গোলাম আহমদ কাদিয়ানি থেকে ওয়াসিম রিজভী : ভারতে ইসলামবিদ্বেষী ষড়যন্ত্র

0 ১০০

বিশ্বে ইসলাম ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি। দ্রæত বর্ধনশীল জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সামগ্রিকভাবে মুসলমানরা অগ্রগন্য। ইউরোপের শহরগুলোতে ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনসংখ্যা এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মুসলমানদের সম্পৃক্ততা এবং নেতৃত্বে চলে আসার যে প্রবণতা দেখা দিয়েছে, তাতে পশ্চিমা রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আগামী কয়েক দশকের মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুসলিম নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করবে বলে ভবিষ্যদ্বানী করেছেন। জার্মানির এঙ্গেলা মার্কেল বা নিউজিল্যান্ডের জেসিন্ডা অর্ডেনের মত জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী নেতারা ইউরোপে আগামীতে মুসলিম নেতৃত্বের প্রশ্নে জনগণকে ইসলামের সাথে অভিযোজনের পরামর্শ দিয়েছেন। বিশ্বের সাড়ে সাতশ’ কোটি মানুষের মধ্যে ৯০ ভাগের বেশি মানুষ খৃষ্টান, মুসলমান, বৌদ্ধ ও হিন্দু এই চারটি ধর্মবিশ্বাসকে ধারণ করেন। হিন্দু ছাড়া বাকি তিনটি ধর্মের অনুসারিরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে দেশে দেশে নিজেদের ধর্মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে সক্ষম হলেও বিশ্বের একমাত্র বৃহৎ হিন্দু প্রধান রাষ্ট্র ভারত স্বাধীন হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিশ্রæতিকে সামনে রেখে। এ কারণে হিন্দু-মুসলমান দ্বিজাতিত্বত্তে¦র ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হলেও ভারতে অবস্থানরত মুসলমানদের সংখ্যা পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মুসলমান জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। ওআইসিভুক্ত অর্ধশতাধিক মুসলমান জনসংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের যেকোনো দেশের চেয়ে ভারতে মুসলমানের সংখ্যা বেশি। ভারতের জনগণের শর্তবর্ষব্যাপী বৃটিশ উপনিবেশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের সংগ্রাম, ত্যাগ ও রক্তদানের ইতিহাস হিন্দুদের চেয়ে কম নয়। ইন্ডিয়া গেটে যেসব স্বাধীনতা সংগ্রামী শহীদের নাম লেখা আছে সেখানে হিন্দুর চেয়ে মুসলমানের সংখ্যাই বেশি। আর ভারতের উন্নয়ন-অগ্রগতি এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রশক্তি হয়ে ওঠার পেছনে মুসলমানদের অবদান হিন্দুদের চেয়ে কম নয়। ভারতের শিল্পবিপ্লব, বিজ্ঞান গবেষণা, পারমানবিক অস্ত্র প্রকল্প, চলচ্চিত্র, শিল্প-সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলায় মুসলমানদের অবদান খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। মূলত: মুসলমান শাসকরা বহুধাবিভক্ত ভারতীয় সমাজকে ধীরে ধীরে জয় করে দিল্লী ও মুঘল সালতানাতের অধীনে একটি একক বৃহত্তর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনে ভারতবর্ষ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভারতের ইতিহাস সচেতন লিবারেল নাগরিকদের কাউকে কাউকে স¤্রাট আকবরকে ভারতের জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পক্ষে মত দিতে দেখা গেছে। ভারতীয় সুপ্রীমকোর্টের সাবেক বিচারপতি মার্কেন্ডে কাটজু এ বিষয়ে প্রকাশ্য নিজের মতামত তুলে ধরেছেন। ভারতের হিন্দু-মুসলমানদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ইতিহাস হাজার বছরের। মুসলমান শাসনের সময়ে ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা খুবই বিরল। বৃটিশ ও ইউরোপীয়দের আগমনের পর দিল্লীর মসনদ দখল করে সেখানে বৃটিশ উপনিবেশ স্থাপনের সুগভীর চক্রান্তমূলক নীলনকশার অধীনে হিন্দু-মুসলমান বৈরিতা, অনাস্থা-অবিশ্বাস ও বৈষম্যের সূত্রপাত হয়।

দেশভাগের আগে ১৯৪৬ সালে কলিকাতা শহরে ভয়াবহ, রক্তাক্ত হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা দ্বিজাতিতত্ত¡ এবং দ্বিরাষ্ট্রকেন্দ্রিক সমাধানের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছিল। ভারতীয় সমাজে হিন্দু মুসলমানের এই ঘৃণা ও বৈরিতা মূলত বৃটিশদের ডিভাইড অ্যান্ড কনকোয়্যার নীতির লক্ষ্য অর্জনের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছিল। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি মুসলমানদের কাছ থেকে ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। এটা তারা কখনো ভুলে যায়নি, আর ভারতের মুসলমানরা শত বছরেও ইংরেজের বশ্যতা স্বীকার করেনি। এ কারণে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে মুসলমানরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, মাত্র দেড় শতাব্দীর মধ্যে মুসলমানরা সবদিক থেকে ভারতের সমৃদ্ধ ও অগ্রসর জাতি থেকে অনগ্রসর-পিছিয়ে পড়া জাতিতে পরিনত হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও জমিদারি প্রথা চালু করে জমির মালিকানা মূলত হিন্দু জমিদারদের উপর ছেড়ে দিয়ে হিন্দুদের সাথে মুসলমানদের অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়িয়ে তোলা হয়েছিল। সেই সাথে ভারতে মুসলমানদের ধর্মীয় চেতনা ও জাতিগত ঐক্য বিনষ্টের চক্রান্ত থেকে বৃটিশরা কখনো বিরত হয়নি। ভারতে আহমদিয়া মুসলিম জামাত প্রতিষ্ঠা মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাসকে বিভক্ত করার পেছনে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির পরোক্ষ মদতের অভিযোগ উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। কাদিয়ানি ধর্মমতের প্রচারক মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানের বাবা মির্জা গোলাম মর্তুজা ছিলেন একজন বৃটিশ রাজ কর্মচারি। গোলাম আহমদ কাদিয়ানি প্রথমে খৃষ্টান মিশনারিদের সাথে ইসলামের পক্ষে ডিবেট করে সুখ্যাতি লাভ করার পর ইসলামের মৌলিক কিছু বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিশেষত জিহাদে উদ্বুদ্ধকরণ বিষয়ক আয়াতগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার মধ্য দিয়ে তিনি স্পষ্টতই মুসলমানদের বৃটিশবিরোধী জিহাদি চেতনার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। উনবিংশ শতকের শেষদিকে যখন ভারতে বৃটিশবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনি গোলাম আহমদ কাদিয়ানি ভারতের মুসলমানদের নতুন ফিতনা উস্কে দেন। আগামী বিশ্বে মুসলমানদের নেতৃত্বে ফিরে আসার সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করতে একদিকে ভারতের মুসলমানদের ভেতর থেকে বিভক্ত করা, অন্যদিকে অটোমান সা¤্রাজ্যের বিভক্তি ও পতন নিশ্চিত করতে নানামুখী ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারের অপতৎপরতা অব্যাহত থাকে। ভারতে আহমাদিয়া জামায়াত, আরব পেনিনসুলায় আরব জাতীয়তাবাদ উস্কে দেয়া, সুদানের সুন্নী ধর্মবেত্তা মোহাম্মদ আহমদ ১৮৮১ সালে নিজেকে প্রথম ইমাম মাহদি বলে দাবি করে মিশরে উসমানীয় খেলাফতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিশাল বিজয় অর্জন করেছিলেন। এভাবেই প্রথম মহাযুদ্ধের আগেই ফিতনা ও বিভেদ-বিভক্তি উস্কে দিয়ে উসমানীয় খেলাফতের পতনের বীজ বপন করা হয়েছিল। ইসরাইল নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগেই তৎকালীণ বৃটিশ ম্যান্ডেট ফিলিস্তিনের হাইফায় কাদিয়ানিদের মূল হেডকোয়ার্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। হাইফার মাউন্ট কারমেলে অবস্থিত মাত্র কয়েক হাজার কাদিয়ানি ও ইহুদি অধ্যুষিত সেই স্থানটির নাম মক্কার কাবা শরীফের অনুকরণে কাবাবির রাখা হয়েছিল।

রামায়নে বর্ণিত রাম-রাবনের যুদ্ধে রাবণের ছোটভাই বিভীষণ ভাইয়ের বা বংশের পক্ষ ত্যাগ করে শত্রু রামের পক্ষে কাজ করেছিল। বিভীষণের শত্রæতার কারণে রাবণের পরাজয় নিশ্চিত হয়েছিল। এমনটাই ধারণা করা হয়। এ কারণে পৌরাণিক চরিত্র বিভীষণ ঘরের শত্রæর প্রতীক হয়ে আছে। ঘরের মানুষ বা মিত্রের ভান করে কোনো পক্ষে শক্তি ও দুর্বলতার বিষয়গুলো যতটা জানা যায় বাইরের মানুষের পক্ষে তা সম্ভব নয়। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে নবাব সিরাজদৌলার প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। সাম্প্রতিক বিশ্বের ইতিহাসে টি.ই লরেন্স নামের একজন বৃটিশ সেনা কমান্ডার প্রথম মহাযুদ্ধের সময় আরব পোশাক পরে, আরবী ভাষা ও কৃষ্টি-কালচার অনুসরণ করে বিভিন্ন আরব গোত্রের সাথে মিশে উসমানীয় খেলাফতের বিরুদ্ধে বিরোধ ও বিদ্বেষ উস্কে দিয়ে কিভাবে হেজাজ রেলপথে হামলা চালিয়ে শত শত তুর্কি সেনা হত্যা করে বিশাল আরব ভূখন্ডের উপর বৃটিশ আধিপত্য কায়েমের ভিত্তি রচনা করেছিল, ইতিহাস সচেতন মানুষ তা ভুলে যেতে পারে না। মীর জাফর আলী, ঘসেটি বেগমদের বাইওলজিক্যাল বংশধররা যেখানেই থাকুক, তাদের মনস্তাত্তি্ক উত্তরসুরীরা সব সময়ই সক্রিয় রয়েছে। পশ্চিমা ও আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের জিহাদী চেতনা অনেক বেশি আপসহীন ও শক্তিশালী হওয়ায় মুসলমানদের সেই কোরানিক শিক্ষা ও চেতনার বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক শাসক ও জায়নবাদী ষড়যন্ত্রকারিদের গোপণ পরিকল্পনা আগে যেমন সক্রিয় ছিল, এখনো তা একইভাবে সক্রিয় রয়েছে। তবে জিহাদের অপব্যাখ্যা করে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর ফিতনা ও হানাহানির অপতৎপরতা ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য আরো বেশি ক্ষতি ডেকে এনেছে। জিহাদের একটি সরল অর্থ হচ্ছে, অন্যায়ের সাথে আপস না করা। উপমহাদেশে ও বিশ্ব রাজনীতির বিশেষ বিশেষ সময়ে কোরআনে নির্দেশিত জেহাদের শিক্ষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের চিহ্ন ও কণ্ঠ উচ্চকিত হতে দেখা যায়। কোরআনে জিহাদের বাণী আজ হঠাৎ করে আবির্ভূত হয়নি। চৌদ্দশ বছর আগে কোরআন নাজিল হওয়ার পর থেকে সহমর্মিতা, উদারতা, আত্মত্যাগ ও সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করেছে আল কোরআন। গোলাম আহমদ কাদিয়ানি থেকে শুরু করে আইএস সন্ত্রাসী গ্রæপের স্বঘোষিত খলিফা আবু বকর বাগাদাদি এবং এখনকার ভারতের সৈয়দ ওয়াসিম রিজভির তৎপরতা সম্ভবত একই সুত্রে গাঁথা। ভারতের মুসলমান ও হিন্দুরা এ পাতা ফাঁদে পা দেবে বলে মনে হয়না।

বিংশ শতকের শুরুর দিকে গোলাম আহমদ কাদিয়ানি কোরআনের যেসব আয়াতে জিহাদের নির্দেশনা আছে সেসব আয়াত নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। ইতিমধ্যে বিশ্ব রাজনীতিতে বহু পরিবর্তন ঘটে গেলেও ঔপনিবেশিকতার স্থলে সাম্প্রাজ্যবাদ সেই সাথে জায়নবাদ-হিন্দুত্ববাদের সাথে সত্যিকার ধর্ম ও মানবিকতার লড়াইও আরো জটিল রূপ ধারণ করেছে। ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী কোনো মানুষ রিভিল্ড নলেজ বা আসমানি কিতাব হিসেবে কোরআনের নির্ভুলতা ও বিশুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন না। গত দেড় হাজার বছর ধরে ইসলাম বিদ্বেষী শক্তি এ নিয়ে না প্রশ্ন ও বিতর্ক সৃষ্টি করে কখনো সুবিধা করতে পারেনি। তবে এসব ফিতনা মুসলমানদের ঐক্য, স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রক্রিয়া ও অগ্রযাত্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দেশে দেশে যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মহামনিষীরা কোরআনের ঐশী বাণী সম্পর্কে নিজেদের সাক্ষ্য রেখে গেছেন। অর্ধ শিক্ষিত সৈয়দ ওয়াসিম রিজভি কিভাবে শিয়া ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন, কিভাবে তিনি এত টাকা-পয়সার মালিক হলেন? কাশ্মিরের স্বাধীনতা সংগ্রাম, বাবরি মসজিদসহ বিভিন্ন মসজিদের উপর হিন্দুত্ববাদিদের কল্পিত দাবির প্রতি সমর্থন, ইসলাম, কোরআন ও ইসলামের পতাকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তার বিরূপ মন্তব্য এবং রাম জন্মভূমি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের পেছনে তার দুরভিসন্ধি এখন অনেকটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। সৈয়দ রিজভী কোরানের ২৬ আয়াত বাদ দিতে ভারতের সুপ্রীমকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছেন। এসব আয়াত ইসলামের প্রথম তিন খলিফা হজরত আবুবকর (রা.) হজরত ওমর ও হজরত ওসমান গণী (রা.) পরদেশ গ্রাস করার মানসে এসব আয়াত কোরআনে সন্নিবেশিত করেছেন বলে উদ্ভট অভিযোগ হাজির করেছেন। অথচ হজরত জিবরাইল (আ.) এর মাধ্যমে ওহি আকারে কোরআন নাজিল হওয়ার পর থেকে তা মুখস্ত করা এবং পরবর্তিতে গ্রন্থিত হওয়া থেকে অদ্যাবধি এর একটি হরফও পরিবর্তন হয়নি। কোরআনের বিশুদ্ধতা ও কেয়ামত পর্যন্ত নিরাপত্তার ঘোষণা আল্লাহ তায়ালা খোদ কোরআনেই বিভিন্ন আয়াতে দিয়েছেন। ওয়াসিম রিজভীর আগে যুগে যুগে বহু ইসলাম বিদ্বেষী গুপ্তচর, ভন্ড স্বঘোষিত মাহদি, নাস্তিক-মুরতাদ এমন সব উদ্ভট দাবি ও অভিযোগ তুলে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ওয়াসিম রিজভীও অচিরেই জনসমাজে ঘৃণিত ও প্রত্যাখ্যাত হবেন। তার এই ষড়যন্ত্রের শিকড় হয়তো বিশ্বরাজনীতির অনেক গভীরে প্রোথিত। এটা একদিকে যেমন ইসলামের বিরুদ্ধে, অন্যদিকে ভারতের স্থিতিশিলতা, সাম্প্রদায়িক সহাবস্থান ও অন্ডতার বিরুদ্ধেও সুদূরপ্রসারি ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে।

বিগত নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ শর্টফিল্ম ফোরামের আয়োজনে দ্বিবার্ষিক বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র উৎসবের কয়েকটি আসরে আমি একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে যুক্ত ছিলাম। আড়াই দশক আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবে ভারতের বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার আনন্দ পটবর্ধনের নির্মিত ‘রাম কা নাম’ ডকুমেন্টারি ফিল্মটি দেখেছিলাম। সেখানে আনন্দ পটবর্ধন দেখিয়েছেন, উগ্র হিন্দুত্ববাদিরা কিভাবে সমাজে ও রাজনীতিতে ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে ৬০০ বছরের পুরনো বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে সেখানে রামমন্দির নির্মানের জন্য মানুষকে সংগঠিত করছে। কিভাবে সারাদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ হাতে ত্রিশুল, তরবারি-অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে অযোধ্যায় শামিল হয়েছে। ছবির শুরুতেই বাবরি মসজিদ ও রামজন্মভূমি দাবির পটভূমি ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৫২৮ সালে বাবরি মসজিদের নির্মান শেষ হয়। এর ৫০ বছর পর তুলসি দাস রামচরিত মানস গ্রন্থটি লেখেন। হিন্দু ভগবান রামের জন্ম ও জন্মস্থান সম্পর্কে এই প্রথম ভারতের সাধারণ মানুষ জানতে পারল। ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত অযোধ্যায় অসংখ্য রামমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আর এসব মন্দিরের মধ্যে বেশকিছু স্থানকে রামের জন্মস্থান বলে দাবি করেছে। তবে বৃটিশ ঔপনিবেশিকরা হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ বাড়িয়ে ভারত শাসনকে সহজ ও দীর্ঘায়িত করতে বাবরি মসজিদের স্থানে রামের মন্দির ছিল বলে গুজব ছড়িয়ে দেয়। এভাবেই শুরু হয় বাবরি মসিজদ-রামমন্দির বিতর্ক। তুলসি দাসের রাম চরিত মানস থেকে শুরু করে পরবর্তি ৫০০ বছরেও বাবরি মসজিদ নিয়ে কোনো বিতর্ক দেখা দেয়নি। ভারত স্বাধীন হওয়ার ২ বছর পর ১৯৪৯ সালে প্রথম উগ্রবাদি হিন্দুরা বাবরি মসজিদে রামের বিগ্রহ স্থাপন করার পাশাপাশি আদালতের আশ্রয় নিয়ে সেখানে স্থিতাবস্থা জারি করে। এরপর চল্লিশ বছর ধরে বাবরি মসজিদ ও রামমন্দির নিয়ে হিন্দু-মুসলিম বিরোধের উস্কানি মুলত ভোটের রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে উগ্রবাদি হিন্দুরা। অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মান এবং দাঙ্গা সৃষ্টি করে মুসলমান গণহত্যার জন্য গুজরাটের তৎকালীন মূখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্রমোদি আমেরিকায় নিষিদ্ধ হয়েছিলেন।

অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ নির্মিত হওয়ার ৫০ বছর পর গোস্বামী তুলসিদাস রামচরিত মানস লিখেছিলেন, সেখানে রামমন্দিরের উপর মসজিদ নির্মানের ঘটনা ঘটে থাকলে তার বর্ণনা কোনো অধ্যায়ে বা ভূমিকায় অবশ্যই থাকতো। ভারতের হাজার বছরের ইতিহাসে কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনায়ও রামমন্দির ভেঙ্গে মসজিদ নির্মাণের কাহিনী নেই। রামের জন্ম এবং অস্তিত্বের বিতর্কও এখনো মিমাংসিত নয় কিছুদিন আগ পর্যন্ত বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্র হিসেবে নেপালের রাষ্ট্রধর্ম ছিল হিন্দুইজম। সেই নেপালের প্রধামন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি দাবি করেছেন, হিন্দু অবতার রামের জন্মস্থান নেপালে। আমাদের বিচার্য বিষয় হচ্ছে, ওয়াসিম রিজভী কেন মুসলিম ওয়াক্ফ বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়ে রামমন্দির ভেঙ্গে বাবরি মসজিদ নির্মানের হিন্দুত্ববাদিদের কাল্পনিক অভিযোগ, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন।

এই ছবিতে তিনি যতটা সম্ভব ইসলাম ও মুসলমানদের ইমান-আক্বিদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। তিনি মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে, তিন তালাক নিয়ে যে সব প্রশ্ন তুলেছেন তা মূর্খতাপূর্ণ ও অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত। বাবরি মসজিদ ডিমোলিশনের মামলার তদন্তে বলা হয়েছে, উগ্রবাদি হিন্দুদের নিবৃত্ত করতে সময়মত প্রশাসন কোনো চেষ্টাই করেনি, পুলিশ নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। লাখ লাখ উগ্রবাদী হিন্দুর উন্মত্ত তৎপরতার ছবি আনন্দ পটবর্ধন রাম কা নাম ছবিতে তুলে ধরেছেন। আর ওয়াসিম রিজভী তার ছবির শুরুতেই দেখিয়েছেন, নিরপরাধ হিন্দুদের পুলিশ গুলি করে মারছে, রাম মন্দির নির্মানের জন্য চাঁদা তুলতে আসা হিন্দু স্বেচ্ছাসেবকদের মুসলমান গুন্ডারা কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করছে। এসব ঘটনা ও বক্তব্যের সাথে সত্য ও বাস্তবের কোনো মিলই খুঁজে পাওয়া যায়না। মুসলমানদের হেয় করতে যেভাবে খুশি তিনি তথ্য ও চিত্র উপস্থাপন করেছেন। যে দেশে গরুর গোশত ফ্রিজে রাখা বা খাওয়ার অপরাধে মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। সেখানে হিন্দুত্ববাদিদের অতি দয়ালু আর মুসলমানদের হিং¯্র-নির্মম প্রমানের চেষ্টা করেছেন ওয়াসিম রিজভী। ছবির প্রযোজক ও অভিনেতা হিসেবে ওয়াসিম রিজভী মূলত ইসলাম বিদ্বেষীদের ভাড়াটিয়া এজেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন। কোরআনের আয়াত পরিবর্তনের রিট করার পর বিজেপি’র মুসলমান সমর্থিত মঞ্চের পক্ষ থেকে ওয়াসিম রিজভীর গ্রেফতার দাবি করা হয়েছে। ভারতের কোনো সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন মুসলমান বা হিন্দু ওয়াসিম রিজভীর কোনো বক্তব্যই সমর্থন করতে পারেন না। তবে ওয়াসিম রিজভী আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে মুসলমান নামের কিছু সুবিধাভোগী মানুষ ইসলাম বিদ্বেষি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এদের সম্পর্কে সকলকে সাবধান ও সচেতন থাকতে হবে।

উৎসঃ   ইনকিলাব
Comments
Loading...