খেলাপি ঋণসহ ১০ তথ্য চেয়েছে আইএমএফ

প্রতিনিধিদল ১০ দিনের সফরে ঢাকায় আসছে আজ * অর্থ মন্ত্রণালয়, এফআইডি, এনবিআর বাংলাদেশ ব্যাংক ও এফবিসিসিআইর সঙ্গে বৈঠক করবে

0

কোভিড-১৯ পরবর্তী খেলাপি ঋণ ও ঋণ অবলোপনসহ রাষ্ট্রায়ত্ত সব ব্যাংকের ১০ ধরনের তথ্য জানতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড বা আইএমএফ)। অন্য তথ্যগুলো হচ্ছে-সম্পদের ঝুঁকি, মূলধন ঘাটতি, পরিচালনা বোর্ড, আইনি সংস্কার ও বিশেষ নিরীক্ষা অগ্রগতি। এছাড়া আছে ব্যাংকের পারফরম্যান্স চুক্তি, অন্যান্য ব্যাংকের সংস্কার, অ্যাসেস ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠন প্রক্রিয়ার সর্বশেষ অবস্থা।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এসএম সলিম-উল্লাহকে এসব তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে আইএমএফের বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি জয়েন্দু দে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আজ ১০ দিনের সফরে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসছে। আইএমএফের ইনস্টিটিউট ফর ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্টের পরিচালকের সহকারী রাহুল আনন্দের নেতৃত্বাধীন এ দলটি ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করবেন। এ সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি), অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্তকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গেও বৈঠক করবেন তারা। এরমধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে দেশের ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক হবে। ওই বৈঠককে সামনে রেখে উল্লিখিত ব্যাংকিং খাতের তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে আইএমএফ থেকে। জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে জানান. আর্টিক্যাল ফোর এর আওতায় আইএমএফ দেশের অর্থনীতি খাতে কিছু সংস্কারের বিষয় জানতে চায়। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, ঋণ অবলোপন ও বোর্ড পরিচালনার অবস্থা সম্পর্কে সবই বলা হচ্ছে। কোনো কিছু বাদ যাচ্ছে না। তারা এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে কিছু সংস্কারের প্রস্তাবও দিয়ে থাকে। এতে এক ধরনের পেশার সৃষ্টি হয়। ফলে তাদের শর্ত বা চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে কিছু সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন হয়।

দেশের খেলাপি ঋণের হিসাব নিয়ে দ্বিমত রয়েছে আইএমএফের। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে ১ লাখ ১৬৮ কোটি টাকায় উঠেছে। এরমধ্যে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ছয় ব্যাংকে ৪৪ হাজার ১৬ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০১৯ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে একটি রিপোর্টে বলেছিল, এ দেশে খেলাপি ঋণ আড়াল করে রাখা আছে। এখানে খেলাপি ঋণের যে তথ্য প্রকাশ করা হয়, প্রকৃত খেলাপি ঋণ তার তুলনায় অনেক বেশি। আইএমএফের মতো, বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের অঙ্ক হবে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। এ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি উঠে আসবে।

যেসব আইন খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি উন্নয়নে কাজ করবে, সেগুলোর সংশোধনের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাওয়া হয়েছে আইএমএফের চিঠিতে। সূত্র জানায়, এরই মধ্যে ৫টি সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনা ও পরিমার্জন করে খসড়া বিল আকারে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে এ সংক্রান্ত সুপারিশ কমিটি। আইনগুলো হচ্ছে-ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১, অর্থঋণ আদালত আইন-২০০৩, প্রস্তাবিত ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন-২০২১, নেগোশিয়েবল ইন্সট্র–মেন্ট অ্যাক্ট-১৮৮১ ও দেউলিয়া বিষয়ক আইন-১৯৯৭। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নরের নেতৃত্ব ১০ সদস্যের একটি সুপারিশ কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি আইনগুলো সংশোধন করে খসড়া বিল আকারে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

আইএমএফ ব্যাংকিং খাতে ঋণের অবলোপনের পরিসংখ্যান, কিভাবে বর্তমান খেলাপি ঋণ অবলোপন করা হয় এবং আগামীতে এ পদ্ধতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে কিনা-তাও জানাতে বলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, ব্যাংকিং খাতে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত ঋণ অবলোপন করা হয়েছে ৪৩ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা। এরমধ্যে ৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিমাণ হচ্ছে ১৭ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা।

সংস্থাটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বা বোর্ড পরিচালনার অভিজ্ঞতা, সমস্যা ও সমাধান নিয়েও আলোচনা করবে। কারণ ইতঃপূর্বে সরকারি ব্যাংকগুলোর বোর্ড এমন কয়েকজনকে বসানো হয়েছে, যাদের ব্যাংকিং খাতের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। রাজনৈতিক পরিচয়ে তাদের সেখানে বসানো হয়। এর বড় উদাহরণ বেসিক ব্যাংক। এ জন্য ব্যাংকের বোর্ড নিয়েও তারা জানতে চেয়েছে। সূত্র জানা গেছে, খেলাপি ও ননপারফরমিং ঋণ আদায়ে অ্যাসেস ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের জন্য ‘বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন-২০২০’ এর খসড়া প্রণয়ন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। খসড়া চূড়ান্ত করতে মত চাওয়া হয়েছে স্টেক হোল্ডারদের কাছে। খসড়াতে বলা হয়েছে এ কোম্পানি নিজস্ব ক্ষমতা বলে খেলাপি প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি লিজ গ্রহণ ও বিক্রি করে অর্থ আদায় করতে পারবে। পাশাপাশি খেলাপির রুগ্ণ ব্যবসা দক্ষভাবে পরিচালনার জন্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেবে। প্রয়োজনে অর্থ আদায়ের জন্য দখলে নিতে পারবে ঋণের বিপরীতে দেওয়া জামানতের সম্পত্তি। এছাড়া ক্রয়কৃত ঋণের গুণগতমান বিবেচনায় নিয়ে তা পুরোপুরি বা আংশিক শেয়ারে রূপান্তরের ক্ষমতা থাকবে এ কোম্পানির।

কোম্পানি হবে শতভাগ সরকারি, বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত মূলধন হবে ৫ হাজার কোটি টাকা। প্রতিটি ১০ টাকা মূল্যের ৫০০ কোটি সাধারণ শেয়ারে ভাগ করা হবে। আর পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ হবে ৩ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থ সরকার থেকে বরাদ্দ দেওয়া হবে। কিন্তু এখনো গঠন হয়নি। এটি নিয়েও কথা বলবে সংস্থাটি।

jugantor

Comments
Loading...