খালেদার দ্রুত মুক্তি নিয়ে শঙ্কা

0

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় জামিন প্রশ্নে হাইকোর্টে শুনানি শেষ হলেও কারাবন্দি বেগম খালেদা জিয়ার অপেক্ষা এখনই ফুরাচ্ছে না। শুনানি শেষে আদালত কোনো আদেশ দেননি। আদালত বলেছেন নিম্ন আদালতের নথি এলে তা দেখে আদেশ দেবেন। রোববার বেলা ২টা ১০ মিনিটে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের ওপর শুনানি শুরু হয়।

কিন্তু, সেখানে এত বেশিসংখ্যক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন যে, আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম এজলাস কক্ষে প্রবেশ করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীনকে লক্ষ্য করে বলেন, প্রেসিডেন্ট এমনটি হলে আমরা কীভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করব।

জয়নুল আবেদীন জবাবে বলেন, মাননীয় আদালত, এটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা। এ মামলার প্রতি দেশবাসীর আগ্রহ আছে, আইনজীবীদেরও আগ্রহ আছে। এ সময় অপর বিচারপতি সহিদুল করিম বলেন, আপনাদের উপস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে আমাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতকে বলেন, আইনজীবীদের একটি তালিকা দিয়ে দিলে ভালো হয়। সেটি সর্বোচ্চ ৩০ জন হতে পারে। তাতে আদালতের পরিবেশ ঠিক থাকবে। তার কথার জবাবে জয়নুল আবেদীন বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল মেধাবী। এই মামলায় তিনি একাই যথেষ্ট।

এরপর আদালত বলেন, আপনারা পরিবেশ শান্ত করুন। আমরা ১০ মিনিট পরে আসছি। এরপর দুই বিচারপতি বেলা ২টা ১৬ মিনিটে এজলাস ছেড়ে উঠে যান। এরপর এজলাস থেকে জুনিয়র আইনজীবীরা বের হয়ে যান। পরে বেলা আড়াইটা থেকে আবারও শুনানি শুরু হয় এবং বিকাল সাড়ে ৩টায় শুনানি শেষ হয়। খালেদা জিয়ার সাজার বিরুদ্ধে করা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিএনপি চেয়ারপারসনের জামিন চাওয়া হয় আবেদনে। এরপর দুই বিচারক পাঁচ মিনিট নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। পরে আদালত বলেন, নিম্ন আদালতের নথি আসার পর আদেশ দেওয়া হবে।

শুনানিতে জামিন আবেদনের বিরোধিতা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। জামিন আবেদনের শুনানিতে অংশ নিয়ে তিনি আদালতকে বলেন, ইতিহাসে এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী যিনি এতিমদের টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, একজন প্রধানমন্ত্রীর ছেলের স্বাক্ষরে কীভাবে টাকা চলে যায়? ওইং সময় তার ছেলে প্রধানমন্ত্রীর বাসায়ই থাকতেন। একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি এত বড় দায় এড়াতে পারেন না। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদ এবং ভারতের মুখ্যমন্ত্রী জয় ললিতার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, রাজনীতিবিদরা দুর্নীতির দায়ে অভিয্ক্তু হলে অনুকম্পার সুযোগ নেই।

খালেদা জিয়ার পক্ষের আইনজীবীরা সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর বয়স, অসুস্থতা ও সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করে জামিন আবেদনের আর্জি করেন।

অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী জামিনের বিরোধিতা করেন। খালেদা জিয়ার জামিন শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে খুরশীদ আলম খান এবং খালেদা জিয়ার পক্ষে এ জে মোহাম্মদ আলী, আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, খন্দকার মাহবুব হোসেনসহ অর্ধশতাধিক আইনজীবী অংশ নেন।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া সাজার রায়ের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার করা আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে জামিন আবেদনের ওপর শুনানির জন্য ২৫ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেন। পাশাপাশি স্থগিত করেন তার অর্থদণ্ড।

এর আগে, ২০ ফেব্রুয়ারি বিকালে খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ আপিল করেন। আপিলের ফাইলিং আইনজীবী আবদুর রেজাক খান। আপিলে ৪৪টি যুক্তি তুলে ধরা হয়। এছাড়া নিম্ন আদালত থেকে মামলার নথি তলব করার জন্য আদেশও চাওয়া হয় আপিল আবেদনে। নিম্ন আদালত থেকে মামলার নথি তলব করার জন্য খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আবেদন করায় হাইকোর্ট গত ২২ ফেব্রুয়ারি বিচারিক আদালতকে ১৫ দিনের মধ্যে নথি পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এর আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত ঢাকার ৫নং বিশেষ জজ ড. আখতারুজ্জামান দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অপর পাঁচ আসামির ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেন আদালত। রায় ঘোষণার ১১ দিন পর ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকালে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা রায়ের সার্টিফায়েড কপি হাতে পান।

জামিন আবেদনে যা আছে
গত ৩০ বছর তার পায়ে গেঁটে বাত। ডায়াবেটিস ২০ বছর ধরে। ১০ বছর ধরে ভুগছেন উচ্চরক্তচাপ আর আয়রন স্বল্পতায়। আছে দুই হাঁটু প্রতিস্থাপনের কারণে হওয়া প্রচণ্ড যন্ত্রণাও। হাইকোর্টে দাখিল করা জামিন আবেদনে এমন নানা শারীরিক জটিলতার কথা উল্লেখ করেছেন খালেদা জিয়া।

জামিন আবেদনে আরও বলা হয়, তার বয়স ৭৩ বছর। তিনি শারীরিক বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছেন। ১৯৯৭ সালে তার বাঁ-হাঁটু এবং ২০০২ সালে ডান-হাঁটু প্রতিস্থাপন করা হয়েছে উল্লেখ করে আবেদনে আরও বলা হয়, হাঁটু প্রতিস্থাপনের কারণে তার গিঁটে ব্যথা হয়, যা প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক। এমনকি হাঁটাহাঁটি না করতেও চিকিৎসকের পরামর্শ রয়েছে। এসব শারীরিক জটিলতার কারণ বিবেচনায় তার জামিন মঞ্জুরের আর্জি জানানো হয়।

উপমহাদেশ ও দেশের উচ্চ আদালতের দীর্ঘ ঐতিহ্যের কথা আবেদনে উল্লেখ করে বলা হয়, যখন আসামি একজন নারী হয়, তখন তার অনুকূলে জামিন বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আবেদনকারীর জামিন আবেদন মঞ্জুর করা হোক। আর জামিন আবেদনকারী বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপারসন। তা ছাড়া যে মামলায় তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক।

খালেদার দ্রুত মুক্তি নিয়ে শঙ্কা
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাটি ছাড়াও আরও ৩৫ মামলা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি মামলা, গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা, নাইকো দুর্নীতি মামলা, মানহানি ও ভুয়া জন্মদিনের মামলাসহ ৩৫ মামলা। খালেদা জিয়া যদি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিনও পান তারপরও তিনি কারাগার থেকে শিগগিরই মুক্তি পাবেন কি না তা বলা কঠিন। কেননা তার আটক দীর্ঘায়িত করতে এসব মামলার মধ্যে দুই একটি মামলায় শ্যেন অ্যারেস্টও দেখানো হতে পারে। তবে পরিস্থিতির ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করবে।

খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়া পর গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয় কুমিল্লায় নাশকতার এক মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে শ্যেন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছে। পরের দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, কারাবন্দি খালেদা জিয়াকে অন্য কোনো মামলায় শ্যেন অ্যারেস্ট দেখানো হয়নি।
পরিবর্তন

Comments
Loading...