চাকরি পেতে মরিয়া ছাত্রলীগ, মুক্তির চেষ্টায় ছাত্রদল, কোণঠাসা শিবির

0 ৩৩

Chattroইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি-বাণিজ্যনির্ভর সংগঠনে রূপান্তর হয়েছে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। চাকরিপ্রার্থী নেতাকর্মী ও বহিরাগতদের ভিড়ে তাদের দলীয় টেন্ট দিন দিন ছাত্রশূন্য হয়ে পড়েছে। বিগত পাঁচ বছরে এমন কোন অপকর্ম নেই যা বিশ্ববিদ্যালয়টিতে করেনি ছাত্রলীগ। দু’দফায় শিক্ষকদের ওপর হামলা, বিভিন্ন অফিসে অফিসে ভাঙচুর, গাড়ি ভাঙচুর, বিশ্ববিদ্যালয় অবরোধ, ভিসির বাসভবনে পেট্রল বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার হুমকি, রাতে মাঝেমধ্যে ভিসির বাসভবনের সামনে ও ক্যাম্পসের বিভিন্ন জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো, গুলি ফুটানো, প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়মিত রুটিনে পরিণত হয়েছে। এদিকে পুলিশি হয়রানি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একচোখা নীতি ও ছাত্রলীগ ক্যাডারদের হামলায় ক্যাম্পাসে অস্তিত্ব শূন্যতায় ভুগছে ছাত্রদল। হামলা ও মামলা থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসনের সঙ্গে দেনদরবারে কাটছে তাদের সময়। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রবল প্রতাপশালী ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির এখন অনেকটাই নির্জীব। হল রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে তাদের কার্যক্রম। ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ে জড়িত সাবেক এসব ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর মধ্যে অনেকেই ২০০৫ ও ২০০৬ সালে শিক্ষাজীবন শেষ করেছে। তারপরও চাকরি পেতে ও চাকরি-বাণিজ্য করতে তারা প্রতিদিন ক্যাম্পাসে এসে অনবরত ধ্বংসাত্মক কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এ ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ে গত ৫ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটি কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। সম্পদের পরিমাণ নিয়ে নির্দিষ্ট কোন পরিসংখ্যান না থাকলেও অন্তত ২০ কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ধ্বংসাত্মক ছাত্র রাজনীতির আগুনে পুড়ে প্রায় দুই কোটি টাকার দু’টি নতুন বাস এখনও বিকল হয়ে পড়ে আছে। বাণিজ্য, টেন্ডারবাণিজ্য, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তাদের ক্যাডার সুলভ আচরণে যেমনিভাবে সারা দেশে ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তেমনিভাবে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ছাত্রশূন্য সংঘটনে রূপান্তর হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটিও তাদের ওপর অতিশয় বিরক্ত বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ের নেতৃত্বে রয়েছে লোক প্রশাসন বিভাগের ২০০০-০১ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রলীগ নেতা আশিকুর রহমান জাপান, ২০০৩-০৪ শিক্ষাবর্ষের ব্যবস্থাপনা বিভাগের তৌফিকুর রহমান হিটলার, একই বিভাগের লেলিন, ইংরেজি বিভাগের শিমুল (ছাত্রজীবনে বঙ্গবন্ধু হলে তার রুম থেকে বোমাসহ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে প্রশাসন), একই বিভাগের টিটু, কাশেমসহ অনেকে। নিয়োগ-বাণিজ্যে মোটা অঙ্কের টাকা কামানোর লক্ষ্যে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে চাকরি দিতে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক অস্ত্রধারী ক্যাডার সজীব। গত ২০শে এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি অফিসে সবার উপস্থিতিতে পেট্রল বোমা মেরে ভিসিসহ তার বাসভবন উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছিল সজীব। এ সময় ভিসির সঙ্গে এ ধরনের আচরণের কারণে সজীবের ওপর ক্ষিপ্ত হয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তাকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ইবি শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়কসহ অন্যান্য সদস্য। এ সময় সজীবের পক্ষ নেয় ছাত্রলীগের অপর যুগ্ম আহ্বায়ক সাজন মৃধা। ছাত্রলীগ নামধারী বহিরাগত চাকরিপ্রত্যাশী এসব ক্যাডার ক্যাম্পাসে নিয়মিত নানা ধ্বংসাত্মক কর্মকা- চালিয়ে যেতে থাকলেও অজ্ঞাত করণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ফলে মূলত জিম্মিদশায় পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা। এক শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের এখানে কোন অপরাধের শাস্তি হয় না। ফলে অপরাধীরা বারবার একই অপরাধ করে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, সর্বশেষ কবে, কোন অপরাধীর শাস্তি হয়েছে তা আমার জানা নেই।’ ক্যাম্পাস রাজনীতিতে বর্তমানে শূন্যের কোঠায় অবস্থান করছে ছাত্রদল। সাধারণ সম্পাদকসহ আটক নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে তারা। সম্পূর্ণ সফল না হলেও কয়েক দফা ছাত্র ধর্মঘট পালন করেছে তারা। দলীয়ভাবে তো দূরের কথা ছাত্রলীগের ভয়ে ক্যাম্পাসে আসা ছেড়ে দিয়েছে তারা। ক্লাস-পরীক্ষার জন্য দু’-একজন নেতাকর্মী ক্যাম্পাসে এলেও তারা ছাত্রলীগের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলার চেষ্টা করে। চোখে পড়ে গেলে তাদের ওপর একযোগে হামলা করে ছাত্রলীগের উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীরা। ছাত্রদল নেতা দশজন থাকলে তাদের মধ্যে গ্রুপ রয়েছে দশ থেকে বারোটিরও বেশি। সাবাই নেতা হওয়ার জন্য মরিয়া। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এক সময় ব্যাপক ক্ষমতাধর সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। তাদের দাপটে কোন ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে আসতে সাহস পেতো না। তারা এখন অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। মহাজোট সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ধরি মাছ না ছুঁই পানি নীতিতে চলছে তারা। তাদের রাজনীতি বর্তমানে অনেকটা হলনির্ভর হয়ে পড়েছে। ক্যাম্পাস রাজনীতিতে এখন আর তাদের তেমন উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় না। চাকরিপ্রত্যাশী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জাপান ও হিটলার বলেন, ‘দলের জন্য আমরা সব সময় রাজনীতি করে আসছি। কিন্তু প্রশাসন আমাদের চাকরি না দিয়ে বড় অঙ্কের টাকার লেনদেনের মাধ্যমে একের পর এক জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়োগ দিয়েই যাচ্ছে। আমরাও ছাড় দেবো না। প্রয়োজনে আমরা আরও কঠোর আন্দোলন করবো।’ দলের অবস্থান জানতে চাইলে ইবি শাখা ছাত্রদল সভাপতি ওমর ফারুক বলেন, ‘প্রশাসন ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠনগুলোর সহবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি।’ শিবির সভাপতি আসাদুল্লাহ তার সংগঠনের নাজুক অবস্থা অস্বীকার করে বলেন, ‘অবৈধ সরকারের দমননীতির কারণে আমাদের কাজ করতে হচ্ছে অনেক হিসাব-নিকাশ করে। সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনকে ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতে সহয়তা করছে প্রশাসন। আর বিরোধীদলীয় ছাত্র সংগঠনকে দমন করছে। আমাদের আন্দোলন আদর্শবাদী আন্দোলন। আদর্শ ছাত্রসমাজ গঠন করার লক্ষ্যে অব্যাহত গতিতে আমাদের কার্যক্রম চলছে। ক্যাম্পাসে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ভর্তি ও নিয়োগ-বাণিজ্যসহ অযথা কোন ধরনের দাঙ্গা-হাঙ্গামায় ছাত্রশিবির বিশ্বাস করে না।’

Comments
Loading...