যে ২০ জন বাংলাদেশির নাম এসেছে প্যারাডাইস পেপারসে

0

অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক জোট আইসিআইজে করের স্বর্গ বলে পরিচিত বিভিন্ন দেশে কোম্পানি নিবন্ধনের যে সর্বশেষ তালিকা প্রকাশ করেছে তাতে মুসা বিন শমসেরসহ ২০ বাংলাদেশির নাম পাওয়া গেছে। তাদের সবার নামে ইউরোপের ছোট দ্বীপরাষ্ট্র মাল্টায় কোম্পানি থাকার তথ্য রয়েছে।

অফশোর ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) এখন এক কোটি ৩৪ লাখ নথি পরীক্ষা করে দেখছেন। বারমুডায় অবস্থিত অ্যাপলবাই নামের এক আইনি সহযোগী সংগঠনের কাছ থেকে নথি ফাঁস হয়ে যাওয়ার এই ঘটনার নাম দেওয়া হয়েছে প্যারাডাইস পেপারস।

মাল্টায় অফশোর কোম্পানি খুলেছিল এমন অন্তত ২০ জন বাংলাদেশির নাম এসেছে প্যারাডাইস পেপারসে। ‘ট্যাক্স হ্যাভেন’ হিসেবে পরিচিত ইউরোপের এই দেশটিতে কর না দিয়ে বা খুব অল্প পরিমাণ কর দিয়ে বিনিয়োগের সুযোগ নেন তারা।

প্যারাডাইস পেপারসে ২০ বাংলাদেশির নাম আসার বিষয়টি গত বুধবার প্রকাশ করে আইসিআইজে। তবে তারা ঠিক কি পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ থেকে মাল্টা বা অন্য কোথায় পাঠিয়েছে তা এখনও জানা যায়নি। মাল্টায় মূলত জাহাজ ব্যবসা, জ্বালানী ও টেক্সটাইল ক্ষেত্রে বিভিন্ন কোম্পানির নিবন্ধন নিয়েছেন তারা।

প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে তারা এ ব্যাপারে তদন্ত করবে। প্যারাডাইস পেপারসে যে ২০ জনের নাম এসেছে তার মধ্যে রয়েছেন বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসের। ২০১০ সালের ৪ মে ভেনাস ওভারসিজ হলিডেজ নামের একটি কোম্পানির নিবন্ধন নিয়েছিলেন তিনি।

মুসা বাংলাদেশে ড্যাটকো নামে জনশক্তি রপ্তানির একটি কোম্পানির চেয়ারম্যান। মন্তব্যের জন্য চেষ্টা করা হলেও তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ড্যাটকোর জেনারেল ম্যানেজার মোশারফ হোসেনকে ফোন করা হলেও সেদিক থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

মুসা বিন শমসের বাংলাদেশের একজন বিতর্কিত ব্যবসায়ী। সম্পদের মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা চলছে। দুদকে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংকে তার ১২০০ কোটি ডলার ‘ফ্রিজ’ অবস্থায় রয়েছে, যা বাংলাদেশি টাকায় ৯৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার সমান ৮২ টাকা হিসাবে)। এ ছাড়াও সুইস ব্যাংকের ভল্টে ৯ কোটি ডলার দামের অলঙ্কার জমা রয়েছে। মুসার দেওয়া তথ্য যাচাই করতে দুদকের চাহিদা অনুযায়ী সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু চিঠির উত্তরে ব্যাংকটি জানিয়েছে, সেখানে মুসার নামে কোনো হিসাব নেই।

গত বছর মুসাকে দুর্নীতি ও সম্পদের তথ্য গোপন করার ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল।
তালিকায় ইমরান রহমান ও শাহনাজ হুদা রাজ্জাকের নাম এসেছে দুবার করে। স্থানীয় ঠিকানা হিসেবে তারা সাভারে ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকাকে ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তারা ২০০১ সালের অক্টোবরে ওশেন আইস ও সাউদার্ন আইস নামের দুটি জাহাজ কোম্পানি খুলেছে। তারা কোম্পানির পরিচালক। এর মধ্যে ইমরান প্রবাসী হিসেবে ভিয়েতনামে বসবাস করছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে চট্টগ্রামের দুই ভাই মোহাম্মদ এ আউয়াল ও মোহাম্মদ এ মালেকের নামে তিনটি কোম্পানির নিবন্ধন নেওয়া হয়। এই কোম্পানিগুলো হল মারজান শিপিং, কোয়ামার শিপিং ও শামস শিপিং। আউয়াল এখন চট্টগ্রামে বেঙ্গল শিপিং নামের একটি কোম্পানির চেয়ারম্যান। আর তার ভাই মালেক ওই কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

এছাড়াও, রাজধানীর ধানমন্ডির কেএইচ আসাদুল ইসলাম ২০১৫ সালের ২০ মার্চ ইন্টারপিড গ্রুপ ও ইন্টারপিড ক্যাপিটাল নামের দুটি কোম্পানির নিবন্ধন নেন। গোপন নথিতে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গুলশানের ফারহান আকিবুর রহমান ইন্টারপিড গ্রুপের একজন পরিচালক। তবে আইসিআইজের প্রতিবেদনে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা সম্ভব হয়নি।

দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ গতকাল বলেন, ‘আমাদের চলমান তদন্তে আমরা এই নামগুলোকেও যুক্ত করব। তিনি জানান, গোপনীয় নথিতে আগে যেসব বাংলাদেশির নাম এসেছে তাদের ব্যাপারে বিভিন্ন দেশে ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলেও তিনি স্বীকার করেন।

আইসিআইজের সর্বশেষ প্রতিবেদনে আর যেসব বাংলাদেশির নাম উঠে এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন ধানমন্ডির জুলফিকার আহমেদ। ১৯৯৯ সালের মে মাসে মাল্টায় তিনি একটি শিপিং কোম্পানির নিবন্ধন নেন। এছড়াও আতিকুজ্জামান নামের একজন ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ইউরোপের দেশটিতে নিউ টেকনোলোজি ইনভেস্টমেন্ট নামের একটি কোম্পানি খোলেন। এই অফশোর ফার্মের তিনি একজন অংশীদার। রাশিয়া ও বাংলাদেশকে তিনি লিংক কান্ট্রি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তবে তিনি কোম্পানির নিবন্ধনের জন্য রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর একটি ঠিকানা ব্যবহার করেন।

তাইজুল ইসলাম তাজুন নামের আরেকজন বাংলাদেশি নারায়ণগঞ্জের ঠিকানা দিয়ে ২০০৫ সালের জুন মাসে চারটি কোম্পানির নিবন্ধন নেন। ফারুক পালোয়ান ও তুহিন ইসলাম সুমন নামের দুজনকে এই চার কোম্পানির পরিচালক করা হয়। এছাড়াও বাংলাদেশ ও আয়ারল্যান্ডকে ব্যবহার করে মাহমুদ হোসেন ও মোহাম্মদ রেজাউল হক অফশোর কোম্পানির নিবন্ধন নেন। তবে নথি থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায় যে তারা ডাবলিনের ঠিকানা ব্যবহার করেছেন।

রিপোর্টে আর যাদের নাম এসেছে তারা হলেন, বারিধারা ডিওএইচএসের আমানুল্লাহ চাগলা, মো. ফজলে এলাহি চৌধুরী ও ইউসুফ খালেক; বনানী ডিওএইচএসের মোহাম্মদ কামাল ভূঁইয়া ও মাহতাবা রহমান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া দেশের বাইরে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা অবৈধ। তালিকায় যাদের নাম আছে তাদের কেউই এ পর্যন্ত এ ধরনের অনুমোদন নেননি। এর আগে এ তালিকায় ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু, আওয়ামী লীগ নেতা কাজী জাফরউল্যাহসহ অনেকের নাম এসেছে। তবে তারা কেউ বিদেশে বিনিয়োগের অভিযোগ স্বীকার করেননি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মো. রাজী হাসান বলেন, আইসিআইজের রিপোর্টে যাদের নাম এসেছে তাদের লেনদেন নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করবে। তারা বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার করেছেন কিনা সেটা ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে দিয়ে তদন্ত করাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, আইনগত দিক থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশে কোম্পানি খুলতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে। অনুমোদন ছাড়া কোম্পানি খোলার সুযোগ আইনে এখনও নেই। অফশোর লিকসে যেসব কোম্পানির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বিনিয়োগের আইনগত দিক সরকারের অনুসন্ধান করে দেখা উচিত। কারণ, এই বিনিয়োগ দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তি স্বার্থে হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, বিদেশে কোম্পানি গঠনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের নাম প্রকাশিত হলে সাধারণত তা খতিয়ে দেখা হয়। অবৈধ উপায়ে এসব কোম্পানি করা হয়েছে কি-না তা যাচাই-বাছাইর জন্য প্রয়োজনে অন্য দেশ থেকে তথ্য নেওয়া হয়। তথ্যের আলোকে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পাঠানো হয় দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। বর্তমানে এরকম ৩২টি কেস দুদকে বিচারাধীন রয়েছে।

বাংলাদেশে মাল্টার অনারারি কনসাল শোয়েব চৌধুরী বলেন, মাল্টা মূলত একটি শিপিং হাব। যারা শিপিং ব্যবসা করেন, তারা অতিরিক্ত ফি থেকে রেহাই পেতে কোম্পানি খুলে থাকতে পারেন। তিনি বলেন, ব্যবসার প্রয়োজনে এ ধরনের কোম্পানি খোলা অবৈধ নয়। কেউ কোম্পানি খুলে দেশ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ পাচার করলে তা দেখা উচিত- মন্তব্য করেন তিনি। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ব্যবসার প্রয়োজনে লিয়াজোঁ অফিস খোলা আর কোম্পানি নিবন্ধন এক কথা নয়। বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে কোম্পানি খুলতে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন লাগবে। কেউ যদি বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্য দেশের নাগরিক হন এবং সে দেশের আইনি অনুমোদন থাকলে আয় অন্য কোথাও বিনিয়োগ করতে পারেন।

Comments
Loading...