স্বাধীনতার ৪২ বছর ও আমাদের বিচার ব্যবস্থা

0 ১৯

aimঢাকা: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি রাষ্ট্র। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনাবসানে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান নামে যে দেশটি সৃষ্টি হয়েছিল, তার পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তান শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও পুনঃপৌনিক সামরিক অভ্যুত্থান এদেশের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান প্রবর্তনের মাধ্যমে দেশে একটি সুপ্রিম কোর্ট এবং এর অধীনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক অধস্তন আদালত নিশ্চিত করা হয়। বাংলাদেশ সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগের প্রথম এবং দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে ধারা ৯৩ থেকে ১১৬(ক)তে বিচার বিভাগ ও অধঃস্তন আদালতের কথা উল্লেখ আছে।

আমাদের দেশ ৬৪টি জেলায় বিভক্ত। সংবিধানের ২৭ নম্বর ধারায় আইনের চোখে সবাই সমান কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে। সব মানুষকে আইনের সমান সুযোগ প্রদানের লক্ষ্যে প্রতিটি জেলায় একটি করে চিফ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, দায়রা জজ আদালত স্থাপন করা হয়েছে। তবে শুধুমাত্র ঢাকা এবং চট্টগ্রামে মহানগর দায়রা জজ আদালত স্থাপন করা হয়েছে। অপরদিকে রাজধানী ঢাকায় হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগ নিয়ে গঠিত হয় দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট।

ইতিপূর্বের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে বর্তমান সময়ে সুপ্রিম কোর্টে সবচেয়ে বেশি বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বর্তমানে আপিল এবং হাইকোর্ট বিভাগে ১০০ বিচারপতি রয়েছেন। এর মধ্যে আপিল বিভাগের দু’টি বেঞ্চে ৯ জন এবং হাইকোর্টে ৫৩টি বেঞ্চে ৯১ জন বিচারপতি রয়েছেন। বর্তমানে হাইকোর্টে ৮৩ জন স্থায়ী এবং ৮ জন অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে কর্মরত আছেন।

সংবিধানের এক সংশোধনীতে ঢাকার বাইরে ৬টি স্থানে হাইকোর্টের বেঞ্চ বসানোর আইন করা হয়। যদিও পরবর্তী সংশোধনীতে তা বাতিল করা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সময়ে ঢাকার বাইরে কোনো হাইকোর্টের বেঞ্চ নেই।
আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে অপরাধ করা থেকে বিরত রাখা। কাউকে শাস্তি দেয়া আইনের কাজ নয়। স্বাধীনতার পর থেকে মানুষের সব অধিকার নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সময় অনেক রকম আইন তৈরি করা হলেও তা ভোগ করতে গিয়ে মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। সহজ করা হয়নি মামলার রীতি।
এছাড়া নিজের অধিকার সম্পর্কে না জানার কারণেও অনেকে বঞ্চিত হচ্ছে তাদের অধিকার ভোগ করার সুবিধা থেকে। মানুষকে জানানোর জন্য এ যাবৎকাল পর্যন্ত কোনো প্রকার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

মামলা পরিচালনায় জট ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক নিরপরাধ মানুষকেও কারাগারে থাকতে হচ্ছে বছরের পর বছর। ফৌজদারি মামলার চেয়ে দেওয়ানী মামলার শুনানি শেষ হতে বেশি সময় লাগে। স্বাধীনতার পরপরই বিভিন্ন আদালতে দায়েরকৃত অনেক মামলা এখনো বিচারাধীন হয়ে ঝুলে আছে। যার কারণে সম্পত্তির অনেক মামলার রায়ের অপেক্ষায়। আর প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না মালিকানার পূর্ণ অধিকার।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সারাদেশের আদালতে প্রায় দুই লক্ষাধিক মামলা বিচারাধীন অবস্থায় পড়ে আছে। যার মধ্যে জমিজমা সংক্রান্ত মামলাই বেশি। রাজনৈতিক কারণে দিনে দিনে বাড়ছে ফৌজদারি মামলার সংখ্যা। গণতান্ত্রিক কোনো আন্দোলন করতে গেলেও পুলিশের পক্ষ থেকে দায়ের করা হচ্ছে মামলা।

এবছর বাংলাদেশের বিজয়ার্জনের ৪২ বছর পূর্ণ হচ্ছে। বিজয়ার্জনের ৪২ বছরে আমাদের বিচার ব্যাবস্থায় যেমন অনেক অর্জন এসেছে তেমনি অনেক সীমাবদ্ধতাও বেড়েছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন বাংলামেইলকে বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে এ সরকারের আমলে বিচার বিভাগকে ন্যাক্কারজনকভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে। অযোগ্য, অদক্ষ বিচারক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিম্ন আদালত রাজনৈতিক চাপে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপ্রার্থীরা ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট রাজনৈতিক প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের আস্থা কমে যাচ্ছে। বিচার বিভাগ নির্দলীয় হওয়া উচিৎ এবং ন্যায় বিচার প্রদানের অঙ্গীকার দেয়া উচিৎ।’

খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় গঠন করা হয়নি। যার পরিপ্রেক্ষিতে বিচার বিভাগ এখনো আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করছে। বিপক্ষে রায় দিলে বদলি করা কিংবা পদাবনতি করা হবে, এমন ভয়ে বিচারকরা মানসিকভাবে ন্যায়বিচার করার মতো সাহস রাখে না।’

তিনি বলেন, ‘সামরিক সরকারের চেয়েও এ সরকারের আমলে বিচার বিভাগের উপর বেশি হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। তাই নিম্ন আদালতকে পর্যবেক্ষণ করার মতো যথেষ্ট জনবল এবং অর্থনৈতিক সামর্থ এখন আর মন্ত্রণালয়ের নেই। যার কারণে সঠিক বিচার নিশ্চিত সম্ভব হচ্ছে না।’

এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বাংলামেইলকে বলেন, ‘বিচার বিভাগ সঠিকভাবে অগ্রসর হচ্ছে। কোনো প্রকার সমস্যা হচ্ছে না।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম বাংলামেইলকে বলেন, ‘স্বাধীনতার পর বিচার ব্যাবস্থার অনেক উন্নয়ন হলেও তা কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। তবে যতটুকু হয়েছে তা শুধুমাত্র স্বাধীনতা অর্জনের জন্যই হয়েছে।’

Comments
Loading...