রেলের মহাপরিকল্পনা

0 ৩৭

সুলভ ও আরামদায়ক ভ্রমণ হিসেবে রেলের বিকল্প নেই বললেই চলে; কিন্তু সবচেয়ে বেশি সম্পদশালী সরকারি সংস্থা হওয়ার পরও আমাদের রেলওয়ে সত্যিকারার্থে যাত্রীবান্ধব ও আরামদায়ক গণপরিবহন হয়ে উঠতে পারেনি।

এর পেছনে দুর্নীতি-অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতাই যে দায়ী, তা প্রমাণিত হয় যাত্রী বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রেলের লোকসান বাড়ার তথ্য থেকে। জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেলের যাত্রী পরিবহন প্রায় সোয়া এক কোটি বেশি হয়েছিল।

কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, যাত্রীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোকসানও। যেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭ কোটি ৭৮ লাখ যাত্রী পরিবহন করে রেলের লোকসান ছিল প্রায় ১২শ’ কোটি টাকা, সেখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯ কোটির কাছাকাছি যাত্রী পরিবহন করে রেলের লোকসান হয়েছে প্রায় ১৬শ’ কোটি টাকা।

এ অবস্থায় রেলে আমূল পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে ৩০ বছরমেয়াদি (২০১৬-৪৫) রেলের মহাপরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে সরকার। ৬ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৩০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৪৫ সালের মধ্যে রেলওয়েতে আরও ৬০০ ইঞ্জিন, ৬ হাজার যাত্রীবাহী কোচ এবং ৭ হাজার মালবাহী ওয়াগন যুক্ত করা হবে।

এছাড়া দেশের সবক’টি জেলাকে রেল নেটওয়ার্কে নিয়ে আসাসহ দূরত্ব অনুযায়ী ইলেক্ট্রনিক ও বুলেট ট্রেনসহ অত্যাধুনিক দ্রুতগতির ট্রেন চালু করা হবে। বিষয়টি অবশ্যই ইতিবাচক। আমরা মনে করি, সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে রেলের সেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য এবং রেলওয়েকে যাত্রীবান্ধব ও লাভজনক করার জন্য প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেয়ার বিকল্প নেই।

এটা সত্য, সরকার এরই মধ্যে রেলের উন্নয়নে অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত নতুন রেললাইন নির্মাণ, মিটারগেজ রেললাইনকে ডুয়েলগেজে উন্নীত করা, নতুন কোচ ও ইঞ্জিন সংযুক্তিসহ নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে এসব প্রকল্পে ১৪ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। আরও অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, যাত্রী বাড়ার পরও রেলের আয় বাড়েনি; বরং লোকসান বেড়েছে, এমনকি ঈদ ও বড় ধরনের উৎসবের সময়ে রেলের সিডিউল ভেঙে পড়ার বিষয়টিও রোধ করা যায়নি। বড় বড় প্রকল্প নেয়া এবং জনগণের লাখো কোটি টাকা খরচের পরও দৃশ্যমান উন্নয়ন কেন থাকবে না- এমন প্রশ্ন ওঠে বৈকি।

৩০ বছরমেয়াদি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ ধরে সত্যিকারার্থেই রেল জনবান্ধব ও ডিসিপ্লিনড লাভজনক সংস্থায় পরিণত হবে বলে আশা করা যায়। এজন্য পরিকল্পনাটি যেন সুষমভাবে ও সঠিক সময়ে শেষ করা যায় তা যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি সৎ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের হাতে দিতে হবে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব।

অন্যথায় অনিয়ম-দুর্নীতি জেঁকে বসে সঠিক সময় ও নির্দিষ্ট অর্থ ব্যয়ে কাজ শেষ নাও হতে পারে। বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে তেমন নজির দেশে একেবারে কম নেই। উদ্বেগের বিষয়, সারা পৃথিবীতে চলাচলের জন্য রেল সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হলেও স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতাব্দীতে এসেও আমাদের রেলওয়ে পশ্চাৎপদ রয়ে গেছে। পৃথক রেলপথ মন্ত্রণালয় হওয়ার পরও দৃশ্যমান উন্নতি নেই বললেই চলে।এ অবস্থায় মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে রেলসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার পাশাপাশি সরকারের বড় ধরনের রাজস্ব আয়ের খাত হয়ে উঠুক রেলওয়ে। সুশাসন, সরকারি বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার ও রেলের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তা করা কঠিন কিছু নয়।

Comments
Loading...