বেপরোয়া ছিনতাই-চক্র: আতঙ্কে বেরোবি শিক্ষার্থীরা

0

রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) ক্যাম্পাস সংলগ্ন এলাকায় এখন প্রায় দিনই ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। সন্ধ্যার পর বাসা-মেস থেকে বের হলেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সামনে এসে পথরোধ করে ছিনতাইকারী চক্র। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ধারালো অস্ত্র ঠেকিয়ে টাকা-পয়সাসহ সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র কেড়ে নেয়। বাধা দিতে গেলেই চাকু, চাপাতি কিংবা রাম দা দিয়ে কুপিয়ে জখম করে সব কেড়ে নেয়। গত কয়েকদিন ধরেই একাধিক ছিনতাইয়ের কবলে পড়ছেন তারা। ফলে ছিনতাইকারী চক্রের ভয়ে শিক্ষার্থী-শিক্ষার্থীরা এসব বাসা-মেস থেকে সন্ধ্যার পর বের হতে সাহস পাচ্ছে না। আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে (৯ সেপ্টেম্বর) রাতে পরপর দুটি আলাদা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীরা জানান, প্রথমে রাত ২টা ৩০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটের সামনে জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী পরাগ মাহমুদকে কুপিয়ে জখম করে ছিনতাইকারীরা। এই ঘটনার প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর ভোর সাড়ে চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক মনিরুজ্জামানও লালবাগ-পার্কের মোড় রোডে ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হন।

শিক্ষার্থীরা জানান, পরাগ মাহমুদের বন্ধু থাকেন সরদারপাড়ায়। বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে পার্কের মোড় পার্কভিউ ছাত্রাবাস থেকে পরাগ মাহমুদ বের হলে ১ নম্বর গেটের পূর্ব পাশে মডার্ন মোড়ের দিক থেকে আসা তিন ছিনতাইকারী তার গতিরোধ করে মোবাইলফোন ও নগদ টাকা দাবি করে। তিনি দিতে অস্বীকার করলে ছিনতাইকারীদের একজন চাপাতি বের করে পরাগের ডান হাতে কোপ মারে। এরপর মোবাইলফোন কেড়ে নিয়ে চলে যায়। এ ঘটনায় আহত পরাগ মাহমুদকে প্রথমে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য শুক্রবার দুপুরে বিমানযোগে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়। এদিকে, শিক্ষক মনিরুজ্জামান মজনুকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আরও জানান, গত ২০ আগস্ট মেসের তালা ভেঙে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ছিনতাইয়ের সময় ছিনতাইকারীদের হামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ শিক্ষার্থী আহত হন। ছিনতাইকারীরা এই দুই শিক্ষার্থীর গলায় রামদা ধরে বলে, ‘তোদের কাছে যা আছে, দিয়ে দে। নাইলে কোপা দিয়ে গর্দান ফেলে দেবো।’ এরপর একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন এবং পাশের কক্ষ থেকে ঘুমন্ত আরেকজনকে কোপানোর ভয় দেখিয়ে আরও একটি মোবাইলফোন নিয়ে চলে যায়। একইদিন বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন চকবাজার এলাকার এক মেসে শিক্ষার্থী নাজমুল হুদাকেও ছুরিকাঘাত করে তার মোবাইলফোন কেড়ে নেয় ছিনতাইকারীরা।

ধারাবাহিক ছিনতাইয়ের এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে দুর্বৃত্তদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে শুক্রবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে চারটায় মানববন্ধন করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধন শেষে বিকেল ৫ টা থেকে সন্ধ্যা ৬.৩০ টা পর্যন্ত ঢাকা-কুড়িগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন তারা। অবরোধ-সমাবেশ থেকে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনারও দাবি জানান। এছাড়া, অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন শিক্ষার্থীরা।

ছিনতাইয়ের ঘটনায় শুক্রবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আনোয়ারুল আজিম বাদী হয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন তাজহাট থানায় মামলা দায়ের করেছেন।

এদিকে, শনিবার দুপুর ১২টায় রংপুর মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) আবু মারুফ হোসেন জানান, ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে রিফাত হোসেন আলিফ নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই সময় তার কাছ থেকে ছিনতাই হওয়া মোবাইলফোনসহ কিছু টাকাও জব্দ করা হয়েছে। এই ঘটনায় রিফাতের সঙ্গে আরও দুজন অংশ নিয়েছিল। তাদেরও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।

ইত্তেফাক অনলাইনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গোলাম রব্বানী বলেন, ‘শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আহত হওয়ার খবর শুনে অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়েছি। এছাড়া, তাদের দেখেও এসেছি।’

এ বিষয়ে ইত্তেফাক অনলাইনকে বেরোবির উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. হাসিবুর রশীদ বলেন, ‘ক্যাম্পাসের ভেতরে আমরা যথেষ্ট নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছি। কিন্তু ক্যাম্পাসের বাইরে তো আসলে আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। তারপরও আমরা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা অপরাধীদের ধরাসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করবেন বলে আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন।’

ইত্তেফাক অনলাইনকে তাজহাট মেট্রোপলিটন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আখতারুজ্জামান প্রধান বলেন,‘শিক্ষার্থীকে কুপিয়ে আহতর ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আমরা এ ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করেছি । সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ সজাগ রয়েছে।’

ইত্তেফাক

Comments
Loading...