ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর

0 ৫০

জমির হোসেন: ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। রূপালি ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর। এটা সবার জানা আছে। গোলাকার এই পৃথিবীতে যেখানেই বাংলা ভাষাভাষী বসবাস করছে, সেখানেই ইলিশের চাহিদা রয়েছে। ইলিশের স্বাদগ্রহণ করতে অপেক্ষায় থাকে সবাই। যদিও বাজার ভরে আছে নানা প্রজাতির কত শত রকমের মাছ। তবুও মুখের স্বাদ মনের চাওয়া একমাত্র ইলিশ। সেজন্যে ইলিশের বাড়ি শুধু চাঁদপুরে সীমাবব্ধ নয়। ইলিশের বাড়ি বিশ্বজুড়ে।

বিশেষ কিছুদিন আছে ইলিশ মাছ না হলে অপূর্ণ থেকে যায় উৎসব বিশেষ করে বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ। সেজন্যে ইলিশের কোনো বিকল্প নেই। তাই ইলিশ-ই সেরা। বাংলাদেশের চৌষট্টি জেলার মধ্যে বরিশাল, ভোলোাসহ হাতেগোণা কটি স্থানে ইলিশ ধরা পড়ে। তবে চাঁদপুরের মেঘনা, পদ্মার ইলিশের স্বাদ এই বাংলায় দূরের কথা সেই বাংলায়ও নেই। এজন্যে পৃথিবীর এক প্রান্তর থেকে অন্য প্রান্তরে চাঁদপুরের ইলিশ মাছের সুনাম রয়েছে। এই জেলার অন্যান্য খ্যাতি থাকলেও ইলিশই যেনো চাঁদপুর জেলার সুনামকে সর্বাংশে ধরে রেখেছে। ফলে চাঁদপুরের নামের পরিচয় আসলে প্রথমে চলে আসে পদ্মার, মেঘনার ইলিশের নাম।

ইলিশ আমাদের চাঁদপুরের জন্যে একটি নক্ষত্রের নাম। ইতিহাস বলে ইলিশ হলো সামুদ্রিক মাছ। সাগরে বসবাস হলেও বংশবিস্তারের সময় স্থান পরিবর্তন করে প্রায় ১২শ’ কিলোমিটার অতিক্রম করতে হয়। সাধারণত বাংলাদেশের নদীর দূরত্ব ৫০ থেকে ১শ’ কিলোমিটার যার ফলে ইলিশের বংশবিস্তারের সময় এলে ভারতীয় উপমহাদেশের নদী পাড়ি জমাতে হয় ইলিশের। বাংলাদেশে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনায় প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ে এর মধ্যে চাঁদপুর হলো ইলিশের রাজা। পদ্মা, মেঘনার ইলিশের স্বাদ বাংলার মানুষের মুখে মুখে প্রসংশিত।

বাংলাদেশ ইলিশ রপ্তানি করে অনেক দেশীয় মুদ্রা আয় করে। যা দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখে। জিওগ্রাফিক ইনডেঙ্ (জিআই) ২০০৪ সালের হিসেব অনুসারে সারাবিশ্বে ৬৫ ভাগ ইলিশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। অন্যদিকে জীবীকার জন্যে সরাসরি প্রায় ৪ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ জড়িত রয়েছে। ফলে দেশে বেকারের সংখ্যা কমিয়ে আনতে ইলিশের ভূমিকা রয়েছে। এর ফলে সরকার মা ইলিশের সুরক্ষায় নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মৎস্য্য অধিদপ্তরের ২২ দিনের জাটকা নিধন কর্মসূচি। মা ইলিশকে রক্ষায় বিশেষ প্রসংশনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয় সরকার থেকে। দেশের বরিশাল থেকে ইলিশের মৌসূমে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ে। তাই ২০১৭ সরকার ৮ মাসের একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত কোনো জেলে নদীতে জাটকা ধরতে পারবে না। আর এই নিষেধাজ্ঞা কেউ উপেক্ষা করলে জেল-জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এতে করে জাটকা নিধন অতিমাত্রায় কমে যায়। একদিকে জেলেদের সাময়িক কষ্ট হলেও পরবর্তী সময়ে জেলেদের জালে দ্বিগুণ ইলিশ ধরা পড়লে ওই কষ্ট আর মনে থাকে না। জাটকা নিষেধাজ্ঞা উভয়ের জন্যেই ভালো কিছু বয়ে আনছে। যদিও কথায় আছে ইলিশের তিরিশ কাঁটা তবুও ইলিশকে বাংলার ১৬ কোটি মানুষ পছন্দ করে।

ইলিশ এক এক দেশে এক এক নামে পরিচিত তবে এর বৈজ্ঞানিক নাম তেনুয়ালোসা ইলিশা। ইলিশের রেসিপি অনেক জনপ্রিয় প্রতিটি রেসিপির ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ। তার মধ্যে অন্যতম স্বাদে ভরপুর সরিষা ইলিশ। তাই বাংলার বুকে এমন একজন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে ইলিশ মাছ পছন্দ করে না। ইলিশের ঘ্রাণ, গন্ধে মন ভরে যায়। তাই ইলিশ ছাড়া বাঙালির একদম চলে না। আধুনিকায়নের যুগে পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে ইলিশের দেখা মিলে না। আর সবাই ইলিশের স্বাদগ্রহণ করতে চাঁদপুরে আসতে নিজের মনোভাব প্রকাশ করে। মেঘনা, পদ্মার জলে ঢেউয়ের তালে তালে নৌকা দিয়ে জেলেরা তাজা ইলিশ ধরে এমন দৃশ্য পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। তরতাজা ইলিশ জেলেদের জালে ধরা পড়ছে এরকম অনেক প্রামাণ্য চিত্র দেখা যায়। রূপালি ইলিশ জালের মধ্যে বন্ধী হয়ে লাফালাফি করে। এরকম দৃশ্য দেখে শীতল হয়ে যায় মন।

রুপে সৌন্দর্যে বার বার মনে পড়ে যায় ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর। চাঁদপুর জেলাকে ব্র্যান্ডিংয়ের আওতায় আনতে ২০১৭ সালের ২৭ জানুয়ারি ছিলো একটি স্মরণীয় দিন চাঁদপুর জেলাবাসী তথা বাংলাদেশের জন্যে। কারণ এই প্রথম ইলিশকে নিয়ে কোনো জেলা এতো বড় ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করে। যা বাংলদেশের জন্যে বড় ইতিহাস এবং চাঁদপুরবাসীর জন্যে গৌরব। আর এর সর্বমূলে রয়েছে চাঁদপুরের ইলিশ। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ যখন ইলিশ পছন্দ করে। বিশেষ করে, চাঁদপুরের ইলিশ। সেখানে দেশের প্রথম জেলা ব্র্যান্ডিং ফেস্টিভ্যাল শুরু করে বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও চাঁদপুরের গুণীজনরা। তাঁরা ইলিশকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে নিজেদের মেধা, শ্রম, ব্যয় করেছে। সত্যি-এই আয়োজন অবিস্মরণীয় এবং প্রশংসনীয়। এই উদ্যোগের ফলে চাঁদপুরে ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন একটি বাণিজ্যকক্ষেত্র তৈরি হবে। পৃথিবীর বুকে এর নাম ছড়িয়ে যাবে। বিশ্বজুড়ে নামী-দামী প্রায় একশ ব্র্যান্ড রয়েছে। প্রতিটি ব্র্যান্ড মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়। নামী-দামী ওই ব্র্যান্ডের সাথে যখন ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর ইলিশ ব্র্যান্ডিংয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে তখন চাঁদপুর জেলা বিশ্ব দরবারে নতুনভাবে পরিচিতি লাভ করা শুরু করবে। মানুষের মাঝে একটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্ধু হয়ে উঠবে চাঁদপুরের ইলিশ।

লেখক : সংবাদকর্মী ইতালি প্রবাসি

Comments
Loading...