লকডাউনে রোজগারহীন পরিবহন শ্রমিকরা

দিন কাটছে অভাব-অনটনে

0 ৭০

বাসের চাকা ঘুরলে যাদের সংসারে দৈনন্দিন বাজার হয় তারাই হচ্ছেন পরিবহন শ্রমিক। এর মধ্যে রয়েছেন বাসের হেলপার, কন্ডাক্টর ও ড্রাইভার। আনুমানিক হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ।

গত ৫ এপ্রিল থেকে সারাদেশে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় আয় নেই তাদের। হেলপাররা সাময়িক অন্য পেশায় যেতে পারলেও উপায় নেই কন্ডাক্টর ও চালকদের। ফলে জীবন কাটছে অনাহার ও অর্ধাহারে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশেও আজ পালিত হচ্ছে শ্রম অধিকারের বার্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস।

এই দুঃসময়ে তারা পাশে পাচ্ছে না পরিবহন মালিক ও সরকারকে। নামকাওয়াস্তে ত্রাণ আকারে কিছু খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছে পরিবহন মালিকপক্ষ। কিন্তু শ্রমিকরা বলছেন, তা ১০ দিনও চলার মতো নয়। বাকি ২০ দিন কি করব?। এখন সুদে অর্থ ধার, অনুদান ও অর্ধাহারে দিন কাটছে তাদের।

সামনে ঈদ আসছে। এখন তিন বেলা কোনোমতে খেতে পারাটাও কষ্টের। সেখানে ঈদের খরচের কথা ভাবতেও ভয় পাচ্ছেন তারা। অথচ শ্রমিকদের নামে সড়ক থেকে বছরে তোলা হচ্ছে হাজার কোটি টাকার বেশি চাঁদা।

জানা গেছে, কভিডের সংক্রমণের হার উচ্চগতিতে বৃদ্ধি পাওযায় গত ৫ এপ্রিল থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এতে জরুরি ছাড়া সব সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ করা হয়। বন্ধ করা হয় সব ধরনের গণপরিবহন। মাঝে সিটি পর্যায়ে পরিবহন চলাচল করতে পারলেও তাও বন্ধ করে দেয়া হয় ১৪ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয় দফা ছুটি কার্যকরের মাধ্যমে।

এর ফলে আয় বন্ধ হয়ে যায় এ খাতের সঙ্গে জড়িত সারাদেশের ৭০ লাখ মানুষ। পরিবহন বন্ধ থাকায় বেচাকেনা নেই মোটর পার্টস ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পণ্যের। যদিও দুইবারই দোকানপাট খেলার অনুমতি দেয়া হয়।

এদিকে পরিবহন শ্রমিকদের কোনো ডেটাবেজ নেই। সরকার বা পরিবহন মালিক বা শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো ডেটাবেজ তৈরি হয়নি এখনও। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের সংখ্যাও সুষ্ঠুভাবে কেউ বলতে পারছে না।

এ বিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, একটি নির্দিষ্ট তথ্যভাণ্ডার থাকলে এ খাতের শ্রমিকদের উন্নয়নে কাজ করতে সহায়ক হতো।

যদিও শ্রমিকদের এই দুঃসময়ে পাশে থাকার কথা বলেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. এনায়েত উল্যাহ। তিনি বলেন, ‘শ্রমিক কল্যাণ তহবিল ও আমাদের উদ্যোগে শ্রমিকদের খাদ্যপণ্য দেয়া হচ্ছে। ১০ কেজি করে চাল, তেল, লবণ, পেঁয়াজ, চিনি ও আলু দেয়া হচ্ছে।

এ পর্যন্ত ১০ হাজার শ্রমিককে আমরা এ সহযোগিতা করছি। সারাদেশের জেলা পর্যায়েও এ কার্যক্রম চলছে। এর চেয়ে বেশি কীভাবে সম্ভব। চেষ্টা করছি তাদের চালিয়ে নিতে।’ তবে একজন শ্রমিক কয়বার এই সহযোগিতা পাবেন, এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি তিনি।

এদিকে সায়েদাবাদ ও মহাখালী এলাকার পরিবহন শ্রমিকরা জানিয়েছেন, চার-পাঁচজনের সংসারে ১০ কজি চাল কয়দিন চলে? চাল কোনো রকম হলো কিন্তু কাঁচাবাজার তথা সবজি কিনব কী দিয়ে। মালিকপক্ষ থেকে টার্মিনাল এলাকায় কিছু ত্রাণ দেয়া হচ্ছে মাঝে মাঝে। কিন্তু তা পাচ্ছে তাদের সমর্থকরা। নিয়মিত দিলে সবাই পেতেন একবার হলেও।

চিটাগং রোড-গুলিস্তান রুটে চলাচলকারী বাসের হেলপার রুস্তম আলী জানান, ‘বাস বন্ধ তো, তাই অটোরিকশা নিয়া নামছি। তাও পুলিশ চালাইতে দেয় না। সন্ধ্যার দিকে বড় রাস্তায় নামি। তহন পুলিশ কিছু কয় না। দিনের বেলা গলির মধ্যেই চালাই।’

বাসচালক মো. নজরুল হোসেন বলেন, ‘কিছু টাকা জমানো ছিল। এখন তা নেই। গ্রামে স্ত্রীর নামে এনজিও থেকে সুদে টাকা আনছি। তা দিয়ে চলতাছি। সেই টাকাও শেষ। গতবার যে টাকা আনছিলাম তাও এখন শোধ দিতে পারিনি। আবার নতুন করে আনলাম অন্য সমিতি থেকে। এখন পর্যন্ত ২৫ হাজার টাকার দেনা হয়েছে। এভাবে আর কয়দিন চলব জানি না। ওস্তাদ (ড্রাইভার) মানুষ আমি। আর তো কোনো কাজ জানি না।’

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে গাড়ি পাহারা দেন কন্ডাক্টর হোসেন সরকার। তিনি বলেন, ‘মালিক বলছেন, বাস পাহাড়া দিতে। দিনে ১০০ টাকার মতো দেয়। কখনও দু’দিনে মিলিয়ে ১৫০ টাকা দেয়। কি আর করুম। লকডউন না উঠলে বাস চলব না। এই কয়দিন কষ্ট করে আছি।

ওস্তাদও (বাসচালক) আছেন। তিনি আর আমি মিইল্যা সব বাস দেহি। অন্য পরিবহনের লোকও আছে। এহন অবসর কাটে মোবাইলে দলবেঁধে লুডু খেলে। আমার মতো অনেক কন্ডাক্টর এহন ইফতারি বেচতাছে।’

কথা হয় জামাল উদ্দিনের সঙ্গেও। তিনি বলেন, ‘অনেকেই গ্রামে গেছেন। আমি যাইনি। গ্রামে যাইয়া কি করুম। এহন কিছু গাড়ি বসা। কিছু মালিক টুকটাক মেরামত করতাছে। আমি ইলেকট্রিকের কাজ জানি। কিন্তু এহন সেই কাজ করতাছে না। তা মিস্ত্রির লগে হেল্পারগিরি করি।’

পরিবহন ও সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে মোট সাতটি ফেডারেশনের মাধ্যমে শ্রমিকরা সংগঠিত রয়েছেন। এসব ফেডারেশনের মধ্যে মাত্র দুটি কার্যকর রয়েছে। বাকিগুলো নামকাওয়াস্তে চলছে। বিভিন্ন ইউনিয়ন কমিটির মাধ্যমে এ ফেডারেশনগুলো চলে।

জানা গেছে, একটি ফেডারেশনের মাধ্যমে সারাদেশে ১৮৬ ইউনিয়ন কাজ করে। আড়াই লাখ বাস চলাচল করে পুরো দেশে। এসব পরিবহনে প্রায় ৭০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। শ্রমিক সংগঠনের অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ইউনিয়নকে কেন্দ্রের কাছে প্রতি মাসে দিতে হয় পাঁচ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা। আর এই চাঁদা তোলা হয় শ্রমিক ও বাস চলাচলের সময়। আর পরিবহন শ্রমিকরা চাঁদার টাকা উঠান যাত্রীদের ভাড়া বাড়িয়ে।

শ্রমিকদের দুঃখ-দুর্দশার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, সবকিছুই খুলে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু মধ্যবিত্ত ও নিম্ন বিত্তের বাহন ছাড়া সব গাড়িই চলছে। অবিলম্বে সরকারের উচিত বাস খুলে দেয়া। আমরা শ্রমিকরা কষ্টে আছি। আমদের ত্রাণ দেয়া প্রয়োজন। কতদিন এভাবে চলবে।

Comments
Loading...