প্রকল্প কোটি টাকার, পানি আসে না এক লিটার!

0 ৯০

মেয়াদ শেষ হলেও কাজ হয়নি ৪০ শতাংশ।

মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য বসে আছেন উপ-প্রকল্প পরিচালক

সচল ইউনিটে দিনে এক লিটার পানিও আসে না

জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে বাগেরহাটের উপকূলীয় উপজেলা রামপাল ও মোংলায় বানানো হয়েছিল ‘স্বয়ংক্রিয় সৌরচালিত পানি বিশুদ্ধকরণ ইউনিট’। স্থানীয়দের আশা ছিল, এবার বুঝি প্রাণভরে অন্তত পানি পান করতে পারবেন। সে আশার গুড়ে রীতিমতো লবণ পড়েছে। লবণাক্ত এই অঞ্চলের দুঃস্থ ও দরিদ্র মানুষগুলোর পানি পান প্রকল্পে নয়-ছয় অবস্থা। নির্মাণের পরপরই অকেজো হয়ে পড়েছে প্রায় সবকটি বিশুদ্ধকরণ ইউনিট। সংশয় দেখা দিয়েছে- জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের ৮ কোটি টাকার প্রকল্পটি থেকে আদৌ সুফল মিলবে কিনা।

‘অজ্ঞাত কারণে’ ইউনিট অকেজো হওয়ার কারণও বলতে পারছেন না স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে বাগেরহাটের জনগোষ্ঠীর জন্য সুপেয় পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২টি ‘স্বয়ংক্রিয় সৌরচালিত পানি বিশুদ্ধকরণ ইউনিট’ নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয় ২০২০ সালের ডিসেম্বরে।

ওই বছরের জুলাইতে মোংলার বুড়িরডাঙ্গা ইউনিয়নে প্রথম পানি বিশুদ্ধকরণ ইউনিটের নির্মাণকাজ শুরু হয়। নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে দায়সারাভাবে প্রকল্পের কাজ শুরু হয় বলে এই আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহারকে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন। তিনি স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি দেখার নির্দেশ দেন। এরপর সেই ১৫টি ইউনিট ভেঙে আবার নির্মাণ করা হয়।

পরে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হলে মোংলায় ১৩৫টির মধ্যে ৪৪টি এবং রামপালে ৬৭টির মধ্যে ২৬টি ইউনিট নির্মাণ করা হয়। কিন্ত বেশিরভাগ ইউনিটই অকেজো পড়ে আছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, স্থানীয় পুকুর থেকে পানি এনে বড় পানির টাংকিতে রাখতে হয়। সোলারে বিদ্যুৎ দিয়ে ওই পানি ওঠার কথা নির্দিষ্ট প্যানেলে। সূর্যের তাপে বাষ্প হয়ে সেই পানি ৫টি প্যানেল ঘুরে আবার ছোট পানির ট্যাকিংতে জমা হওয়ার কথা। সেখান থেকেই মিলবে সুপেয় পানি। প্রতি ইউনিটের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় চার লাখ টাকা।

কিন্তু বড় পানির টাংকিতে পানি তোলার কোনও ব্যবস্থা রাখা হয়নি। বেশিরভাগ ইউনিটে পানি দেওয়া থাকলেও পানযোগ্য পানি পাওয়া যাচ্ছে না।

মোংলা উপজেলার মাকড়ধন গ্রামের ফজলুর রহমান বলেন, প্লান্ট নির্মাণ দেখে মনে করেছিলাম আমাদের পানির কষ্ট বুঝি কাটতে যাচ্ছে। কিন্তু এখনও প্লান্ট থেকে কেউ একফোঁটা পানি পায়নি। কোথায় কী সমস্যা তা দেখারও কেউ নেই।

এলাকার রফিকুল ইসলাম বলেন, প্লান্ট তৈরির পরপরই নষ্ট হয়ে গেছে। এটাকে ফেলে সবাই কেটে পড়েছে। আমরা ঝড়-বন্যা কবলিত এলাকার মানুষ। দায়সারাভাবে যে প্লান্ট বানানো হয়েছে তা সামান্য ঝড়েই উড়ে যাবে। এসব প্লান্ট সরকারি অর্থ লুট ছাড়া আর কিছুই নয়।

নারকেলতলা আবাসন এলাকার ফজিলা বেগম বলেন, এখানে দুটি প্লান্ট। একটায় একফোঁটা পানিও আসেনি। আরেকটায় সারাদিনে এক লিটারও পাওয়া যায় না। জানতে চেয়েছিলাম পানি কম আসছে কেন? তারা বলেছিল, এখন শীতকাল। গরমকাল এলে পানি পাবেন। এখন তো প্রচণ্ড গরম। তবু পানি নেই।

একই এলাকার আব্দুল খালেক বলেন, এই আশ্রয়ন প্রকল্পে এতোগুলো লোকের জন্য মাত্র দুটি প্লান্ট। আর সেগুলোই কিনা নষ্ট।

পানি বিশুদ্ধকরণ ইউনিটগুলো অচল হয়ে পড়ার কথা স্বীকার করলেও এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি মোংলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপজেলা প্রকৌশলী, উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ও জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের সচিব (উপ-সচিব) শুভাশীষ সাহা জানান, করোনার কারণে প্রকল্পের কাজ শুরু হতে কিছুটা দেরি হয়েছে। তিনি দুবার প্রকল্প পরিদর্শন করেছেন। পদাধিকার বলে প্রকল্প পরিচালক হয়েছেন দাবি করে তিনি বলেন, মূলত উপ-প্রকল্প পরিচালকই ভালো জানেন।

উপ-প্রকল্প পরিচালক ও জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের সহকারী পরিচালক (অভিযোজন) মো. ইসকান্দার হোসেন বলেন, কিছু অভিযোগ পেয়েছি। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। মেয়াদ বাড়লে সমস্যার সমাধান হবে।

এ বিষয়ে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মাসুদ আহম্মদ বলেন, আমাদের আট শতাধিক প্রকল্প চলছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকই বিষয়টি দেখভাল করেন।

Comments
Loading...