অর্থ ‘পাচার’ করেছেন ইমরান, পরিকল্পনা দেশ ছাড়ার!

0

imranii-400x264ইমরান এইচ সরকার। সারা বিশ্বের গণমাধ্যমে গত একবছরেরও বেশি সময় ধরে আলোচিত নাম। শুধু গণমাধ্যম নয় তার নামটা এখন দেশের সবমানুষের কাছে পরিচিত। শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের শক্তি নয় গণজারণ মঞ্চের বিরোধী জামায়াত-শিবির, দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকরাও জানেন এই নামটা। মাঝখানে হঠাৎ জ্বলে ওঠা হেফাজত সমর্থকরাও জানেন এই নামটি। গত একবছরে ইমরান দেশের ‘নায়ক’। কিন্তু সেই নায়ক এখন হয়ে উঠেছেন ‘খলনায়ক’।

গতবছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চ বা প্রজন্ম চত্বরের মুখপাত্র ইমরান। দীর্ঘ একবছর দেড় মাস সময় ধরে দায়িত্বে আছেন মুখপাত্রের। তাকে নিয়ে কত আলোড়ন। কিন্তু কে জানতো, এই ইমরানই হবেন সমালোচনার পাত্র। গণমাধ্যমে যার ইতিবাচক সংবাদ ছাপার হিড়িক ছিল সেই মানুষটাই আজ নেতিবাচক খবরের শিরোনামে।

যে গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে মানুষ গর্ব করতেন, ইমরানের জন্যই নাকি এখন তা ঘৃণার মঞ্চ হয়ে দাড়াচ্ছে। অগণতান্ত্রিক আচরণ, স্বেচ্ছাচারীতা, আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। জাগরণ মঞ্চের নামে চাদাবাজী করেছে ইমরান- সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করেছে গণজাগরণ মঞ্চের কয়েক সংগঠক। তার সম্পদের হিসাবও জানতে চায় অনেকে।

গণজাগরণ মঞ্চের ‘মুখপাত্র’ ইমরান এইচ সরকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক ছিলেন। সমপ্রতি সেখান থেকে ইস্তেফা দিয়েছেন। কিন্তু চাকরি ছাড়লেন কেনো- এমন প্রশ্ন এখন সবার মনে। সেসব অজানা নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে দেশটাইমসের নিজস্ব প্রতিবেদক কামাল শাহরিয়ার চালাচ্ছেন অনুসন্ধান। ইতিমধ্যে তিনি পেয়েছেন নানা অভিযোগ। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নানা অনিয়মের তথ্য। সেসব নিয়ে ধারাবাহিক ‘নায়ক যখন খলনায়ক’। বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কমের পাঠকদের জন্য দেশ টাইমসের সৌজন্যে প্রতিবেদনটি হুবহু তুলে ধরা হল।

নানান বিতর্কে থাকা ইমরান এইচ সরকার দেশ ছেড়ে যাওয়ার পথ খুজছেন। সুযোগ পেলেই দেশ ছেড়ে চলে যাবেন তিনি। সেজন্য চিকিৎসকের সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। দেশের বাইরে তার প্রথম টার্গেট কানাডা। এছাড়া ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের কোন একটি দেশে যেতে পারেন তিনি। এজন্য একটি এনজিওর উর্দ্ধতন কর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন ইমরান। যদিও ইমরান এ বিষয়টিকে অস্বীকার করে যাচ্ছেন। তবুও চাকরি থেকে ইস্তেফা দেয়ায় তার দেশ ছাড়ার বিষয়টি জোরালো হয়েছে। ইমরানের দেশ ছেড়ে যাবার বিষয়টি এখন মঞ্চের কর্মী-সংগঠকের মধ্যে বেশ আলোচিত বিষয়। ইমরান তার ঘনিষ্ঠজনকে নাকি বলেছেন, রাজনৈতিক দল গড়তে না পারলে মঞ্চ ছেড়ে বিদেশে চলে যাবেন!

তবে দেশ ছেড়ে গেলেও বিদেশে গিয়ে তেমন সমস্যায় পড়তে হবে না ইমরানকে। কেননা বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে গণজাগরণ মঞ্চের নামে উত্তোলন করা কোটি কোটি টাকা তিনি বিভিন্ন দেশে ‘পাচার’ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এসব টাকা ‘পাচার’ করেছেন বলে জানিয়েছে মঞ্চেরই একটি অংশ। যদিও এই অভিযোগের জন্য ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাকে বারবার ফোন দেওয়া হলেও কেটে দিয়েছেন ‘মুখোশের’ আবর্তে থাকা ইমরান।

সূত্র জানায়, ইমরানের ঘনিষ্ঠ ও মঞ্চের এক নারীকর্মী ( যিনি দেশের একজন আলোচিত ব্যক্তির বান্ধবী বলে পরিচিত) দুই দফা কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্য গিয়ে টাকা রেখে আসেন। তিনি প্রথম কানাডা যান গত বছরের এপ্রিলে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে ২০১৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি গড়ে ওঠে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ। এ মঞ্চের নামে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা ওঠানো হয়েছে তার দুইটি তালিকা এসেছে এ প্রতিবেদকের কাছে।

তালিকা দুইটি ফেসবুক, ব্লকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি তালিকায় ৩৬ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি এবং অপর তালিকায় ২৮টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নাম দেয়া হয়েছে। ৩৬টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা ওঠানো হয়েছে বলে হিসাব দেখানো হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকে চাঁদা নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন ডা. ইমরান। তবে এসব টাকা তার নিজের কাছে নেই বলে জানিয়েছেন।

যেসব ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেয়ার কথা স্বীকার করেছেন তার মধ্যে রয়েছেন একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামনিস্ট। তিনি তিন দফায় দিয়েছেন আড়াই লাখ টাকা। এ টাকা ইমরানের কাছে দেয়া হয়েছে মঞ্চের অন্যতম সংগঠক গৌরব ৭১’র সাধারণ সম্পাদক এফএম শাহীনের সামনে। এফএম শাহীন দেশটাইমসকে এর সত্যতা স্বীকার করেছেন। পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা এসপি মাহবুব দিয়েছেন ৪ লাখ টাকা। এ টাকা ইমরানের হাতে দেয়া হয় মঞ্চের অন্যতম সংগঠক ও ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসুর সামনে। এ অর্থের বিষয়টি বাপ্পাও নিশ্চিত করেছেন। অবশ্য এই টাকার কথা স্বীকার করেছেন ইমরান এইচ সরকার।

বাপ্পাদিত্যর পরিচিত কানাডা প্রবাসী জিয়াউল হক মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। একজন সিনিয়র আইনজীবীও দিয়েছেন টাকা। একটি পত্রিকার মাধ্যমে গত ১৪ই ফেব্রুয়ারি প্রবাসীদের ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬৮৩ টাকা দেয়া হয় ইমরানের কাছে। এটি পরের দিন পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়। গত বছরের ৬ই ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চ থেকে ওঠানো হয় প্রায় ৪৩ হাজার টাকা। গণজাগরণ মঞ্চের প্রথম ৪ দিন জাগরণ মঞ্চের মিডিয়া সেলের রেজিস্ট্রার খাতার হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৪৫ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এ টাকা বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি থেকে আসা। এ রেজিস্ট্রার নিয়ন্ত্রণ করতেন মঞ্চের আরেক সংগঠক মাহমুদুল হক মুন্সী। পরে এ রেজিস্ট্রার খাতা গায়েব করে ফেলেন ইমরান। এর হিসাব ইমরান ছাড়া কারও কাছে নেই।

ইমরান টাকা নিয়েছেন জামায়াত সমর্থিত বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্যাংক ও ফার্ম থেকেও। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায়ের পর চাপে পড়ে ফের কমপক্ষে ২০টি প্রতিষ্ঠানের টাকা ফেরতও দিতে হয়েছে। বিষয়টি স্বীকার করেছেন মঞ্চেরই একজন সংগঠক। ইমরান এইচ সরকারের অর্থনৈতিক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়টি সামনে আসে কয়েকদিন পরই। তার প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলনের এক পর্যায়ে নোট অব ডিসেন্টও দেয় ছাত্র ফেডারেশন।

কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজির বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু’র দোতলায় একাধিক দিন আলোচনা হয়। নানা বিতর্কের মাঝেই ইমরান এইচ সরকারকে মঞ্চের আহ্বায়ক থেকে অব্যাহতি দিয়েছে মঞ্চেরই একটি অংশ। ১২ই এপ্রিল সংবাদ সম্মেলন করে ইমরান এইচ সরকারকে অব্যাহতি দেন মঞ্চের অন্যতম সংগঠক কামাল পাশা চৌধুরী। ‘গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও সংগঠকবৃন্দের ব্যানারে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

তবে ইমরান এইচ সরকার সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি একটি গণমাধ্যমেকে বলেছেনন, গণজাগরণ মঞ্চকে বিতর্কিত করতেই এ ধরনের অভিযোগ করা হচ্ছে। আন্দোলন চালাতে অনেকেই টাকা দিয়েছেন বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি। বলেন, এ টাকা বিভিন্ন খাতে সঙ্গে সঙ্গে ব্যয় করা হয়েছে। কোন আয় রাখা হয়নি। অনেকেই দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে টাকার হিসাব নিয়ে ডাকসু’র দোতলায় কয়েকবার আলোচনার বিষয়টিও স্বীকার করেন।

বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচারের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি ডাঁহা মিথ্যা কথা। আমি একটি টাকাও পাচার করিনি। মঞ্চের এক নারী কর্মীর মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাচার করেছেন- এমন অভিযোগকে অস্বীকার করেছেন বিতর্কিত ইমরান।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More