একটি ঠান্ডা মাথায় খুনের গল্প

0 ১৫৪

রাজধানীর বাড্ডার আফতাব নগরে সাড়ে তিন বছর আগে নিজ বাসায় খুন হওয়া এক যুবকের মৃত্যু রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- সিআইডি। বাহিনীটি বলছে, পৈত্রিক সম্পত্তি ও মৃত মায়ের গহনা হাতিয়ে নিতে সৎ ভাই, সৎ মা, মামা ও চাচার পরিকল্পনায় কিলাররা তাকে গলাকেটে হত্যা করে। এই ঘটনায় সৎ ভাইসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

রবিবার দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডির মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক।

২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর বাড্ডা থানাধীন আফতাব নগরের নিজ বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন মনজিল। এরপর বাড্ডা থানায় একটি মামলা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় সিআইডিকে।

অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক বলেন, পৈত্রিক সম্পত্তি ও মারা যাওয়া মায়ের গহনা হাতিয়ে নিতে সৎ ভাই, মা, মামা ও খোদ বাদী চাচার পরিকল্পনায় তিন ভাড়াটে কিলারের সহায়তায় গলাকেটে হত্যা করা হয় মনজিলকে। আর হত্যার পরিকল্পনায় জড়িত চাচা ফারুক নিজে এই হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঘটনার পরদিন আত্মগোপনে চলে যান সৎ ভাই ইয়াসিন। এজন্য নিখোঁজ ইয়াসিনের সন্ধান চেয়ে থানায় সাধারণ জিডি দায়ের করে কৌশল অবম্বলন করে পরিবারটি।

তিনি বলেন, ওই ঘটনায় নিখোঁজের সৎ ভাই ইয়াসিনকে খুনি টার্গেট করে খুঁজতে থাকে সিআইডি। তদন্তকালে বিশ্বস্ত গুপ্তচরের মাধ্যমে জানা যায় নিখোঁজ ইয়াসিন হক প্রকৃত নাম গোপন করে ছদ্মনাম ব্যবহার করে চট্টগ্রামে দৈনিক জাগরণী পত্রিকার জেলা রিপোর্টার হিসেবে কাজ করছে। সে সূত্র ধরে গত ১৩ মার্চ চট্টগ্রাম মহানগরীর শেরশাহ কলোনি থেকে ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপরই জট খুলতে থাকে মনজিল হত্যাকাণ্ডের। মূলত ইয়াসিনের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে একে একে গ্রেপ্তার করা হয় কিলিং মিশনে সরাসরি জড়িত তিন ভাড়াটে খুনি-রবিউল ইসলাম সিয়াম, মাহফুজুল ইসলাম রাকিব ও সীমান্ত হাসান তাকবীরকে। তার দেয়া তথ্য মতে ভাড়াটে কিলার রবিউল ইসলাম সিয়াম, মাহফুজুল ইসলাম রাকিব এবং সীমান্ত হাসান তাকবীরকে একে একে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ঘটনাস্থল হতে প্রাপ্ত আলামতে থাকা ডিএনএ প্রোফাইলের সাথে পরীক্ষাকালে মিলে যায়। তারা প্রত্যেকে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

এ কর্মকর্তা জানান, মামলা তদন্তকালে জানা যায় ৩/৪ বছর বয়স থাকতে ছোট্ট মনজিলের বাবার সঙ্গে তার খালাতো শ্যালিকা লায়লা ইয়াসমিন লিপির প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে লায়লা ইয়াসমিন লিপির প্ররোচণায় মনজিলের পিতা মইনুল হক ওরফে মনা শাস্তিনগর বাসায় মনজিলের মা সাদিয়া পারভীন কাজলের গায়ে কোরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যা করেন। মনজিলের মায়ের মৃত্যুর পর প্রেমিকা লায়লা ইয়াসমিন লিপিকে বিয়ে করে সংসার শুরু করেন বাবা মনা।

সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, মনজিল, ইয়াসিন এবং ফারুক মিয়ার ছেলে একেএম নেওয়াজের নামে শান্তিনগর বাজারের পিছনে যৌথ মালিকানার একটি ফ্ল্যাট ছিল। ওই ফ্ল্যাটে মনজিলের মা ও মনজিলকে নিয়ে প্রথমে বসবাস করতেন। দ্বিতীয় বিবাহের পর মনজিলের পিতা মনা, মনজিল, তার সৎ মা লায়লা ইয়াসমিন লিপি ও লিপি’র ঔরশজাত সন্তান একেএম ইয়াসিনকে নিয়ে বসবাস করতেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ইয়াসিনের বয়স যখন ১২/১৩ বছর তখন মনজিলের বাবা ফ্ল্যাটটি ইয়াসিন ও মনজিলকে দিয়ে দলিল করিয়ে গোপনে বিক্রি করে দেন। ভাই ফারুক মিয়া তার ছেলের নামের ফ্ল্যাট বিক্রির টাকা চাইলে মনজিল ও মনজিলের পিতা ফারুক মিয়াকে মাদকাসক্ত বলে প্রচার করে বাড্ডাস্থ সেতু নামক একটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে ২ মাস ২১ দিন আটকে রাখেন।

এদিকে মনজিলের বাবা মনার মৃত্যুর পর সম্পত্তি বাগাতে ফারুক মিয়া তার ভাতিজা ইয়াসিন ও ভাড়াটে ৩ খুনিদের দিয়ে মনজিলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে তদন্তে প্রমাণে মিলেছে।

অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক বলেন, ‘মনজিল তার পিতার মৃত্যুর পর মৃত মায়ের স্বর্ণালংকার ফিরে পেতে সৎ মা লায়লা ইয়াসমিন লিপিকে চার্জ করে। সে মনজিলকে জানায় যে, স্বর্ণালংকার তার ভাই আবু ইউসুফ নয়নের নিকট আছে। মনজিল গহনাগুলো ফেরত চাইলে আবু ইউসুফ নয়ন গহনাগুলো ফেরত না দিলে রাজারবাগস্থ বাসায় আবু ইউসুফ নয়নকে লাঞ্ছিত করে। এরপরই মূলত শুরু হয় মনজিল হত্যার পরিকল্পনা। ইয়াসিন তার সৎ ভাই মনজিলকে হত্যার পরিকল্পনার বিষয়ে মামা আবু ইউসুফ পরামর্শ করলে সম্মতি দেয় এবং হত্যার কাজে খরচ করার জন্য ইয়াসিনকে ২০ হাজার টাকাও দেয়। এরপর খুনের পরিকল্পনা করে ইয়াসিন। মা লিপি, মামা আবু ইউসুফ এবং মামলার বাদী চাচা ফারুক মিয়ার সাথে পরামর্শে খুনের আগের দিন ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর ভাড়াটে ৩ খুনি ইয়াসিন হকের বনশ্রীর পৈত্রিক ফ্ল্যাটে রাত্রি যাপন করে। সেখানে গোপন বৈঠক হয় ও ৫ লাখ টাকায় খুনের চুক্তি হয়। খুনের দিন দারোয়ান ছাড়া বাসায় কেউ ছিল না। এই সুযোগ সকালে মনজিলের বাসায় ঢুকে ইয়াসিনের উপস্থিতিতে তিন ভাড়াটে কিলার মনজিলকে গলাকেটে হত্যা করে ‘

সিআইডির তদন্ত কার্যক্রম চলাকালে মামলার বাদী প্রথম থেকেই তদন্তে অসহযোগিতা করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য প্রভাবিত করে আসছিলেন বলে জানান অতিরিক্ত ডিআইজি ওমর ফারুক।

সিআইডির এই কর্মকর্তা জানান, খুনি ইয়াসিন হকের মা লায়লা ইয়াসমিন লিপি, মামা আবু ইউসুফ নয়ন এবং মামলার বাদী ফারুক মিয়াকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ঢাকাটাইমস

Comments
Loading...