ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির ৮ বছরঃ দাবি আদায়ে অটুট জনতার ঐক্য

0 ২৪

fulbari_798030395ঢাকা: ২৬ আগস্ট, ঐতিহাসিক ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির আট বছর। এতো দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ‍আট বছর আগে চূড়ান্ত আন্দোলনের সময় স্বাক্ষরিত ছয় দফা চুক্তির তিনটি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। তবে এই আন্দোলনে জনগণের ঐক্য এখনো অটুট আছে, এই আশাবাদ আর আংশিক সাফল্য নিয়েই আন্দোলনকারীরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।

ঐতিহাসিক দিবস স্মরণ করে এবং আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি জানিয়ে তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বাংলানিউজকে বলেন, আট বছর ধরে সর্বস্তরের জনগণ উন্মুক্ত কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলন প্রতিরোধ করে আসছে। জনতা ঐক্যবদ্ধ থাকলে লুটেরাদের চক্রান্ত প্রতিরোধ করা যায় তার প্রমাণ ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডি। ওই আন্দোলনের এটা অনেক বড় পাওয়া।

তিনি বলেন, পানি সম্পদকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় সংস্থার মাধ্যমে ফুলবাড়ীর এই কয়লা উত্তোলন করলে তাতে কোনো আপত্তি নেই দেশবাসীর। মালিকানা থাকবে সম্পূর্ণ বাংলাদেশের।

ফুলবাড়ী চুক্তি বিষয়ে তিনি বাংলানিউজকে জানান, ছয় দফার মধ্য তিনটি বাস্তবায়িত হয়েছে। সেগুলো হলো নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণ প্রদান, নিহতদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ এবং আন্দোলনকারী জনগণের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার। তবে, বাকি তিন দফা বাস্তবায়নের জন্য এখনো তাদের আন্দোলন চলছে এবং চলবে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি এশিয়া এনার্জি সম্পর্কে আনু মুহাম্মদ বলেন, এই কোম্পানি একদমই আন্তর্জাতিক মানের নয়। ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও তারা এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র ফুলবাড়ীতেই কাজ করেছে। কোম্পানির মালিকসহ সুবিধাভোগীরা বর্তমানে বাংলাদেশের সম্পদ ব্যবহার করে তারা অন্য দেশে শেয়ার ব্যবসা করছে। যার কোনো বৈধতা নেই। সম্পূর্ণ ভুয়া একটি কোম্পানি।

দিবসটি উপলক্ষে আনু মুহাম্মদ তার ফেসবুকে স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ২০০৬ সালের এইদিনে দেশের পানিসম্পদ, আবাদী জমি ও মানুষ বিনাশী ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের বিরুদ্ধে বাঙালি আদিবাসী নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধসহ সকল মানুষের ধারাবাহিক প্রতিবাদ বিশাল আকার নিয়েছিলো। এই প্রকল্প অনুযায়ী ফুলবাড়ী সহ ছয় থানায় ৫ লক্ষাধিক মানুষ উচ্ছেদ করে, আবাদী জমি, ভূগর্ভস্থ ও নদীনালার পানি বিনাশ করে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের আয়োজন করেছিলো অনভিজ্ঞ ভুইফোঁড় কোম্পানি এশিয়া এনার্জি।

প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী মাত্র ৬ শতাংশ রয়্যালটির বিনিময়ে কোম্পানি পুরো খনির মালিকানা তারা পেয়ে যেতো এবং শতকরা ৮০ ভাগ বিদেশে রফতানির মাধ্যমে নিজেরা বিপুল মুনাফা লাভ করতো। বাংলাদেশ হারাতো আবাদী জমি, বিনষ্ট হতো অমূল্য পানি সম্পদ, লক্ষ লক্ষ মানুষ উচ্ছেদ হতেন জীবিকা ও সমাজ থেকে, আবার দেশ হারাতো কয়লা সম্পদও।

সারাদেশে উন্মুক্ত খনি নিষিদ্ধ ও এশিয়া এনার্জি বহিষ্কারের ধারাসহ এই চুক্তি ‘ফুলবাড়ী চুক্তি’ হিসেবে খ্যাত। চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিএনপি এবং প্রকাশ্য অঙ্গীকারের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এই চুক্তি বাস্তবায়নে দায়বদ্ধ। ফুলবাড়ী চুক্তি বাস্তবায়ন এখন রাষ্ট্রের দায়। এর অন্যথা করার কোনো পথ নাই।

ছয় দফা চুক্তি: ছয়দফা চুক্তির মধ্য ছিল এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার, দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা যাবে না, নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরন প্রদান, নিহতদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, গুলি বর্ষণকারীদের শাস্তি এবং আন্দোলনকামী জনগণের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার।

সেদিন যা ঘটেছিল: ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট উন্মুক্ত পদ্ধিতে কয়লা খনি প্রকল্প বাতিল, জাতীয় সম্পদ রক্ষা বহুজাতিক এশিয়া এনার্জি কোম্পানিকে ফুলবাড়ী থেকে প্রত্যাহারের দাবিতে হাজারো জনতা জমায়েত হতে থাকেন ফুলবাড়ীর ঢাকা মোড়ে। ফুলবাড়ী, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ ও পার্বতীপুর উপজেলার প্রায় সব মানুষ একাত্ম প্রকাশ করেন এ আন্দোলনে।

দুপুর ২টার দিকে তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ও ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটির নেতৃত্বে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল নিমতলা মোড়ের দিকে এগোতে থাকে। এসময় পুলিশ ও তৎকালীন বিডিআর’র সদস্যরা মিছিলে বাধা দেয়। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সব বাধা পেরিয়ে মিছিলটি সামনের দিকে এগোতে থাকলে মিছিলকারীদের ওপর টিয়ার শেল, রাবার বুলেট ও নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করা শুরু হয়।

এসময় আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের গুলিতে শিক্ষার্থী আল আমিন, সালেকীন ও তরিকুল নিহত হন। এতে আহত হন প্রায় দুই শতাধিক মানুষ। আহতদের মধ্যে অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করেন।

এই ঘটনায় উত্তেজিত জনতা ওই দিনই ফুলবাড়ীতে অবস্থিত এশিয়া এনার্জির অফিস ভাঙচুর করে। শুরু হয় লাগাতার হরতাল। ফুলবাড়ীর সঙ্গে অন্যান্য জেলা ও উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

অবশেষে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ৩০ আগস্ট পার্বতীপুর উপজেলা মিলনায়তনে সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে সরকারের পক্ষে তত্কালীন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মিজানুর রহমান মিনু এবং জাতীয় কমিটির পক্ষে জাতীয় কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহম্মদ ছয় দফা চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

এরপর থেকে ২৬ আগস্টকে তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ‘জাতীয় সম্পদ রক্ষা দিবস’ এবং স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা সম্মিলিত পেশাজীবী সংগঠন ‘ফুলবাড়ী শোকদিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে।

ওই চুক্তির এক সপ্তাহ পর তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা ফুলবাড়ীতে এসে আন্দোলনরত মানুষের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের কাছে চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিও জানান। কিন্তু সেই চুক্তি এখনো শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারও বাস্তবায়ন করেনি।

দিবসটি উপলক্ষে কর্মসূচি: ট্র্যাজেডি স্মরণে দিনব্যাপী কেন্দ্রীয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে ফুলবাড়ীতে, শুরু হবে সকাল ৭টায়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ সারাদেশে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন আলোচনা সভা শোভাযাত্রা ও প্রতিরোধের গানসহ নানা আয়োজন থাকবে। ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধানিবেদন ও জমায়েত অনুষ্ঠিত হবে হবে সকাল ১০টায়।

Comments
Loading...