তুরস্কের জন্য লিবিয়া কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

0 ৫৬

তুরস্ক এবং লিবিয়ার সম্পর্ক প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেও লিবিয়া উসমানীয় খেলাফতের অধীনেই ছিল। কিন্তু কখনোই লিবিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক খুব খারাপ ছিল না।

শুধুমাত্র গাদ্দাফির পতনের পূর্বে লিবিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ ছিল। তবে তুরস্কের সঙ্গে বর্তমানে লিবিয়ার যে দহরম-মহরম সম্পর্ক সেটি আসলে শুরু হয় ২০১৯ সালের শুরুর দিকে। লিবিয়ায় তখন চলছিল প্রচণ্ড রকম গৃহযুদ্ধ। একদিকে রাশিয়া, আরব আমিরাত, মিশর ফ্রান্স ও গ্রীসের সমর্থিত সন্ত্রাসী হাফতারের বাহিনী অন্যদিকে রাজধানী ত্রিপলিতে অবস্থিত জাতিসংঘ স্বীকৃত সরকার।

যুদ্ধে ত্রিপোলি ভিত্তিক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এত কোণঠাসা হয়ে পড়ে যে খলিফা হাফতারের সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে পতন ছিল মাত্র সময়ের ব্যাপার ।

সেই সময়ে জাতিসংঘের স্বীকৃত সরকারটি বিভিন্ন দেশের কাছে সামরিক সহযোগিতার আবেদন করে। কিন্তু কেউ তাকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেনি; বরং দেশটির ওপর জারি করা হয় অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা।

বিশ্বের বড় বড় দেশ যেমন ফ্রান্স, রাশিয়া, আমেরিকা, আরব আমিরাত, মিসর এবং গ্রিস লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে ঘাঁটি গেঁড়ে থাকা খলিফা হাফতারকে অস্ত্রশস্ত্র এবং বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করে।

ঠিক ওই সময় পতনের দ্বারপ্রান্তে থাকা লিবিয়ার এই বৈধ সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় তুরস্ক।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে লিবিয়ায় সৈন্য, সাঁজোয়া যান ও ড্রোন পাঠানো সহ সব ধরনের সামরিক সহযোগিতার আশ্বাস দেয় তুরস্ক।

এরদোয়ান সরকারের সেই সহযোগিতাই মূলত লিবিয়ার জন্য গেম চেঞ্জার হয়ে দাঁড়ায়। তুরস্কের গোয়েন্দা বাহিনী এবং কিলার ড্রোন হাফতারের বাহিনীকে ত্রিপলির উপকূল থেকে তাড়িয়ে ৪৫০ কিলমিটার পূর্বে সিরত শহর পর্যন্ত নিয়ে যায়। হাঁফ ছেড়ে বাঁচে ত্রিপোলিভিত্তিক জাতিসংঘ সমর্থিত ফায়েজ আল-সাররাজের সরকার।

সেই সময় তুরস্ক লিবিয়ার সঙ্গে দুটি চুক্তি সই করে।

প্রথমটি হল ভূমধ্যসাগরে জলসীমা চুক্তি। দ্বিতীয়টি সামরিক চুক্তি।

তুরস্ক এবং লিবিয়া ভূমধ্যসাগরের মাঝখান বরাবর একটি জায়গায় নিজেদের সীমানা নির্ধারণ করে। আর এটাই ছিল গত এক দশকে এরদোয়ানের সবচেয়ে বিচক্ষণ চাল।

আসলে ইসরাইল, গ্রিস, ফ্রান্স, সাইপ্রাস ও মিসর চেয়েছিল তুরস্ককে একেবারে কোণঠাসা করে রাখতে। কারণ ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী এই দেশগুলো তুরস্ককে বাইরে রেখে একটি জোট গঠন করেছিল যা এই সাগরের তেল গ্যাস অনুসন্ধান এবং এর বন্টনের সিদ্ধান্ত নেবে।

অথচ ভুমধ্য সাগরের পূর্ব অঞ্চলে তুরস্কের যে উপকুল আছে তার দৈর্ঘ্য ১৬০০ কিলোমিটার আর লিবিয়ার ১৭০০ কিলোমিটার। অথচ এই তুর্কি বিরোধী জোটটি তাদেরকে কোন আধিকারই দিতে নারাজ।

কিন্তু তুরস্ক এবং লিবিয়ার এই জলসীমা চুক্তি অন্যদের সকল প্লান কে নস্যাৎ করে দেয়। মুলত ইসরাইল, মিসর, গ্রীস, সাইপ্রাস ও ফ্রান্স চেয়েছিল ভুমধসাগরের খনিজ সম্পদে তুরস্ককে কোন ভাগ না দিতে। অর্থাৎ তুরস্ক নিজের এক্সক্লুসিভ ইকনমিক জোনেও তেল গ্যাস অনুসন্ধানের কোন পথ উম্মুক্ত রাখেনি তাঁরা তুরস্কের জন্য। তাদের আরও প্লান ছিল তুরস্ককে বাইপাস করে ভূমধ্যসাগরের তলদেশ দিয়ে পাইপলাইন তৈরি করে ইউরোপে গ্যাস সাপ্লাই দেওয়া। কিন্তু তুরস্ক-লিবিয়ার জলসীমা চুক্তিরফলে সেটি এখন তুরস্কের অনুমতি ব্যতিত আদৌ সম্ভব না ।

লিবিয়ায় তুরস্কের স্বার্থ কী?

লিবিয়াতে তুরস্কের কয়েকটি স্বার্থ আছে-

১. এক নম্বর হচ্ছে লিবিয়ার যুদ্ধের কারণে তুরস্কের শত শত কম্পানি যে তাদের ওখানের ফ্যাক্টরি এবং বিভিন্ন ধরনের প্রজেক্ট ছেড়ে এসেছিল সেগুলোতে আবার ফিরে যেতে পারবে। সেই ক্ষতিগুলো পুষিয়ে নিতে পারবে।

২. লিবিয়ার অবকাঠামোগত উন্নয়নে তুরস্কের কোম্পানিগুলো অগ্রাধিকার পাবে।

৩. লিবিয়ার বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানের জন্য তুরস্কের এনার্জি কোম্পানিগুলো অগ্রাধিকার পাবে।

৪. লিবিয়ার তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনে তুরস্কের কোম্পানিগুলো অগ্রাধিকার পাবে।

সর্বোপরি লিবিয়াতে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তুরস্কের কোম্পানিগুলো অগ্রাধিকার পাবে

উল্লেখ্য যে, তুরস্ক ও লিবিয়ার বর্তমান বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলার।

আর সবেচেয়ে বড় স্বার্থটা হচ্ছে লিবিয়াকে তুরস্ক আফ্রিকায় ঢোকার একটি দরজা হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।

আফ্রিকার সঙ্গে তুরস্কের বর্তমানে ব্যাপক রাজনৈতিক, কূটনৈতিক সামরিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্কগুলো আরও উন্নত করার জন্য, আরও এগিয়ে নেয়ার জন্য, আরও বেশি ব্যবসা-বাণিজ্য দরকার এবং এই ব্যবসা-বাণিজ্যের সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে নৌপথ। তুরস্ক তার পণ্য মালবাহী জাহাজে করে লিবিয়ার মাধ্যমে আফ্রিকার দেশগুলোতে খুব সহজে পৌঁছাতে পারবে।

এটা তুরস্কের এমন একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা যে দিন যতো যাবে ততই তুরস্ক এর সুফল গ্রহন করতে থাকবে।

এখন আসা যাক তুরস্কের সঙ্গে সুসম্পর্কে লিবিয়ার স্বার্থ কোথায়? এখনও পর্যন্ত যে স্বার্থগুলো দেখা যাচ্ছে তা হল

১. দেশেটির সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।

২. সন্ত্রাসের কবল থেকে দেশের বিশাল এক অংশ উদ্ধার করা।

৩. দেশে শান্তি এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।

৪. অর্থনৈতিক গতি ফিরে আসা।

৫. ভূমধ্যসাগরে বিশাল এক এক্সক্লুসিভ একোনমিক জোনের অধিকার পাওয়া।

৬.সর্বোপরি ত্রিপলি ভিত্তিক সরকারটির সামরিক এবং রাজনৈতিক ভাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রাপ্ত গ্রহণযোগ্য একটি সরকার হিসেবে টিকে থাকা।

সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী?

২০১৯ সালে যখন প্রথম চুক্তি হয় তখন ক্ষমতায় ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ আল-সাররাজ। পরবর্তীতে গত মার্চ মাসে শপথ নেয় নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যারা আগামী ডিসেম্বরের নির্বাচন পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করবে।

তবে অনেকেই ধারণা করেছিলেন আবদুল হামিদ আল-দাবিবাহর নেতৃত্বের নতুন এই সরকার তুরস্কের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে না। এ নিয়ে গ্রীস, মিশর, ফ্রান্স এবং রাশিয়া অনেক চেষ্টাও চালিয়েছিল। কিন্তু আল-দাবিবাহ তার মন্ত্রীপরিষদের ১৫ জন মন্ত্রী এবং সরকারের আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিদের নিয়ে গত সপ্তাহে তুরস্ক সফরে এসে যে শোডাউন করে গেলেন তাতে আপতত সম্পর্কে চির ধরার সম্ভবনা দেখছি না।

তবে তুরস্ক বিরোধী জোটটি থেমে থাকবে না। ছলে, বলে, কৌশলে, কখনও প্রলোভন দেখিয়ে কখনও বা হুমকি দিয়ে লিবিয়াকে তুরস্ক থেকে দূরে সরানোর জন্য চেষ্টা চালিয়েই যাবে। যেসব দেশ সারা বিশ্বের সামনে নির্লজ্জের মত অন্য দেশের সরকারকে ব্লাকমেইল করতেও দ্বিধা করে না তারা পর্দার অন্তরালে না জানি কত চালই খেলে!

কিন্তু তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক এবং রাজনৈতিক শক্তি এখন আরও বেশি সচেতন আরও বেশি পরিপক্ক।

উৎসঃ   jugantor
Comments
Loading...