ভারতে ‘অচেনা জ্বরে’ মারা যাচ্ছে শিশুরা

0 ১৪

গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময়ে ভারতের উত্তর প্রদেশে ‘অচেনা’ এক জ্বরে অন্তত ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু।

দেশটির উত্তরাঞ্চলের ৬টি জেলায় কয়েকশ রোগী জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে মৃতদের কারো কোভিড-১৯ পরীক্ষার ফল পজিটিভ আসেনি।

আক্রান্তদের বেশিরভাগই হাড়ের জোড়ায় ব্যথা, মাথা ব্যথা, ডায়রিয়া এবং মাথা ঘোরার উপসর্গের কথা জানিয়েছেন। কারো হাতে ও পায়ে ফুসকুড়িও দেখা গেছে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আক্রান্ত শিশুরা প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠছে এবং পরে শরীর থেকে অনেক বেশি ঘাম ঝরছে তাদের।

করোনাভাইরাস মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ থেকে ভারত যখন ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে, তখন সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে সবচেয়ে জনবহুল এই রাজ্যে ‘রহস্যজনক জ্বরে’ মৃত্যুর খবর নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।

আগ্রা, মথুরা, মনিপুরি, ইটাহ, কাসগঞ্জ ও ফিরোজাবাদ- এই ছয় জেলায় এ ধরনের জ্বরের রোগী পাওয়া গেছে। এসব জেলার চিকিৎসকদের কারও কারও ধারণা, মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুই হয়ত তাদের মৃত্যুর কারণ।

হিন্দুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আক্রান্তদের মধ্যে কারও কারও রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ এসেছে। কিন্তু অনেকের নমুনা পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা না পড়লেও রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ দ্রুত কমে গেছে।

প্লাটিলেট মানবদেহে রক্তকে জমাট বাঁধতে সহায়তা করে। ডেঙ্গুর কারণেও রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ কমে যেতে পারে। তবে অনেকের নমুনা পরীক্ষায় ডেঙ্গু নেগেটিভ এসেছে।

উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ বলেছেন, ঠিক কী কারণে এই অসুস্থতা ও মৃত্যু ঘটছে তা উদ্ঘাটনে লখনৌর কিং জর্জ মেডিকেল কলেজের একদল বিশেষজ্ঞকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফিরোজাবাদ জেলার জ্যেষ্ঠ চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. নীতা কুলশ্রেষ্ঠ বলেন, হাসপাতালে আসা রোগীদের মধ্যে বিশেষ করে শিশুরা খুব দ্রুত মারা যাচ্ছে। গত এক সপ্তহে এ জেলায় ‘অচেনা জ্বরে’ আক্রান্ত হয়ে ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ৩২জন শিশু।

মূলত গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতেই স্ত্রী এইডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। কয়েকশ বছর ধরে ভারতে এ রোগের ইতিহাস আছে । মোটামুটি একশরও বেশি দেশে ডেঙ্গু জ্বর দেখা যায়, তার মধ্যে ৭০ শতাংশই এশিয়ার।

ডেঙ্গুর ৪ ধরনের ভাইরাস রয়েছে এবং দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে বয়স্কদের চেয়ে শিশুদের মৃত্যুর ঝুঁকি ৫ গুণ বেশি থাকে বলে চিকিৎসকদের ভাষ্য।

ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী ‘এইডিস ইজিপ্টি’ মশা ঘর বাড়িতে পরিষ্কার পানিতে বংশ বিস্তার করে। বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১০ কোটি মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। তাদের অনেকের ক্ষেত্রে দেহের ভেতরে রক্তপাত, এমনকি শরীরের বিভিন্ন ত্যঙ্গ বিকল হওয়ার ঘটনাও ঘটে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, কোভিড- ১৯ এবং ডেঙ্গু একসঙ্গে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়লে ঝুঁকিতে থাকা জনসংখ্যার জন্য সেটা ভয়ানক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

তবে উত্তর প্রদেশে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে ডেঙ্গুর সরাসরি কোনো যোগ এখনও পাওয়া যায়নি বলে বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়।

শিশুদের অপুষ্টির উচ্চ হার, পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং ভঙ্গুর চিকিৎসা সেবার মধ্যে ২০ কোটির বেশি মানুষের এই রাজ্যে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম শেষে নানা কারণে জ্বরের প্রকোপ দেখা যায়।

উত্তর প্রদেশেই ১৯৭৮ সালে মশাবাহীত রোগ ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’ প্রথম শনাক্ত হয়েছিল। এছাড়া বিভিন্ন সময় ‘স্ক্রাবা টাইফাস’ এবং ‘বুশ টাইফাস’ রোগের প্রাদুর্ভাবও ভারতে দেখা গেছে।

এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালে উত্তর প্রদেশের ছয়টি জেলায় বর্ষা মৌসুমের পর ‘স্ক্রাবা টাইফাস’ এবং ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ দেখা যায়।

এছাড়া অন্য প্রাণির দেহ থেকে মানব শরীরে ব্যকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ ‘লেপ্টোস্পাইরোসিস’ এবং মশাবাহিত রোগ চিকুনগুনিয়ার কারণেও জ্বর দেখা দেয় ওই এলাকায়।

ভারতের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেনটাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসায়েন্স’ এর ভাইরাসবিদ অধ্যাপক ভি রবি বলেন, “বর্ষা মৌসুমের পর এ অঞ্চলে যে জ্বর ছড়িয়ে পড়ে, তার পেছনে এক গুচ্ছ রোগ রয়েছে। এসব রোগের গতিবিধি এবং চিকিৎসার বিষয়ে পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।”

সাম্প্রতিক ‘অচেনা’ এই জ্বর ডেঙ্গু না কি অন্য কোনো রোগের কারণে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে জিনোম সিকোয়েন্স করার উপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভারতের একজন ভাইরাসবিদ বলেন, “আমরা যদি সঠিকভাবে এবং নিয়মিত এর অনুসন্ধান না করি তবে এমন অনেক বিষয়ই রহস্যজনক থেকে যাবে।”

উৎসঃ   বিডিনিউজ
Comments
Loading...