লকডাউনে পিষ্ট দরিদ্র মানুষ : মিলছে না সরকারি সহায়তা

0 ৮৭

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ৫ এপ্রিল থেকে ‘লকডাউনে’ দেশ। ১৪ এপ্রিল থেকে আট দিনের ‘কঠোর লকডাউন’ চলছে। গণপরিবহন, সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালত একেবারেই বন্ধ। মানুষকে ঘরে রাখতে এবার প্রশাসনও কড়া অবস্থানে। ফলে রাস্তাঘাটে মানুষের উপস্থিত খুবই কম। এমন অবস্থায় মহাসংকটে পড়েছে নিম্নআয়ের মানুষ। সব কিছু বন্ধ থাকায় তারা একেবারেই রুটিরুজিহীন অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তাদের জন্য খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা হয়নি। গতবার ‘লকডাউনে’ বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন ত্রাণ বিতরণ করলেও সেটি এবার দেখা যাচ্ছে না। ফলে ‘দিন আনে দিন খায়’ এমন মানুষ সংকটে দিন পার করছে। গত কয়েকদিন সমাজের এসব অসহায় মানুষের মুখেই তাদের দুর্দশার কথা শোনা গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাস্তার ফুটপাতে ছোটখাটো পান সিগারেট বা চায়ের দোকান চালিয়ে যারা সংসার চালাতেন তারা অসহায় অবস্থায় পড়েছেন। কারণ এসব দোকানপাট একেবারেই বন্ধ। এ ছাড়া ভিক্ষাবৃত্তি করে যারা জীবন চালান তারাও অনাহার অর্ধাহারে আছেন। রাস্তাঘাটে মানুষ কম থাকায় তাদের উপার্জনও কমে গেছে।

এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর আমাদের সময়কে বলেন, সরকারকে খেয়াল করতে হবে যেন কেউ অনাহারে না থাকে, যেন নিম্নআয়ের মানুষরা খাবার সংকটে না পড়ে। এ জন্য গরিব, দরিদ্রের ঘরে খাবার পৌঁছে দিতে হবে। লকডাউনের সময় মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বস্তিবাসী এবং নিম্নআয়ের মানুষদের ঘরে খাবার পৌঁছাতে হবে। পাশাপাশি রাস্তার মানুষদেরও খাবার দিতে হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান বলেন, লকডাউনের কারণে যেসব পরিবার সমস্যায় পড়বে তাদের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। গত বছর সাধারণ ছুটির সময় সারাদেশে এক কোটি ২৫ লাখ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। এসব পরিবারের তালিকা সরকারের কাছে রয়েছে। এবারও প্রাথমিকভাবে তাদের সহায়তা করা হবে। পাশাপাশি দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল যে কোনো ব্যক্তি বা পরিবার সমস্যায় থাকলে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে তাদের সহায়তা করা হবে। লকডাউন বাড়লে প্রথমবার সহায়তা দেওয়ার ১৫ দিন পর আবার দেওয়া হবে। স্থানীয় প্রশাসন স্থানীয় বাজার থেকে এসব খাদ্যসামগ্রী কিনে সমস্যাগ্রস্তদের কাছে পৌঁছে দেবে।

তিনি আরও বলেন, চলতি লকডাউন যদি বাড়ানো হয় তা হলে নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে পরবর্তী সপ্তাহ থেকে। এ জন্য চলতি সপ্তাহের শেষে আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। তবে গরিব মানুষ যেন কষ্ট না করে সে জন্য ১২১ কোটি টাকা জিআর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চাইলে সেখান থেকে কর্মকর্তারা ত্রাণ সহায়তা দিতে পারবেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর দুই ঈদের আগে ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ) কার্ডধারীদের মাঝে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়। কিন্তু করোনা বিবেচনায় এবার ঈদের অনেক আগেই ভিজিএফ কর্মসূচির সহায়তা চালু করার নির্দেশ দেয় মন্ত্রণালয়। অথচ জেলা প্রশাসন এখনো ভিজিএফের সুবিধাভোগীদের খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে না। দু-একদিনের মধ্যে সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন একাধিক জেলা প্রশাসক (ডিসি)।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আ.ন.ম. ফয়জুল হক বলেন, ভিজিএফের খাদ্যশস্য শিগগিরই বিতরণ করব। গরিব মানুষকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অন্য কোনো ধরনের সহায়তা দেওয়ার সরকারি কোনো নির্দেশনা আছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, না, এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্দেশনা আমরা পাইনি। আমরা ভিজিএফের সুবিধাভোগীদের মধ্যে সহায়তা সুষ্ঠুভাবে পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। রংপুরের ডিসি আসিব আহসান বলেন, কয়েকদিনের মধ্যেই ভিজিএফের খাদ্য সহায়তা দেওয়া শুরু করব।

সারাদেশে ভিজিএফ কার্ডধারী এক কোটি ৯ হাজার ৯৪৯ অতি দরিদ্র ও দুস্থ পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ৪৯২ উপজেলায় ৮৭ লাখ ৭৯ হাজার ২০৩ জন এবং ৩২৮ পৌরসভায় ১২ লাখ ৩০ হাজার ৭৪৬ জন ভিজিএফ কার্ডধারী রয়েছেন। প্রতি কার্ডের বিপরীতে ৪৫০ টাকা নগদ দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে ৪৫০ কোটি ৪৪ লাখ ৭৭ হাজার ৫০ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া জিআর (খাদ্য ও অর্থ সহায়তা) কর্মসূচির আওতায় ১২১ কোটি টাকা ছাড় করেছে মন্ত্রণালয়। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ভিজিএফ ও জিআরের অর্থ ছাড়ের পরিবর্তে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মোয়াজ্জেম হোসেন (দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি-২, ত্রাণ) বলেন, ভিজিএফ-জিআর কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল গত ১১ এপ্রিল। আমরা ভিজিএফ নীতিমালায় সংশোধন আনতে এটা করেছিলাম। কিন্তু দরিদ্র মানুষের যেন কষ্ট না হয় সে বিবেচনায় গত বৃহস্পতিবার ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে ভিজিএফ সহায়তা এখন চালু হয়েছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ভিজিএফে ৪৫০ কোটি টাকা এবং জিআরে ১২১ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, প্রত্যেক জেলায় সাধারণত যে কোনো দুর্যোগে সহায়তার জন্য ৩০০ টন খাদ্যশস্য মজুদ রাখা হয়। আমরা কয়েকদিন আগে এই মজুদ নিশ্চিত করার জন্য ৬৪ জেলায় ১৭৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছি। এখন জেলা প্রশাসকরা যদি মনে করেন লকডাউনে নিম্নআয়ের মানুষ চলতে পারছে না, সে ক্ষেত্রে তারাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ত্রাণ সহায়তা দিতে পারেন।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, দরিদ্র এক কোটি ২৫ লাখ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। ওই বরাদ্দ পেলেই এসব পরিবারকে ১০ কেজি চাল, এক কেজি ডাল, লবণ ও সয়াবিন তেল এবং চার কেজি আলু দেওয়া হবে। এক সপ্তাহের জন্য একবার সহায়তা পাবে এসব পরিবার। আর লকডাউন না বাড়লে এ কর্মসূচি স্থগিত থাকবে। অথচ লকডাউন শেষের দিকে থাকলেও অর্থ বিভাগ থেকে বরাদ্দ পায়নি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। ফলে দরিদ্রদের সহায়তা দেওয়া যাচ্ছে না।

লকডাউনের মধ্যেও খোলাবাজারে (ওএমএস) ন্যায্যমূল্যে চাল ও আটা বিক্রি চলমান থাকবে। সারাদেশে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের শহরগুলোতে ৭১৫ জন ওএমএস ডিলারের মাধ্যমে মোট ৭১৫টি বিক্রয়কেন্দ্রে ৭৩৩ টন চাল ও ৭৯৬ টন আটা বিক্রি করবে সরকার। ওএমএসের ১০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকও চালু থাকবে। আর সরকারের বাণিজ্যিক সংস্থা টিসিবি বিক্রি বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া নিম্নআয়ের মানুষের পুষ্টির ঘাটতি পূরণে মাছ, ডিম ও মুরগির মাংস বিক্রি করছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। এ অধিদপ্তর প্রয়োজনে গরু ও খাসির মাংসও বিক্রির পরিকল্পনা নিচ্ছে বলে জানা গেছে। কিন্তু যাদের একেবারেই কেনার সামর্থ্য নেই কার্যত তাদের জন্য সরকারি কোনো ত্রাণ সহায়তা এখনো মিলছে না।

উৎসঃ   আমাদের সময়
Comments
Loading...