ইশতেহারে করের কথা বলতে ভয়

0 ৫৩

নির্বাচনের আগে উন্নয়নের হরেকরকম স্বপ্ন দেখায় রাজনৈতিক দলগুলো। এজন্য দলের বিশেষজ্ঞ প্যানেল বসিয়ে সুন্দর সুন্দর কথামালা সাজিয়ে তৈরি করা হয় ভোটার আকৃষ্টের নির্বাচনী ইশতেহার। তবে অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, সেসব উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সম্ভাব্য খরচাপাতির জোগান কোন প্রক্রিয়ায় কোথা থেকে আসবে তার উৎস সম্পর্কে কিছুই স্পষ্ট করা হয় না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এর নেপথ্যে রয়েছে ভোটের মাঠে রাজনৈতিক দলগুলোর করের ভয়। কেননা উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সিংহভাগ অর্থই আসে জনগণের পকেট থেকে যাওয়া করের টাকা থেকে। এ কারণে ভোট চাইতে গিয়ে জনগণকে করের কথা বলা হয় না। তাহলে তারা ভোট হারাবেন। এতে সরকার গঠনের স্বপ্নও তাদের ধূলিসাৎ হতে পারে।

জানা গেছে, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান এবং দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থা সেই বিশাল উন্নয়ন পদক্ষেপে মাত্র ৫ শতাংশ অর্থের জোগান দিচ্ছে। বাকি ৯৫ শতাংশ অর্থই জনগণের দেয়া কর। কিন্তু সেই গুরুত্বপূর্ণ কর ব্যবস্থাটি দেশে কেমন হবে, এর আওতা কিভাবে বাড়ানো হবে, কারা করের আওতায় পড়বে, কর দেয়ার হারটি কতটা সহনীয় থাকবে- সেটি প্রত্যক্ষ না পরোক্ষ করে?

একইভাবে দেশে বিদ্যমান আড়াই কোটি দরিদ্র ও ৯ কোটি নিুবিত্তের স্থির আয়কে ওই কর ব্যবস্থা কোনোভাবে সংকুচিত করবে কিনা? এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ও শিল্পের উৎপাদন ব্যয়, পণ্য ও সেবামূল্যের ওপর সৃষ্ট প্রভাব কেমন হবে- এসব নিয়ে রাজনৈতিক কোনো অঙ্গীকার আসছে না নির্বাচনী ইশতেহারে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, দেশে যদি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাটা পুরোপুরি কার্যকর থাকত তাহলে ক্ষমতায় যেই আসুক দেশের বৃহৎ স্বার্থে সম্প্রসারণমূলক ও সহনীয় একটি উত্তম কর ব্যবস্থার চিন্তা রাজনৈতিক দর্শন থেকেই আসত। তা দলীয়ভাবে নেতাকর্মীদের মধ্যেও চর্চা করা হতো।

সেটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে নির্বাচনী ইশতেহারে করবিষয়ক সাহসী পরিকল্পনা নিয়ে জনগণের কাছে যাওয়ারও স্বচ্ছ সাহস থাকত। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, বিশ্বের অনেক দেশে রাজনৈতিক দলগুলোতে এ ধরনের চর্চা থাকলেও তা নেই বাংলাদেশে। গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কয়েকটি বড় দলের নির্বাচনী ইশতেহার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জনগণের কাছে ভোট চেয়ে দলগুলোর শত শত উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি।

কিন্তু এসব উন্নয়ন করতে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা বেশির ভাগ দলের ইশতেহারেই স্থান পায়নি। কেউ করলেও সেটি পাঁচ-সাত শব্দের একটি লাইনেই সীমাবদ্ধ ছিল। আবার যৌক্তিক খাতে বাড়তি কর বসানোর সাহসী ঘোষণা এবং সব সামর্থ্যবানের করের আওতায় আনার সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়া হয়নি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সভাপতি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, সরকারে গেলেই রাজনৈতিক দলগুলোর কর বিষয়ে ভাবনা-চিন্তা হয়। এর আগে তাদের কোনো বোধোদয় হয় না। হলেও সেটি এড়িয়ে যায়। কেননা তারা নিজেরাই অনেকে করদাতা নন। দলের ভেতরেও কর ফাঁকিবাজের অস্তিত্ব রয়েছে।

ফলে নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে তারা কর বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়ে যেতে পারে না। ভোটের মাঠে রাজনৈতিক দলগুলোর এই করের ভয় আছে। তাই ‘কর চ্যাপ্টার’ ছাড়াই অন্তঃসারশূন্য শত শত প্রতিশ্রুতি তারা দেয়। যার অনেকাংশই বাস্তবায়ন হয় না।

এদিকে করবিষয়ক আগাম প্রস্তুতি ও কৌশলী পরিকল্পনা না থাকার কারণে শক্তিশালী একটি রাজনৈতিক সরকারকেও পুরো মেয়াদে কাক্সিক্ষত মাত্রার রাজস্ব আয়ে আমলানির্ভর হয়েই থাকতে হচ্ছে। আমলাদের সাধারণের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। ফলে করদাতার বাস্তব অবস্থার দিকেও খুব একটা নজর তারা রাখছে না। যেনতেনভাবে তারা সরকারের লক্ষ্যমাত্রার রাজস্ব আদায়ে কর্মকৌশল তৈরি করছে।

সরকারও সেটিই অনুমোদন করছে। এসব কারণে দেশে ঘনঘন রাজস্ব নীতির পরিবর্তন হচ্ছে। প্রতি বছর উদ্যোক্তার ওপর নতুন হারের করভার চেপে বসছে। অন্যদিকে পানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের দামও দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

এ প্রসঙ্গে শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো উন্নয়নের জন্য যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়নের জন্য কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা দরকার তারও একটা হিসাব থাকা দরকার। একই সঙ্গে সেই অর্থটা কিভাবে সংকুলান করা হবে অভ্যন্তরীণ করের মাধ্যমে না আন্তর্জাতিক ঋণ বা অভ্যন্তরীণ ঋণ ব্যবস্থার মাধ্যমে তার ইঙ্গিত থাকা উচিত। বিশেষ করে কর আদায় ব্যবস্থায় পরোক্ষ করের চেয়ে প্রত্যক্ষ করের সম্প্রসারণের বাস্তবসম্মত কৌশল রাজনৈতিক দলগুলো থেকে এলে তা বাস্তবায়ন সহজ হয়।

তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে পরোক্ষ করের নির্ভরতা কমানো যায়। এভাবে কর আদায় যেমন বাড়বে, তেমনি ভোক্তা, ক্রেতা ও ব্যবহারকারীর মধ্যে বিদ্যমান কর বৈষম্য দূরীভূত হওয়ার মধ্য দিয়ে সুষম কর ব্যবস্থাও চালু হবে। জনগণও কর দিতে উৎসাহিত হবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে- এর জন্য যে ধরনের গবেষণা ও পর্যালোচনাধর্মী দীর্ঘ অনুসন্ধানী কাজ করা দরকার সেটা তো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে খুব একটা নেই।

বিদ্যমান কর ব্যবস্থার সার্বিক চালচিত্র নিয়ে অ্যাকশন এইডসহ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) জরিপ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ কর আদায়ের প্রবণতা বেশি। লক্ষ্যমাত্রার রাজস্ব পদক্ষেপে এটা সুস্পষ্ট। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটেও তা ধরা পড়েছে। প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ আগের ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে বর্তমানে ৩৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা প্রচলনের উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়া যেখানে মোট রাজস্বের

৭৫ শতাংশ ও ভারত ৫৬ শতাংশ প্রত্যক্ষ কর খাত থেকে আহরণ করছে।

বাংলাদেশ সেখানে উল্টো হাঁটছে এবং নির্ভরতা বাড়াচ্ছে পরোক্ষ করের ওপর। রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ হিসাব বলছে, এটা মোট রাজস্বের ৬৬ শতাংশ। এর ফলে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব ধরনের পণ্য, ভোগ, সেবা এবং বিনোদন কোনো কিছুই ভ্যাটের বাইরে থাকছে না। এ পরিস্থিতিতে দেশের অধিকাংশ নিম্ন আয়ের মানুষ এবং প্রায় আড়াই কোটির মতো হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীও পণ্য ও সেবা ভোগের ক্ষেত্রে উচ্চবিত্তের সঙ্গে সমান হারে ধার্যকৃত ভ্যাট পরিশোধ করছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, কর ব্যবস্থাটি উন্নয়ন ও জনগণের স্বার্থের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো তা সঠিকভাবে উপলব্ধি করছে না। দলগুলোর নেতৃত্বপর্যায়েও এ বিষয়ক সচেতনতা কম। এর অন্যতম কারণ ক্ষমতার রাজনীতি। এ কারণে কর সংস্কৃতির চর্চা দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও করা হয় না। উল্টো এটাকে তারা নিজেদের একটা আর্থিক বিকাশের সুযোগ হিসাবেই ব্যবহার করছে। ফলে তারা এ বার্তা নিয়ে জনগণের কাছেও যেতে পারছে না।

এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশে এখনও কর সংস্কৃতি সেভাবে গড়ে ওঠেনি। নির্বাচনী ইশতেহারে কর বিষয়ক কিছু নেই সেটি ঠিক নয়। তবে বিস্তৃত পরিসরে নেই এটা ঠিক। এর যৌক্তিক কারণও আছে। নির্বাচনী ইশতেহার খুব ছোট একটা জিনিস। এটা ছোট না হলে মানুষ পড়ে না। সব বিষয় ওইভাবে রাখতে গেলে তো ৫০০ পৃষ্ঠার ইশতেহার তৈরি করতে হবে।অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক যুগান্তরকে বলেন, না না। কোনো ভয়ের কিছু নেই। দেশের উন্নয়ন করতে হলে দেশের আয় দিয়েই করতে হবে। এখন আর বিদেশিরা আমাদের সাহায্য দেবে না। আমরাও নিতে চাই না। সে পর্যায়ে বাংলাদেশ নেইও। নিজস্ব সক্ষমতা নিয়ে উন্নয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ আয় বাড়াতে হবে। এর জন্য করদাতাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতেই হবে। রাজনৈতিক দলগুলো এটা নিয়ে কাজ করতে পারে।

Comments
Loading...