অপ্রতিরোধ্য মাফিয়া চক্র: আবাসিক এলাকায় বেশুমার চাঁদাবাজি

চাঁদার কোনো হিসাব নেই * ভবন নির্মাণ, দোকান, বাজার বাদ যায় না যানবাহন খাতও

0 ১২৩

রাজধানীর বেশির ভাগ আবাসিক এলাকায় কল্যাণ সমিতির নামে চাঁদাবাজির আখড়া গড়ে উঠেছে। অবৈধ পথে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আয়ের সুযোগ থাকায় সমিতিগুলো মাফিয়াচক্রে পরিণত হয়েছে। এদের কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, হয়ে উঠছে অপ্রতিরোধ্য। কেউ কেউ কল্যাণ সমিতির ব্যানারে রাজনীতিও করেন। সমিতির অনেকেই সমাজের খুবই প্রভাবশালী।

এদের টিকি স্পর্শ করাও কঠিন। ফলে তাদের কেউ ঘাটাতে চান না। আবাসিক এলাকায় বসবাসরত লাখ লাখ বাসিন্দা তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে তারা নানারকম চাদা গুনছেন প্রতিনিয়ত। কেউ না দিলে তার ওপর নেমে আসে চতুর্মুখী খড়গ।

বছরব্যাপী বেশুমার চাঁদাবাজির কবলে পড়ে নাস্তানাবুদ নিরীহ এলাকাবাসী। অথচ গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তাঘাট, খেলার মাঠের বহুবিধ সমস্যা সমাধানে তারা এগিয়ে আসে না। ক্ষেত্রবিশেষ সমস্যাগুলো পুঁজি করেই বাণিজ্য চলে। এলাকায় চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি লেগেই থাকে। আছে কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাস। এসব কল্যাণ সমিতির নজরে আসে না। বাসিন্দাদের কল্যাণের চেয়ে নিজেদের কল্যাণ নিয়ে সমিতিগুলো বেশি ব্যস্ত বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

এ প্রসঙ্গে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক রোকনুল হক বলেন, ‘নানাবিধ কারণে অধিদপ্তর থেকে কল্যাণ সমিতির নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। আমরা এখন আর নতুন কোনো সমিতির নিবন্ধন দিচ্ছি না।’

সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বিভিন্ন নামে গড়ে উঠেছে এসব সমিতি। কোথাও কল্যাণ সমিতি, কোথাও হাউজিং সোসাইটি, কোথাও আবার সমবায় সমিতি। হরেক নামের সংগঠন। তবে বেশির ভাগেরই নিবন্ধন নেই। সমিতিগুলো ঘাটে ঘাটে চাঁদা আদায় করছে।

ভবন নির্মাণ, দোকান, বাজার, যানবাহন এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কিছুই বাদ যায় না। আবাসিক এলাকায় মশক নিধন, পরিচ্ছন্নতা কিংবা শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে আদায়কৃত চাঁদার পরিমাণও বিশাল। কল্যাণ সমিতির সাইনবোর্ড ব্যবহার করে আদায়কৃত চাঁদার একটি বড় অংশ চলে যায় নেতাদের পকেটে। অনেকেই সমিতিকে পুঁজি করে গড়ে তুলেছেন নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য।

সরেজমিন উত্তরা : রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলোর মধ্যে বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা উত্তরা মডেল টাউন ১৪টি সেক্টরে বিভক্ত। এর মধ্যে ১২টি সেক্টরে কল্যাণ সমিতি রয়েছে। সমিতির পক্ষ থেকে ফ্ল্যাটপ্রতি মাসিক এবং বার্ষিক ভিত্তিতে চাঁদা আদায় করা হয়। মাসিক চাঁদার পরিমাণ ২ থেকে ৩শ টাকা পর্যন্ত। এক একটি কল্যাণ সমিতির আওতায় কমপক্ষে দেড় থেকে দুহাজার প্লট তথা বাড়ি থাকে।

এসব বাড়িতে গড়ে ১০টি করে ফ্ল্যাট ধরা হলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫ থেকে ২০ হাজার। এ হিসাবে প্রতি মাসে চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা। এছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠান, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও পিকনিকসহ নানা অজুহাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ভূরি ভূরি। সব মিলিয়ে আবাসিক এলাকার কল্যাণ সমিতিগুলোর মাসিক আয়ের পরিমাণ স্থানভেদে কোটির ঘরেও পৌঁছে যায়।

সূত্র বলছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা বলে চাঁদা আদায় করা হলেও আবাসিক এলাকাগুলোতে নিরাপত্তার ছিটেফোঁটাও নেই। প্রকাশ্যে চুরি ছিনতাই হলেও কল্যাণ সমিতির নিরাপত্তারক্ষীরা থাকে নির্বিকার। উত্তরা আবাসিক এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত সীমাহীন। ১৩ নম্বর সেক্টরে কিশোর গ্যাংয়ের নির্মম শিকার স্কুল ছাত্র আদনান হত্যাকাণ্ড। এছাড়া অলিগলিতে মহড়া, মোটরবাইকের শোডাউন এবং তুচ্ছ ঘটনায় মারধরের ঘটনা অহরহ ঘটছে। কিন্তু কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে কোনো উদ্যোগ নেই।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ এলাকায় কল্যাণ সমিতির অফিস গড়ে উঠেছে সরকারি জায়গা দখল করে। কোথাও পার্ক আবার কোথাও মাঠ দখল করে সমিতির কার্যালয় নির্মাণ করা হয়েছে। শত চেষ্টা করেও জায়গা দখলমুক্ত করতে পারছে না রাজউক। কারণ উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হলেই প্রভাবশালীদের ফোন আসে। এছাড়া আদালতে রিট দায়ের করে সব কার্যক্রম থামিয়ে দিতে একটি চক্র সিদ্ধহস্ত। কল্যাণ সমিতির নামে সরকারি প্লট দখলের অভিযোগও রয়েছে।

উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে বিশাল খেলার মাঠ দখল করেছে বিতর্কিত সংগঠন ফ্রেন্ডস ক্লাব। মাঠের পশ্চিম প্রান্তে একটি ৩ তলা ভবনও নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনের নিচে দোকান, কাঁচাবাজার ভাড়া দিয়েছেন ক্লাবের হর্তাকর্তারা। এছাড়া মাঠের একদিকে অবৈধভাবে টেনিস কমপ্লেক্স ও কাবাব ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনে মাঠ ব্যবহারে অর্থ আদায়ের অভিযোগ আছে।

স্থানীয়রা বলছেন, ফ্রেন্ডস ক্লাবের দাপটে ৩নং সেক্টরের খেলার মাঠটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত। অন্তত ১০ বছর ধরে সাধারণ মানুষ মাঠ এলাকা এড়িয়ে চলেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ফ্রেন্ডস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাহিদ আহাম্মেদ সিদ্দিকী রোববার যুগান্তরকে বলেন, ক্লাবের জায়গাটি রাজউক থেকে বরাদ্দ পাওয়া। এছাড়া মাঠের ভেতরে টেনিস কোর্ট থেকে শুরু করে সবই রাজউকের। মাঠ ফ্রেন্ডস ক্লাবের নিয়ন্ত্রণে থাকার অভিযোগটি মোটেও সত্যি নয়। বরং অন্য জায়গার তুলনায় এখানকার মাঠে খেলাধুলার সুন্দর পরিবেশ রয়েছে।

ব্যাঙের ছাতা : মিরপুরের অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কল্যাণ সমিতির সংখ্যা অগণিত। প্রায় প্রতিটি সমিতির বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ। মিরপুর-১ নম্বর এলাকার এফ ব্লক উন্নয়ন পরিষদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমেছে স্থানীয় কাউন্সিলরের কার্যালয়ে। একাধিকবার অভিযোগ দেওয়া হয় প্রয়াত এমপি আসলামের কাছেও। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি।

অভিযোগে বলা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালী নুরুজ চাকলাদার ওরফে জামিল হোসেন চাকলাদার, আব্দুল বাতেন ও হারুনুর রশিদসহ বেশ কয়েকজনের হাতে এফ ব্লক উন্নয়ন পরিষদ জিম্মি। এ এলাকায় প্রায় ২শটি বাড়ি রয়েছে। এখানে দেড় হাজারের বেশি পরিবার বাস করে।

পরিবারপ্রতি মাসে দেড়শ টাকা হারে আদায়কৃত চাঁদার পরিমাণ কয়েক লাখ টাকা। নিরাপত্তা এবং ময়লা বহনকারী কর্মীদের বেতনসহ আনুষঙ্গিক খরচ সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার টাকা। বাকি টাকার কোনো হদিস নেই। এছাড়া স্থানীয় মুদি দোকান থেকে ১শ টাকা, সবজি ভ্যান ও রিকশা থেকেও চাঁদা আদায় করা হয়।

৬নং আল নূরী জামে মসজিদ থেকে এটুজেড ক্লাব পর্যন্ত রাস্তায় ফুটপাত বসিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদাবাজি চলছে দীর্ঘদিন ধরে। ক্লাবের ভেতর মাদক সেবনসহ অপরাধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ করে আসছে এলাকাবাসী। সমিতির নেতাদের আশ্রয়ে চলে মাদক ব্যবসা। স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী সুমন মোল্লা পুরো এলাকায় মাদক নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করেন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নুরুজ চাকলাদার যুগান্তরকে বলেন, চাঁদাবাজির অভিযোগ মোটেও সত্য নয়। এ ধরনের অভিযোগ যারা করেছে তারা নিজেরাই চাঁদাবাজ। বর্তমান কাউন্সিলরের লোকজন এটুজেড ক্লাবের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে সেখানে অনিয়মের অভিযোগ সঠিক নয়। সমিতির দখলও কাউন্সিলরের হাতে।

পণ্য ডেলিভারি থেকেও চাঁদা : অনেক আবাসিক এলাকায় সদস্যদের কাছ থেকে নির্ধারিত চাঁদা ছাড়াও নানা খাত থেকে অর্থ আদায়ের পদ্ধতি চালু রয়েছে। অনলাইনে অর্ডার করা পণ্য ডেলিভারি দিতে এলেও নিকেতনের গেটে চাঁদা আদায় করা হয়। এটি অনেকটা শহরের মধ্যে আরেক শহরের জন্য নির্ধারিত করের মতো। অথচ নিকেতনের বসিন্দাদের কাছে প্রতি মাসে নির্ধারিত চাঁদার হার ৪৫০ টাকা।

ময়লা, মশক নিধন ও নিরাপত্তার কথা বলে এ টাকা আদায় করে নিকেতন সোসাইটি। ৬ এপ্রিল নিকেতন আবাসিক এলাকার ১ নম্বর গেটে এ প্রতিবেদকের কথা হয় নিরাপত্তারক্ষী আজিজের সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, নিকেতনে পার্সেল ঢোকাতে হলে স্লিপ কাটা বাধ্যতামূলক। পার্সেল ছোট হলে ২০০ এবং বড় হলে ৩০০ টাকার স্লিপ কাটতে হয়।

এভাবে চাঁদা আদায় করা আইনসঙ্গত কিনা জানতে চাইলে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর নাসির উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘না তারা কোনোভাবেই সরকারি রাস্তা ব্যবহারের জন্য চাঁদা আদায় করতে পারে না। এ ব্যাপারে কাউন্সিলর কার্যালয়ে বহু অভিযোগ আসছে। নিকেতন সোসাইটির নেতাদের সঙ্গে বসে বারবার বলা হয়েছে, এভাবে চাঁদা আদায় করা যাবে না। কিন্তু তারা কথা শুনতে চায় না।

সূত্র বলছে, নিকেতন সোসাইটির নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছে। পালটাপালটি বিরোধের মুখে সোসাইটির নির্বাচন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দুমাস আগে বর্তমান কমিটি নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু করে। কিন্তু একটি পক্ষ নির্বাচন বন্ধ রাখার আবেদন জানালে নির্বাচন সংক্রান্ত কার্যক্রম স্থগিত করে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়।

jugantor

Comments
Loading...