রিমান্ডে ৫ র‌্যাব সদস্য: সাত খুনের চাঞ্চল্যকর তথ্য

0 ১৮

1400063599-e1405763501685নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন তিন কর্মকর্তা সুবিধা ভোগ করলেও নিচের সারির সদস্যরা শুধুমাত্র চাকরি বাঁচানোর জন্যই ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিলেন।

ঘটনার সময় র‌্যাব সদস্যরা ‘কাজটি ঠিক হচ্ছে না’ বলে কর্মকর্তাদের কাছে মন্তব্য করলেও কেউই তাকে কর্ণপাত করেননি। বরং সিনিয়র কর্মকর্তাদের প্রচণ্ড চাপ, হুমকি, ধমক আর রোষানলে পড়েই বাধ্য হয়ে তারা সাতজনকে অপহরণে সম্পৃক্ত হয়।

অপহরণের পর সাতজনকে হত্যা করা হবে এমন করে ভাবেননি র‌্যাব সদস্যরা। তখন র‌্যাবের কয়েকজন সদস্য ‘অনৈতিক’ ও নৃশংস কাজটি করতে গিয়ে মানসিকভাবে বেশ অসুস্থ্ পড়েন। কিন্তু চাকরি বাঁচাতে তারা কাউকে কিছু জানাতে পারেননি।’

আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় রিমান্ডে নেয়া র‌্যাবের পাঁচ সদস্য তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

রিমান্ডে র‌্যাব সদস্যরা আরো বলেন, ‘আমাদের নারায়ণগঞ্জ কোর্টের কাছাকাছি নেয়ার পরে বলা হয়েছে সাতজনকে অপহরণ করা হবে। কিন্তু আমরা জানতাম না তাদের হত্যা করা হবে। কিন্তু রাতে যখন হত্যার পর লাশ কাঁচপুরে শীতলক্ষ্যা সেতুর নিচে ইঞ্জিন চালিত ট্রলারে উঠানো হয় তখন আমরা কয়েকজন আতকে উঠি। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। বরং র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমাদের অস্ত্রের ভয় দেখিয়েছেন। তাই চাকরি বাঁচাতেই আমাদের দিয়েই তারা হত্যা করিয়েছে।’

র‌্যাব সদস্যরা সিনিয়র কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘সিনিয়রদের আদেশ পালন করতে গিয়েই আমরা এখন আসামি হচ্ছি। কিন্তু আমরা এ হত্যায় জড়িত না সম্পৃক্ত।’

বুধবার থেকে আট দিনের পুলিশি রিমান্ডে থাকা র‌্যাব সদস্যরা হলেন- র‌্যাব-১১ এর হাবিলদার এমদাদুল হক, আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক মো. হিরা মিয়া, বিল্লাল হোসেন এবং সিপাহী আবু তৈয়ব।

এদিকে, নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদউদ্দিন র‌্যাবের ওই পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানালেও র‌্যাব সদর দপ্তর থেকে বলা হয়েছে র‌্যাবের পক্ষ থেকেই তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে।

বুধবার দুপুরে পাঁচ র‌্যাব সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিন করে রিমান্ড চেয়ে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চাঁদনী রূপমের আদালতে আবেদন করেন মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুনুর রশিদ মণ্ডল। শুনানি শেষে পাঁচজনকে আটদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদউদ্দিন বাংলামেইলকে জানান, পাঁচ র‌্যাব সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের দেয়া তথ্য নিয়ে এগুনো হচ্ছে। এ ব্যাপারে নতুন কিছু থাকলে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।

এর আগে সাত খুন ঘটনায় গত ১৭ জুন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় র‌্যাব-১১ এর চাকরিচ্যুত অধিনায়ক ও অবসরে পাঠানো সেনাবাহিনীর লে. কর্নেল তারেক সাঈদ। তার আগে ৪ জুন উপ অধিনায়ক ও অবসরে পাঠানো মেজর আরিফ হোসেন ও পরদিন ৫ জুন নৌ বাহিনীর কমান্ডার এম এম রানা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে খুনের দায় স্বীকার করেন।

আদালতের নির্দেশ অনুসারে পুলিশ গত ১৬ মে দিনগত রাতে র‌্যাবের চাকরিচ্যুত তারেক সাঈদ ও আরিফ হোসেনকে এবং পরদিন ১৭ মে এম এম রানাকে গ্রেপ্তার করে। জবানবন্দিতে তিনজনই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেন।

প্রসঙ্গত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার সহ সাতজনকে অপহরণের পুরো পরিকল্পনা করেছিণের নূর হোসেন ও র‌্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তা। পরিকল্পনা মোতাবেক সাতজনকে অপহরণের পর হত্যা শেষে লাশ মাইক্রোবাসে করে কাঁচপুর সেতুর নিচে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে আনা হয়। পরে  লাশ র‌্যাবের ইঞ্জিন চালিত ট্রলারে উঠিয়ে শীতলক্ষ্যার নদীর মোহনাতে নিয়ে ফেলে দেয়া হয়।

উল্লেখ্য, ২৭ এপ্রিল সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহৃত হন। পরদিন ২৮ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন নজরুল ইসলামের স্ত্রী। ৩০ এপ্রিল বিকেলে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত সবারই হাত-পা বাঁধা ছিল। পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন। প্রতিটি লাশ ইটভর্তি দুটি করে বস্তায় বেঁধে ডুবিয়ে দেয়া হয়।

সাতজনকে অপহরণের পর ২৯ এপ্রিল রাতে সে সময়ের জেলা প্রশাসক মনোজ কান্তি বড়াল, পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, র‌্যাব-১১ এর সিইও তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ, ক্রাইম প্রিভেনশনাল স্পেশাল কোম্পানির কমান্ডার লে. কমান্ডার এমএম রানা, ফতুল্লা থানার ওসি আক্তার হোসেন, সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি আব্দুল মতিনকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে তারেক সাঈদ, আরিফ হোসেন ও এম এম রানাকে র‌্যাব থেকে চাকরিচ্যুত ও পরে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীও তাদের অকালীন অবসরে পাঠায়।

Comments
Loading...