সরকারি অ্যাম্বুলেন্স যেন সোনার হরিণ

0 ২১

Ambulenceঢাকা: জরুরি যানবাহন অ্যাম্বুলেন্স। মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সেবাটি এ বাহনেই দেয়া হয়। কিন্তু আজকাল এগুলো আর রোগী আনা-নেয়া করে না। চিকিৎসকদের দখলে চলে গেছে এগুলো। হরতাল অবরোধে প্রাইভেট কার বা বাসে উঠা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এ প্রবণতা আরো বেড়েছে। খোদ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে দেখা গেছে এমন চিত্র।

অবশ্য রাজনৈতিক সহিংসতার কারণেই এমনটি করা হচ্ছে তা নয়, এ চর্চাটি অনেকদিন আগে থেকেই চলে আসছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। এছাড়া অ্যাম্বুলেন্সের আড়ালে চলছে আরো অনেক কিছু। ফিটনেস ও অনুমোদনহীন অ্যাম্বুলেন্সে ছেয়ে গেছে হাসপাতাল এলাকা। সেবার নামে এসব অবৈধ ব্যবসা ও কার্যক্রমের কিছু ভয়ঙ্কর তথ্য নিয়ে বাংলামেইলের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট নেহাল হাসনাইনের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব। সহযোগিতায় ছিলেন ঢামেক করেসপন্ডেন্ট আওরঙ্গজেব সজীব

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) অ্যাম্বুলেন্স মাত্র চারটি। জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের আনা-নেয়ার কাজে এগুলো ব্যবহৃত হওয়ার কথা কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উল্টোটা। সরকারি এ অ্যাম্বুলেন্সগুলো ব্যবহার করছেন ঢামেকের প্রফেসর ও ডাক্তাররা। রোগীদের ভাগ্যে শেষ কবে অ্যাম্বুলেন্স জুটেছে সে কথা জানা নেই কারও।

সরকারি এসব অ্যাম্বুলেন্স রোগীর কাছে সোনার হরিণ। এই দুষ্প্রাপ্যতার সুযোগে চলছে অবৈধ অ্যাম্বুলেন্সের ধুন্ধুমার ব্যবসা। ঢামেকের সামনেই অভিনব কৌশলে চলছে এ বাণিজ্য। রোগীর অভিভাবকরা সরকারি অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে ‘সাইনবোর্ড’ দখলে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। তারপর শেষমেষ নিরুপায় হয়ে দ্বারস্থ হতে হয় দালালদের। গুনতে হয় কয়েকগুন টাকা। কখনো কখনো অ্যাম্বুলেন্স খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে ফিরে এসে দেখেন তার প্রিয়জনটাই আর নেই। তখন বুক চাপড়ে ঢামেকের আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করে বিলাপ করা ছাড়া কিছু করার থাকে না। কিন্তু এতোসব দেখেও নির্বিকার কর্তৃপক্ষ।

সাইনবোর্ড ফাঁদ
সরেজমিনে গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ঢামেকের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবাকেন্দ্রের সামনে কোনো অ্যাম্বুলেন্স দেখা যায়নি। অথচ হাসপাতালের প্রবেশ পথে চোখে পড়ে ‘সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস’ লেখা সাইনবোর্ড।

বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ভবনের গা ঘেঁষে লাগানো রয়েছে এসব সাইনবোর্ড। সেখানে লেখা রয়েছে সিটি করপোরেশন এলাকায় সর্বনিম্ন মাত্র ৩০০ টাকায় সেবা। প্রতি কিলোমিটার ১০ টাকা। এতো সস্তায় অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার বিজ্ঞাপন দেখে যে কেউই আগ্রহী হবেন। কিন্তু কাছে যেতেই দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সাইবোর্ডের কোথাও উল্লেখ নেই যোগাযোগের ঠিকানা বা মোবাইল নম্বর। এমনকি চালকদেরও কোনো নাম দেয়া নেই এসব সাইনবোর্ডে। ফলে রোগীর অসহায় অভিভাবকেরা আশা নিয়ে এসব সাইনবোর্ডের নিচেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। পরে তাদের পথ দেখাচ্ছে দালালরা।

বেলা ১১টার দিকে সাইনবোর্ডের নিচে দেখা যায় বেশ কিছু রোগীর অভিভাবক অপেক্ষা করছেন। ঘণ্টা পেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু দেখা নেই সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত অ্যাম্বুলেন্স বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ। অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলোর মাঝে একজনকে দেখা গেল- অস্থির হয়ে দৌড়ে একবার সাইনবোর্ডের কাছে যাচ্ছেন, আবার ফিরে আসছেন গেটের কাছে।

কথা বলে জানা যায় তার নাম মাজেদুল ইসলাম। অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু আইসিইউতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় তাকে পাঠানো হচ্ছে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। স্ত্রীকে এখনই নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স পাবেন কোথায়? দীর্ঘ অপেক্ষার পর জানতে পারেন, সরকারি অ্যাম্বুলেন্স এখন আর রোগী টানে না, সেগুলো ডাক্তারদের আনা-নেয়ার কাজে নিয়োজিত। এতোক্ষণ পর এই কথা জেনে হতাশায় বসে পড়লেন মাজেদুল ইসলাম, উদভ্রান্তের মতো এদিক সেদিক তাকাতে থাকলেন।

ডাক্তারদের দখলে অ্যাম্বুলেন্স
ঢামেক অ্যাম্বুলেন্সের চালক জালালের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাসা থেকে আনা নেয়া, এমনকি পরিবারের কাজেও এ অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করছেন ডাক্তার ও প্রফেসররা। ওদিকে অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে সাইনবোর্ড দেখে শেষ ভরসা ভেবে আশায় বুক বেঁধে তার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই রোগীর অভিভাবকদের। অবশেষে দ্বারস্থ হতে হচ্ছে বহিরাগত অ্যাম্বুলেন্সগুলোর দিকে। ফলে গুনতে হচ্ছে বেশি টাকা। তবুও মিলছে না না সঠিক সময়ে সঠিক সেবা।

সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের ইনচার্জ মো. নাসির উদ্দিন নান্নু ঢামেকের এ চিত্রের কথা স্বীকার করলেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি  বাংলামেইলকে বলেন, ‘ওই অ্যাম্বুলেন্সগুলো এখন আর রোগীদের জন্য না। এগুলো এখন শুধুমাত্র ঢামেকের ডাক্তার ও প্রফেসরদের ব্যবহারের জন্য।’

তিনি অরো বলেন, ‘বেশিরভাগ ডাক্তার থাকেন উত্তরায়। তাই সকাল ৬টায় তাদের আনতে যায়। এরপর দুপুরে তাদের বাসায় নিয়ে যায়। আবার রাতেও তাদের বাসায় পৌঁছে দিতে হয়। এসব কারণেই এখন আর এখানে (সাইনবোর্ডের) অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না।’

অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করলেন পরিচালক
এ ব্যাপারে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেন। তবে এ অবস্থার জন্য তিনি চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার অজুহাত দিলেন। তিনি বাংলামেইলকে বলেন, ‘আপাতত হরতাল ও অবরোধের কারণে অ্যাম্বুলেন্সগুলো ডাক্তার ও প্রফেসরদের আনা নেয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তা না হলে এই অবস্থার মধ্যে কীভাবে হাসপাতালে আসবেন তারা। তাছাড়া মাঝে মাঝেই ইমারজেন্সি অপারেশন থাকে তখন অ্যাম্বুলেন্সে করে ডাক্তারদের পৌঁছে দেয়া হয়।’

সূত্রঃ বাংলা মেইল

Comments
Loading...