দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশের করোনা মোকাবিলা জটিল হয়েছে

0 ৯৬

দেশব্যাপী দুর্যোগ মোকাবিলা করা বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু নয়। গত কয়েক দশক ধরে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ সফলভাবে মোকাবিলা করে ব্যাপকভাবে প্রশংসা কুড়িয়েছে দেশটি। তবে এ বছর করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারির মধ্যে আরোপিত লকডাউন দেশটির জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার চ্যালেঞ্জ এনে হাজির করে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বিশেষ করে শহুরে দরিদ্রদের উপর এর প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদী।

১৩ই নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৪ লাখ ২৭ হাজার ছাড়িয়েছে। মারা গেছেন ৬ হাজার ১৪০ জন। ধারণা করা হয়, এই মহামারির কারণে দেশটির প্রায় ৫ কোটি মানুষ দরিদ্রসীমায় প্রবেশ করবেন।

গত ২৬শে মার্চ বাংলাদেশ সরকার দেশের ৭৫ শতাংশ অঞ্চলে প্রথমবারের মতো লকডাউন জারি করে। ওই লকডাউনে বেশ দ্রুত বেকার হয়ে যান ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ। সঞ্চয় ও সামাজিক সহায়তা না থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন শহুরে দরিদ্ররা।

তাছাড়া, এদেশে ঐতিহাসিকভাবে বেশিরভাগ সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ক কর্মসূচি গ্রামাঞ্চলের দরিদ্রদের জন্যই তৈরি করা হয়। মে মাসে সরকার বিভিন্ন খাত ও জনগোষ্ঠীর জন্য সাতটি সহায়তা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এসব প্যাকেজ দরিদ্রদের জন্য খুব একটা সহায়ক হয়নি। এগুলোর বেশিরভাগই পোশাক খাত, অন্যান্য শিল্প ও সেবা খাতকে সহায়তা দিতে তৈরি করা হয়েছে।

সরকার অবশ্য ২০২১ অর্থবছরের বাজেটে কটেজ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বরাদ্দ করেছে। তবে জামানতের অভাব ও ব্যবসার বৈধতা নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখে শহুরে দরিদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খাতের মজুরদের জন্য এই ঋণ গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়বে। এদিকে সরকার দরিদ্রদের সামাজিক সুরক্ষা সহায়তা হিসেবে ১১০০ কোটি ডলার বরাদ্দ করেছে। তবে এই কর্মসূচির সুবিধা মূলত গ্রামাঞ্চলের দরিদ্ররাই উপভোগ করবেন, শহুরে দরিদ্ররা নয়।

সরকার গত ৬ই এপ্রিল লকডাউনের মধ্যে একটি বিশেষ খোলা বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রির (ওএমএস) কাজ চালু করে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রতি কেজি চাল মাত্র ০.১২ ডলারে বিক্রি করা হচ্ছিল। কিন্তু এই কর্মসূচির গাড়িগুলোর ওপর রীতিমতো হামলে পড়ে জনগণ। এদিকে, দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ থাকা চাল চুরির অভিযোগে শত শত সরকারি কর্মকর্তা, ক্ষমাতাসীন দলের সদস্য ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।

নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে বিশেষ করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে না পারার কারণে ১৩ই এপ্রিল ওএমএস কর্মসূচি স্থগিত করে দেয় সরকার। পর্যবেক্ষকদের মতে, কর্মসূচিটি স্থগিত করে দেয়াই যুক্তিযুক্ত ছিল। কেননা, সুযোগসন্ধানীরা ত্রাণের খাদ্য মুক্ত বাজারে বিক্রি করা শুরু করলে তা জাতীয় কৌশলগত খাদ্য রিজার্ভেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতো।

কিন্তু সরকার ওএমএসের কোনো বিকল্প কর্মসূচীও চালু করেনি। এতে শহুরে দরিদ্ররা অনাহারে থাকার ঝুঁকিতে পড়েছে। সরকার ওএমএস স্থগিত না করে, স্থানীয় নেতাদের সহায়তা নিয়ে ও দরিদ্র সম্প্রদায়গুলোকে আরো ভালোভাবে চিহ্নিত করে কর্মসূচিটি আরো জোরদার করতে পারতো। আরেকটি বিকল্প উপায় ছিল, কঠোরভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায়ের বিধি আরোপ করে, দরিদ্র এলাকাগুলোয় গণহারে খাবার দেওয়ার জন্য কেন্দ্র খোলা।

এপ্রিল শেষ হওয়ার আগ দিয়ে এক সরকারি ঘোষণায় জানানো হয় যে, ৩ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ইতিমধ্যে খাদ্যত্রাণ পেয়েছে ও ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষের জন্য নগদ টাকা দেওয়া হবে। ১৪ই মে সরকার মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে ৩০ ডলার করে নগদ সহায়তা দেয়।

এই সহায়তার সুবিধাভোগী হন মূলত রিক্সাচালক, দিন মজুর, পোশাককর্মী, ছোট ব্যবসায়ী, হকার, নির্মাণ শ্রমিক, মুরগি ও দুধের খামারে কাজ করা কর্মীদের মতো দেশের ভাসমান গোষ্ঠীগুলো। সরকার স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় বেছে বেছে কাদের ত্রাণ দেওয়া হবে তা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এই বাছাই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ছিল না। ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতাও এই সহায়তা পেয়েছে।

৯ই জুলাই দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজশাহী শহরের কৃষকলীগের সহ-সভাপতি ৩০ ডলার নগদ সহায়তা পেয়েছেন। একই ঘটনা অন্যান্য এলাকায়ও দেখা গেছে। খাদ্য সহায়তা বিতরণের ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা গেছে। নগদ সহায়তার জন্য বাছাইকারীদের বিষয়ে তদন্ত করলে দেখা যায়, ৪ লাখ ৯৩ হাজার মানুষই স্বচ্ছল পরিবারের। তদন্তের পর তাদের সুবিধাভোগীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এতে প্রমাণিত হয় যে, সুবিধাভোগীদের অর্থনৈতিক অবস্থার চেয়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাই ওই তালিকায় বেশি প্রভাব ফেলেছিল।

দরিদ্রদের সহায়তা প্রদানে সরকারের স্বদিচ্ছা রয়েছে। তবে এসব সহায়তা প্রদানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতেও সরকারের কাজ করা উচিৎ। সরকার তিনভাবে এসব নিয়ে কাজ করতে পারে।

প্রথমত, সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে জনসেবাগুলো যাতে বাধাপ্রাপ্ত না হয়। শহুরে ও গ্রামাঞ্চলের দরিদ্ররা যেন সমানভাবে সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারে। শুধু গ্রামাঞ্চলের দরিদ্রদের সহায়তায় জোর দিলে শহুরে দরিদ্রদের দুর্দশা আরো বৃদ্ধি পাবে। তারা ইতিমধ্যেই খাদ্য ঘাটতির ঝুঁকিতে আছে।

দ্বিতীয়ত, ওএমএস সহ ভিন্ন ভিন্ন সহায়তা বরাদ্দ করার প্রক্রিয়া আরও উন্নত করতে হবে। সরকারি অর্থায়নে দেওয়া খাদ্য ও নগদ অর্থ সহায়তা স্থানীয় রাজনৈতিকদের প্রিয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বণ্টিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, এসব কর্মসূচিতে জড়িত বিভিন্ন সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাও ছিল। বিতরণে সমতা নিশ্চিতে, সরকারকে কেবল স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা ও দলীয় অনুসারীদের ওপর নির্ভর না করে কর্মসূচিগুলোয় বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সবশেষে, সরকারের কাছে সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের তথ্যভাণ্ডার ও তাদের বাছাই করার স্পষ্ট মানদণ্ড থাকতে হবে। একইসঙ্গে, কর্মসূচীগুলোর মাধ্যমে রাজনৈতিক নয়, সামাজিক সুবিধা প্রদান নিশ্চিত করতে একটি সুষ্ঠু পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশের ত্রাণ কর্মসূচিগুলোয় নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন ও সম্প্রদায়ের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। বাইরের মানুষদের অন্তর্ভুক্তি রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও স্বজনপ্রীতির মতো প্রতিবন্ধকতাগুলো প্রতিরোধ করতে পারে। নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো বাংলাদেশে বহু বছর ধরে শহুরে ও গ্রামীণ দরিদ্রদের মধ্যে সেবা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। এসব কাজে সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরি ও সমবণ্টন নিশ্চিতে তাদের ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে।

বর্তমানে ক্ষুদা ও দুর্নীতি মোকাবিলা এবং করোনা মহামারি আরও ভালোভাবে সামাল দেওয়ার জন্য সরকারের উচিৎ নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর সঙ্গে মিলে কাজ করা।

(লুতফুন নাহার লতা অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের স্কুল অব সোশ্যাল সাইয়েন্সের একজন গবেষক। তার এই নিবন্ধ ইস্ট এশিয়া ফোরামে প্রথম প্রকাশিত হয়।)উৎসঃ   মানবজমিন

Comments
Loading...