সিলেটে মধ্যরাতের অভিযান, বেরিয়ে আসে সৌরভ হত্যা রহস্য

0 ১৩৪

সিলেটে উবার চালক সৌরভকে ভাড়ায় নিয়েছিলো ছিনতাইকারীরা। এরপর তাকে নিয়ে যায় শহরতলীর হাজীগঞ্জের মোহাম্মদপুরে। সেখানে তারা রাইডার সৌরভকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতকরে লাশ ডোবায় চুবিয়ে রেখে মোটরসাইকেল সহ সর্বস্ব নিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর ছিনতাইকারীদের একজন সৌরভ গুরুতর আহত দাবি করে তার স্বজনদের কাছেও টাকা চেয়েছিলো। আলোচিত এ ঘটনার ৩ দিনের মাথায় সৌরভের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধারের পাশাপাশি খুনের ঘটনায় জড়িত ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। উদ্ধার করেছে ছিনতাই হওয়া মোটরসাইকেলও। পুলিশ জানায়, ছিনতাইয়ের জন্যই ওই চারজন মিলে সৌরভকে খুন করে পালিয়ে যায়। আর লাশ গুম করতে তারা ডোবায় ডুবিয়ে রেখেছিলো।

এর আগেও তারা একই ভাবে আরো এক রাইডারের ওপর হামলা চালিয়ে মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেয়। তারা চারজনের একটি চক্র। মোটরবাইক রাইডারকে টার্গেট করে তারা খুন করে সাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। এবারের ঘটনাটি মর্মান্তিক। সিলেটের মোটরবাইক রাইডার রেদওয়ান রশীদ চৌধুরী সৌরভ। বাসা সিলেট নগরীর সুবহানীঘাট এলাকায়। তিনি উবারের মোটরবাইক চালক ছিলেন। স্বজনরা জানিয়েছেন, পেশা হিসেবে উবারের মোটরসাইকেল চালাতেন সৌরভ। প্রতিদিনের মতো তিনি গত মঙ্গলবার সকালে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়ে যান। দিনে কয়েক বার স্বজনদের সঙ্গে  মোবাইল ফোনে তার কথা হয়েছে। কিন্তু ওই দিন সন্ধ্যা থেকে সৌরভের মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিলো না। এ সময় স্বজনরা তাকে সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজাখুঁজি করেন। বুধবার ও বৃহস্পতিবার দিনভর তারা খোঁজাখুঁজি করেও সৌরভের সন্ধান পাননি। অবশেষে তারা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর নগরীর সুবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ি পুলিশকে বিষয়টি জানান। পুলিশের পরামর্শ মতো পরিবারের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়। এদিকে স্বজনরা সুবহানীঘাট ফাঁড়িতে অবস্থানের সময় তার দুলাভাইয়ের মোবাইল ফোনে একটি ফোন আসে। ওই ফোনের অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়- সৌরভ চৌধুরী দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন। তার রক্তের প্রয়োজন। এ জন্য দুলাভাইয়ের কাছে বিকাশে টাকার কথা বলেন।

তাৎক্ষণিক স্বজনরা ওই ফোনের বিষয়টিও পুলিশকে অবগত করেন। পুলিশ উবার চালক সৌরভের মোবাইল ফোন ও দুলাভাইয়ের ফোনে আসা ফোনের অবস্থান নিশ্চিত করতে  ফোন ট্র্যাকিং করেন। ট্র্যাকিংয়ে দেখা যায়- সৌরভের ফোনটি মোগলাবাজার থানার হাজীগঞ্জের মোহাম্মদপুর এলাকার লোকেশনে রয়েছে। আর যে নাম্বার থেকে দুলাভাইয়ের ফোনে ফোন করা হয়েছে সেটির অবস্থানও পার্শ্ববর্তী হাজীগঞ্জ এলাকায়। পুলিশ সৌরভের মোবাইল ট্র্যাকিং করে মধ্যরাতে সেখানে পৌঁছে। তারা ওই এলাকায় গিয়ে সৌরভের ব্যবহৃত হেলমেটের খোঁজ পায়। এ সময় তারা আশপাশ এলাকায় সৌরভের খোঁজে তল্লাশি চালায়। এক পর্যায়ে মোহাম্মদপুরের একটি ডোবায় সৌরভের অর্ধগলিত লাশ দেখতে পায়। মোগলাবাজার থানা পুলিশ জানায়, সৌরভকে তারা মঙ্গলবারই খুন করে লাশ গুম করতে ডোবায় ফেলে যায়। এ কারণে লাশের শরীরে পচন ধরে। তবে- লাশ দেখে স্বজনরা চিহ্নিত করতে পেরেছেন। সৌরভের মাথায় কয়েকটি ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানেও ছিল আঘাতের চিহ্ন। লাশ দেখে ধারণা করা হচ্ছিলো- কয়েকজন মিলে সৌরভকে খুন করেছে। তবে- কারা, কেন এবং কী কারণে সৌরভকে খুন করলো সে ব্যাপারে তাৎক্ষণিক নিশ্চিত হতে পারেননি। মোগলাবাজার থানা পুলিশ লাশ উদ্ধারের পরপরই বিষয়টি অনুসন্ধানে নামে। খুনের ঘটনার দিন মঙ্গলবারের মোবাইল ট্র্যাকিং করে পুলিশ। মোবাইল ট্র্যাকিংয়ে পুলিশ প্রথমে আব্দুল্লাহ আল মামুন ও এনাম আহমদ নামের দুই যুবকের সন্ধান পায়। সর্বশেষ ওই মোবাইল নাম্বারের সঙ্গে নিহত  সৌরভের যোগাযোগ হয়। এমনকি  সৌরভের কাছাকাছি ছিল ওই দুটি মোবাইল নাম্বার। পুলিশ দুইজনের মোবাইল নাম্বার ট্রাকিং করে তাদের সন্ধান খুঁজে বের করে। সৌরভ হত্যার ঘটনায় পুলিশ শনিবার অভিযান চালিয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুন ও এনাম আহমদ নামের ওই দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে। আল মামুনকে সিলেটের বন্দরবাজারের একটি আবাসিক  হোটেল থেকে ও এনামকে  গোলাপগঞ্জের আছিরখালের তার নানার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেয়া তথ্য মতে পুলিশ মৌলভীবাজার উপজেলার রাজনগরে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় রাজনগরের মুন্সিরবাজারের জুয়েল আহমদ নামের এক যুবকের বাড়ি থেকে নিহত উবার চালক সৌরভের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ওখান থেকে এনামকেও গ্রেপ্তার করে।

পরে গতকাল রোববার রেদওয়ান নামের আরো একজনকে গ্রেপ্তার করে। সৌরভ হত্যার ঘটনায় পুলিশ এ পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে জানিয়েছেন- গ্রেপ্তারের পর প্রথমে আল মামুন ও এনাম ছিনতাইয়ের কথা স্বীকার করে। এরপর মোটরসাইকেলটি মুন্সিবাজারের জুয়েলের হেফাজতে রয়েছে বলে জানায়। রেদওয়ান মোবাইল ফোনে দুলাভাইকে ফোন করে টাকা চেয়েছিলো। চার জনকে খুনের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মামুন ও এনামের নেতৃত্বে উবার মোটরবাইক ছিনতাই করতে তারা চালককে মোহাম্মদপুর এলাকায় নিয়ে গিয়ে মুখে কাপড় বেঁধে ছুরি দিয়ে আঘাত করে খুন করে। এরপর সৌরভ মারা গেলে তারা লাশ গুম করতে পাশের ডোবায় চুবিয়ে রেখে চলে যায়। গ্রেপ্তারের পর তারা পুলিশের স্বীকার করেছে- তারা টার্গেট করতো উবার চালকদের। তাদেরকে রাতের আঁধারে ভাড়ায় নিয়ে আসে। এভাবে সৌরভকে তারা একই কায়দায় মোগলাবাজারের মোহাম্মদপুরে নিয়ে আসে। এর আগে তারা আরো এক উবার চালককে একই ভাবে নিয়ে এসেছিলো। এবং তাকে ছুরিকাঘাত করে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলো। সিলেটের মোগলাবাজার থানার ওসি শামসুদ্দোহা মানবজমিনকে জানিয়েছেন,  গ্রেপ্তারকৃতদের একটি ছিনতাই টিম রয়েছে। তাদের টার্গেটে ছিলেন উবার চালকরা। মোটরসাইকেল ছিনতাই করে তারা মৌলভীবাজারে নিয়ে যেতো। এবং একটি ঘটনার পর কিছুদিন আত্মগোপনে থেকে তারা নতুন করে আরো একটি ঘটনা ঘটাতো। তিনি জানান, উবার চালক সৌরভ খুনের ঘটনায় চার জনকে আজ সিলেটের আদালতে হাজির করা হবে।

mzamin

Comments
Loading...