর এই কারণেই জনসংযোগ কর্মকর্তার ওপর উপাচার্য পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল।

তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও বিধিভঙ্গের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম শেখ। রুয়েটের নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়মের বিষয়ে উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলে উপাচার্য বারবার জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে সব বিষয়ে কথা বলতে বলেন। প্রতিবেদক সরাসরি সাক্ষাৎকার চাইলেও তিনি সময় দিতে আপত্তি জানান এবং ব্যস্ত থাকার অজুহাত দেখান।

এ বিষয়ে জনসংযোগ কর্মকর্তা এএফএফ মাহমুদুর রহমান দিপনের কাছে জানতে চাইলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভিসি স্যার ব্যস্ত মানুষ। কী বলতে কী বলেছেন বুঝতে পারেননি। আসলে তিনি হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন আমার কাছে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলে তারপর সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন। এ কারণেই হয়তো তিনি আমার কথা বলেছেন। আর নিয়োগ প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বিষয়ে আমার কোনো কিছুই বলার এখতিয়ার নেই।’

তবে জনসংযোগ কর্মকর্তা স্বীকার করেন তার বাবা শফিকুর রহমান বাদশা কর্মচারী নিয়োগ বোর্ডের সদস্য। নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গত ১৪ তারিখে শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ার কারণে তিনি (বাবা শফিকুর রহমান) ভিসি বরাবর একটি চিঠি দিয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না মর্মে জানিয়েছেন। সেক্ষেত্রে উনার (বাদশা) বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সত্য নয়। এছাড়া আমিও তেমন ক্ষমতা রাখি না এতো বড় কিছু করার।’

উপাচার্যের স্বেচ্ছাচারিতা ও বিধিভঙ্গের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আলমগীর হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের দেশে ৪৮টি বিশ্ববিদ্যালয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ভিসিই মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি সিন্ডিকেটের বিধি বা নির্দেশনার তোয়াক্কা করেন না। যার কারণে নিয়োগ ও অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা দেখা যায়। তারা অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করে ফেলেন। যেমন- বেরোবি, রাবিসহ প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের নিয়ে নিয়োগে স্বজনপ্রীতিসহ নানান অভিযোগ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় মাঝে মধ্যেই শোনা যায়। রুয়েট নিয়েও ইতোমধ্যে নিয়োগে অনিয়মের বিষয়ে জেনেছি।’

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বোর্ডের সদস্যদের প্রভাব ও স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নিয়ম অনুসারে কারো স্বজন নিয়োগ প্রার্থী হলে সে বোর্ডে থাকতে পারেন না। তারপরও যদি কেউ নিয়োগ বোর্ডে থাকে এবং তার প্রার্থী পরীক্ষা দেয়, সেক্ষেত্রে তিনি না থাকলেও নিয়োগ পরীক্ষা প্রভাবিত হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় ভয় ও চাপের কারণে কেউ ভিসির বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারে না। আর তাই, কেউ যদি সুনির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে তথ্য-প্রমাণসহ যৌক্তিকভাবে নিজের নাম, ঠিকানাসহ ইউজিসিকে অভিযোগ করেন তবে অবশ্যই ইউজিসি সেই অভিযোগের তদন্ত করবে।’

উল্লেখ্য, এর আগেও ২০১৪ সালে রুয়েটে নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক চাপ থেকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যা আন্দোলন ও ভাঙচুর পর্যন্ত গড়িয়েছিল।

উৎসঃ   জাগোনিউজ
Comments
Loading...